বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বর্তমান অ্যাড-হক কমিটির সভাপতি তামিম ইকবাল ভারতের মাটিতে সদ্য সমাপ্ত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জন করার সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে দেওয়া এক দীর্ঘ ও খোলামেলা সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন। মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার জের ধরে ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল বিসিবির বিগত কমিটি। ওই সময় এই হঠকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করায় তামিমকে ‘ভারতের দালাল’ তকমাও শুনতে হয়েছিল। সাক্ষাৎকারে তামিম জানান, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইস্যুতে তিনিই প্রথম প্রকাশ্যে কথা বলেছিলেন। তাঁর মতে, আইসিসি যথেষ্ট নমনীয় ছিল এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ থাকলেও বিগত বোর্ড তা কাজে লাগায়নি। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়ের আবেগময় স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ওই একটি জয় এদেশের শিশুদের ক্রিকেটের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট করেছিল। অথচ কোনো সঠিক আলোচনা ছাড়াই বিশ্বকাপ বর্জন করায় দলের অনেক খেলোয়াড় হয়তো জীবনে আর কখনোই বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাবেন না, যা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্তে পাকিস্তানের সংহতি ও টুর্নামেন্ট বয়কটের হুমকির বিষয়ে তামিম জানান, তিনি ওই মূল নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় না থাকায় এ বিষয়ে মন্তব্য করা কঠিন। তবে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ হাতছাড়া হওয়াটিই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় আক্ষেপের বিষয়।
সাক্ষাৎকারে বিসিসিআই ও আইসিসি কর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ভারতীয় দলের নিরাপত্তার বিষয়টিও জোরালোভাবে উঠে এসেছে। আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহের সঙ্গে এই নতুন দায়িত্বে আসার পর এখনো আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ না হলেও ভারতীয় ক্রিকেটারদের কাছ থেকে তাঁর সম্পর্কে ইতিবাচক কথাই শুনেছেন তামিম। অন্যদিকে, বর্তমান বিসিসিআই সভাপতি মিথুন মানহাসের সঙ্গে নিজের চমৎকার ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন তিনি। আইপিএল এবং ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে তাঁরা একসঙ্গে খেলেছেন। বাংলাদেশে ভারতীয় দলের নিরাপত্তা নিয়ে কখনোই কোনো হুমকি ছিল না বলে আশ্বস্ত করে তামিম বলেন, ভারতীয় দল এখানে এলে পুরো স্টেডিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ থাকে এবং মানুষ এই লড়াই দারুণ উপভোগ করে। ব্যক্তিগতভাবে বিসিবি ও বিসিসিআইয়ের মধ্যে এখন আর কোনো সমস্যা নেই উল্লেখ করে, দুই বোর্ডের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে বাংলাদেশে একটি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনের ওপর জোর দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এই বিতর্কের বাইরেও দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের এক অন্ধকার অধ্যায় এবং বিসিবির বর্তমান টালমাটাল পরিস্থিতির কথা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কাছে অকপটে তুলে ধরেছেন দেশসেরা এই ওপেনার। কেন নির্বাচিত বোর্ড ভেঙে দিয়ে একটি অ্যাড-হক কমিটির প্রয়োজন হলো, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তামিম জানান, আগের বোর্ডের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন এবং ব্যাপক অনিয়মের কারণে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। আগের কমিটির সাতজন পরিচালক পদত্যাগ করেছিলেন এবং কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগ ছিল। এর প্রতিবাদে বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রাণ হিসেবে পরিচিত ঢাকা লিগের বিভিন্ন স্তরের ৭৬টি দলের মধ্যে প্রায় ৫০টি দল খেলায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়, যার মধ্যে প্রিমিয়ার লিগের ১২টি দলের ৯টিই লিগ বর্জন করেছিল। এর ফলে সাধারণ ক্রিকেটাররা চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে, অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় জীবন বাঁচাতে রিকশা চালানো কিংবা ফুচকা বিক্রির মতো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছিলেন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) তদন্তে নামে এবং অনেক পরিচালকই আগের বোর্ডের বিপক্ষে জবানবন্দি দেন।
সবকিছু নতুন করে সাজানোর স্বপ্ন নিয়ে বিসিবির দায়িত্ব নেওয়া তামিম দেশের ক্রিকেটের এই স্থবিরতা দূর করতে একটি স্বচ্ছ কাঠামোর ওপর জোর দিচ্ছেন। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা জানিয়ে বলেন, ক্রীড়া দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকলে অন্তত ১০ বছরের জেলের বিধান করে একটি কঠোর আইন হওয়া উচিত। দায়িত্ব গ্রহণের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, এই পদে তিনি সফল হতে পারেন আবার ব্যর্থও হতে পারেন, তবে ক্রিকেটের মঙ্গলের জন্য চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি সেই ব্যর্থতার ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অ্যাড-হক কমিটিকে একটি অবাধ নির্বাচন আয়োজনের জন্য ৯০ দিন সময় বেঁধে দিলেও তামিম দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন, তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই, অর্থাৎ মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্বের হাতে বোর্ড তুলে দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আবারও সঠিক পথে ফেরাতে চান।