অর্থনীতিতে একটি পুরনো এবং বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে—যখন অস্ত্রের ঝনঝনানি বাড়ে, তখন সোনার কদরও আকাশ ছোঁয়। অর্থাৎ, যুদ্ধ বা বৈশ্বিক অস্থিরতার সময় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার দাম সাধারণত বেড়ে যায়। কিন্তু সম্প্রতি বিশ্ব অর্থনীতি যেন এই চেনা নিয়মের উল্টো পথেই হেঁটেছে। বিশ্বজুড়ে নানা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত চলার মাঝেই হঠাৎ করে সোনার দামে এক অভাবনীয় পতন দেখা গেছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ৬০২ ডলারে পৌঁছেছিল। কিন্তু মার্চের মাঝামাঝি সময়ে এসে, বিশেষ করে ১৯ মার্চ সকালে তা বেশ বড়সড় ধাক্কা খেয়ে নেমে আসে ৪ হাজার ৮৩২ ডলারে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই আকস্মিক পতনের হাওয়া লাগে বাংলাদেশের বাজারেও। মার্চের শুরুতে যেখানে দেশে ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম ছিল ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪২৮ টাকা, মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে তা প্রায় ৩০ হাজার ৫০০ টাকা কমে গিয়ে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৬ টাকায় দাঁড়ায়।
যুদ্ধের মতো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে মূল্যবান এই ধাতুর দাম কেন এভাবে কমে গেল, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আকস্মিক দরপতনের নেপথ্যে রয়েছে বৈশ্বিক রাজনীতির কিছু অপ্রত্যাশিত সমীকরণ এবং অর্থনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। এই মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভসহ বিশ্বের বড় বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। ব্যাংকের সুদহার বাড়লে বিনিয়োগকারীরা সোনার চেয়ে নগদ অর্থ ব্যাংকে রাখাকেই বেশি লাভজনক মনে করেন, কারণ সেখান থেকে সুদের পাশাপাশি লভ্যাংশও পাওয়া যায়—যা সোনা থেকে মেলে না। এছাড়া যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনেকেই ডলারকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করায় বিশ্বব্যাপী ডলারের চাহিদাও বেড়ে যায়। আর ডলার শক্তিশালী হলে স্বাভাবিকভাবেই সোনার দাম সাময়িকভাবে কিছুটা নিম্নমুখী হয়।
তবে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, সোনার এই দরপতন নিতান্তই সাময়িক একটি সংশোধন। দীর্ঘমেয়াদে এর দাম কমার কোনো বাস্তবসম্মত কারণ নেই, বরং তা ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখীই থাকবে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা কেনার হিড়িক। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর রাশিয়া, চীন, ভারত ও ব্রাজিলের মতো ব্রিকস জোটের সদস্য দেশগুলো ডলারের ওপর নিজেদের নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য ব্যাপক হারে সোনা মজুত করা শুরু করেছে। দেশগুলো প্রতি বছর প্রায় ৭০০ থেকে ৯০০ টন সোনা কিনছে। প্রখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মর্গানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রতি ত্রৈমাসিকেই গড়ে প্রায় ৫৮৫ টন সোনা কিনবে। বিশ্বের এতগুলো শক্তিশালী অর্থনীতি যখন নিজেদের রিজার্ভকে সুরক্ষিত রাখতে ডলার ছেড়ে সোনার দিকে ঝুঁকছে, তখন দীর্ঘমেয়াদে এই ধাতুর মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি একপ্রকার নিশ্চিত।
এর পাশাপাশি বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সোনার চাহিদাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ, চীন-তাইওয়ান উত্তেজনা কিংবা ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর রাজনৈতিক সংকট—সব মিলিয়ে গোটা বিশ্বই এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই অস্থিরতায় বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও শেয়ারবাজার বা অন্যান্য খাতের চেয়ে সোনায় বিনিয়োগ করাকেই বেশি নিরাপদ মনে করছেন। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফের মাধ্যমে সোনায় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ আসছে। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে ইটিএফে লেনদেন ৬৭ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সোনার যোগান সেভাবে বাড়ছে না। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, খনি থেকে সোনার উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ এবং রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমেও সরবরাহ তেমন একটা বাড়েনি। এই বিপুল চাহিদা আর সীমিত যোগানের কারণেই গোল্ডম্যান স্যাকস ধারণা করছে ২০২৬ সালের শেষে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ৪০০ ডলারে পৌঁছাবে, আর জেপি মর্গানের মতে তা ৬ হাজার ৩০০ ডলার পর্যন্তও ছুঁতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই ভবিষ্যৎ সমীকরণ বেশ পরিষ্কার হলেও, বাংলাদেশের সোনার বাজারের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বেশ হতাশাজনক। সারা বিশ্বে সাধারণত নিজ নিজ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনার দাম নিয়ন্ত্রণ করলেও, বাংলাদেশে এই দায়িত্ব পালন করে ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাজার নিয়ন্ত্রণে সাধারণ ক্রেতাদের চেয়ে ব্যবসায়ীদের স্বার্থই বেশি প্রাধান্য পায়। অভিযোগ রয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম একটু বাড়লেই বাজুস সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে দাম বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম কমলে সেই সুফল ক্রেতাদের সহজে দিতে চায় না। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে বিশ্ববাজারে সোনার দাম হিসাব করলে প্রতি ভরি ২ লাখ ২০ হাজার টাকার আশেপাশে থাকার কথা থাকলেও, বাজুস তা বিক্রি করছে প্রায় আড়াই লাখ টাকায়। এই সিন্ডিকেটের কারণেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বা দুবাইয়ের তুলনায় বাংলাদেশের বাজারে সবসময়ই ভরিতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা বেশি গুনতে হয় ক্রেতাদের।
বাংলাদেশে সোনার কোনো খনি নেই এবং বাৎসরিক প্রায় ৪০ টন সোনার পুরো চাহিদাই মেটানো হয় আমদানি ও পুরনো সোনা রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, দেশে বৈধ পথে সোনা আমদানির পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায়। ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, বৈধভাবে মাত্র ২৫ কেজি সোনা দেশে এসেছিল, অথচ একই বছর কেবল বিমানবন্দর দিয়ে যাত্রীদের মাধ্যমে দেশে ঢুকেছে ৫৪ টন সোনা। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারের এই বিস্তর ফারাক এবং ডলারের আকাশচুম্বী দামের কারণেই বৈধ আমদানির চেয়ে দুবাই থেকে সোনার বার কিনে আনাতেই ব্যবসায়ীদের বেশি আগ্রহ। এর ফলে বিশাল বাজার থাকা সত্ত্বেও দেশের এই শিল্পটি নিজস্ব কোনো স্বকীয়তা বা নকশা তৈরি করতে পারেনি, বরং এটি ভারত ও দুবাইয়ের অনুকরণ নির্ভর একটি খুচরা ব্যবসাতেই আটকে আছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এটি স্পষ্ট যে, ভূরাজনৈতিক সংকট, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনাপ্রীতি এবং যোগান ঘাটতির কারণে বিশ্ববাজারে সোনার দাম সামনে আরও বাড়বে, আর বাংলাদেশের একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থার কারণে এখানকার ক্রেতাদের জন্য স্বস্তির কোনো খবর সহসাই মিলছে না।