• মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১৮ পূর্বাহ্ন
Headline
পড়ালেখায় আগ্রহ হারাচ্ছে কিশোররা আয়-ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়ে টিআইবির গবেষণা: দলগুলোর এত টাকা আসে কোথা থেকে রাজস্ব ঘাটতি ও পে-স্কেলের চাপে সরকারের ব্যাংক ঋণ: চার মাসেই ৪৮ হাজার কোটি টাকার নিট ঋণ বেসরকারি খাতের বড় সংকট: অবসরের নির্দিষ্ট আর্থিক পরিকল্পনা নেই দেশের ৮১ শতাংশ কর্মীর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অভিযানের ইঙ্গিত, যা বললো রাশিয়া জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও মজুরির ব্যবধান: অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের অন্তরায় শীতে ঘাড় ব্যথার কারণ ও প্রতিকার বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ৭ মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পতন এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অগ্নিপরীক্ষা এলজিইডিতে ১৮১ সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ, যোগদান ১০ নভেম্বর

বেসরকারি খাতের বড় সংকট: অবসরের নির্দিষ্ট আর্থিক পরিকল্পনা নেই দেশের ৮১ শতাংশ কর্মীর

Reporter Name / ৪ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

দেশের বাণিজ্যিক খাতে কর্মরত বিশাল জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে এক অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। মেটলাইফ বাংলাদেশ কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত ‘এমপ্লয়ি বেনিফিট ট্রেন্ডস স্টাডি বা ইবিটিএস ২০২৬’ শীর্ষক এক সাম্প্রতিক গবেষণামূলক জরিপে দেখা গেছে যে দেশের বেসরকারি খাতের প্রায় ৮১ শতাংশ কর্মীর চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর জীবনযাপন করার জন্য কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট আর্থিক পরিকল্পনা বা সঞ্চয় নেই। অথচ ঠিক আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে এই হার ছিল মাত্র ৫৩ শতাংশের কাছাকাছি। এক বছরের ব্যবধানে বেসরকারি চাকরিজীবীদের মাঝে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাহীনতার এই দ্রুত উল্লম্ফন দেশের শ্রমবাজার ও সামাজিক নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

চলতি বছরের আগস্ট মাসে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও করপোরেট খাতের মোট ৭০৯ জন ব্যক্তির ওপর এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। অংশগ্রহণকারী এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৫৮৩ জন ছিলেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন কর্মরত সাধারণ কর্মী এবং বাকি ১২৬ জন ছিলেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগকর্তা কিংবা আর্থিক সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণের দায়িত্বে থাকা শীর্ষ কর্মকর্তা। তৈরি পোশাক শিল্প, এনজিও বা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ফাস্ট মুভিং কনজ্যুমার গুডস বা এফএমসিজি, টেলিযোগাযোগ এবং খুচরা বিক্রয় কেন্দ্রসহ দেশের সকল প্রধান খাতের প্রতিনিধিদের এই গবেষণার আওতায় আনা হয়েছিল।

জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বর্তমান বাজার অর্থনীতির চরম প্রতিযোগিতায় জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং মুদ্রাস্ফীতির যাঁতাকলে পড়ে বেসরকারি খাতের কর্মীরা প্রতিদিন হিমশিম খাচ্ছেন। বর্তমানের এই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চড়া দাম এবং পরিবারের তাৎক্ষণিক চাহিদা বা দৈনন্দিন খরচ মেটাতে গিয়েই সিংহভাগ কর্মীর মাসিক আয়ের পুরোটাই শেষ হয়ে যায়, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সঞ্চয় করা বা ভবিষ্যতের পুঁজি গড়ার সুযোগ তাদের আর থাকে না। মেটলাইফ বাংলাদেশের হেড অব মার্কেটিং অ্যান্ড প্রোডাক্ট নওফেল আনোয়ার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী বর্তমানে প্রচণ্ড বড় ধরনের খরচের চাপে জীবন কাটাচ্ছেন, যেখানে আয়ের তুলনায় ব্যয়ের খাত ও চাহিদা বহুগুণ বেড়ে গেছে।

অপ্রত্যাশিত আর্থিক এই চাপ কেবল কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবনকেই দুর্বিষহ করে তুলছে না, বরং তাদের পেশাগত কাজের ওপরও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭২ শতাংশ কর্মী খোলাখুলিভাবে স্বীকার করেছেন যে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের কারণে তাদের কর্মক্ষমতা ও কাজের মান ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। আর্থিক অস্বস্তির কারণে কর্মীরা অফিসে পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে পারছেন না, যার ফলশ্রুতিতে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাও ব্যাহত হচ্ছে। আর ঠিক এই বাস্তব কারণেই চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো দূরদর্শী কোনো পরিকল্পনা করার মানসিক পরিস্থিতি বা সামর্থ্য এই কর্মীদের আর অবশিষ্ট থাকছে না।

চাকরিজীবীদের এই ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতার প্রেক্ষাপটে কর্মীরা এখন তাদের ভবিষ্যৎ আর্থিক সুরক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে না রেখে বরং সরাসরি নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্পণ করতে চাচ্ছেন। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৮১ শতাংশ কর্মী জোরালোভাবে মতামত প্রকাশ করেছেন যে তাঁদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, বরং এটি সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তারও অন্যতম প্রধান সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। এছাড়া প্রায় ৮৬ শতাংশ কর্মী প্রবলভাবে প্রত্যাশা করেন যে তাঁদের কর্মসংস্থানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেন অবসরকালীন সঞ্চয় তহবিলে সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করে, যাতে কর্মজীবন শেষে তাঁরা চরম আর্থিক দুর্দশার মুখে না পড়েন।

কর্মীদের প্রত্যাশা এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব চিত্রের মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান বা দূরত্ব এখনো রয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭৩ শতাংশ কর্মী জীবনবিমাকে তাদের জীবনের অত্যন্ত জরুরি ও অপরিহার্য একটি সুরক্ষা হিসেবে বিবেচনা করলেও মাত্র ৩৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে বাস্তবে এই জীবনবিমা বা এসংক্রান্ত সুযোগ চালু রয়েছে। এই ব্যবধান প্রমাণ করে যে বেসরকারি খাতের সিংহভাগ প্রতিষ্ঠান এখনো তাদের কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ ও জীবনঝুঁকি নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে যথেষ্ট উদাসীন রয়ে গেছে।

তবে এই তীব্র হতাশা ও আর্থিক চাপের মধ্যেও প্রযুক্তির উৎকর্ষ এবং কর্মক্ষেত্রের ইতিবাচক কিছু পরিবর্তনের কথা গবেষণায় উঠে এসেছে। দ্রুত বদলে যাওয়া আধুনিক কর্মক্ষেত্রে দৈনন্দিন কাজের চাপ এবং মানসিক অবসাদ কমাতে বেসরকারি খাতের কর্মীরা এখন ব্যাপকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছেন। জরিপ অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের প্রায় ৫৫ শতাংশ অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি কর্মী তাঁদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিচ্ছেন। এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারী কর্মীদের প্রায় ৯১ শতাংশই আনন্দিত হয়ে জানিয়েছেন যে তাদের দৈনন্দিন জীবনে এআই ব্যবহারের ফলে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বহুল ব্যবহারের ফলে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি সামগ্রিক কর্মদক্ষতাও বহুলাংশে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জটিল ও গতানুগতিক কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন হওয়ায় কর্মীদের ওপর থেকে কাজের মানসিক চাপ অনেকখানি হালকা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানে সহানুভূতিশীল সংস্কৃতি বা যাকে ‘কেয়ার কালচার’ বলা হয়, তার উপস্থিতি কর্মীদের কাজের সন্তুষ্টি বাড়াতে জাদুকরি ভূমিকা পালন করছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা অনুভব করেন যে তাঁদের নিয়োগকর্তা ও উচ্চপদস্থ ব্যবস্থাপকেরা তাঁদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত কল্যাণ নিয়ে আন্তরিকভাবে ভাবছেন, সেসব কর্মক্ষেত্রে চাকরির সন্তুষ্টির হার অবিশ্বাস্যভাবে ৯২ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে।

সার্বিক দিক বিবেচনা করলে, দেশের বেসরকারি খাতের সামগ্রিক কাজের সন্তুষ্টির হার আগের বছরের ৭৮ শতাংশ থেকে কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সালে এসে প্রায় ৮৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে চাকরির প্রতি এই সাময়িক সন্তুষ্টি বা ভালো লাগা থাকলেও চাকরিজীবীদের দীর্ঘমেয়াদি অবসরকালীন জীবনের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে যে অন্ধকার মেঘ জমে রয়েছে, তা সহজে কেটে যাওয়ার নয়। বর্তমান সময়ে তরুণ ও মধ্যবয়সী বেসরকারি কর্মীরা যেভাবে ভবিষ্যৎ সঞ্চয় ছাড়াই দিন কাটাচ্ছেন, তাতে আগামী দিনে অবসর গ্রহণের পর সমাজে এক বিশাল প্রবীণ জনগোষ্ঠী ভয়াবহ আর্থিক ও মানবিক সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে সমাজবিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে বেসরকারি খাতের কর্মীদের এই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান থেকে উদ্ধার করতে হলে কেবল কর্মীদের ব্যক্তিগত সচতেনতা বাড়ালেই চলবে না, বরং সরকারকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বাধ্যতামূলক পেনশন বা প্রভিডেন্ট ফান্ডের কঠোর বিধান চালু করতে হবে। পাশাপাশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের করপোরেট সামাজিক দায়িত্ব বা সিএসআরের অংশ হিসেবে কর্মীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।

সব মিলিয়ে মেটলাইফ বাংলাদেশের এই সাম্প্রতিক জরিপটি দেশের শ্রমবাজারের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক নীরব সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। বর্তমানের এই চরম অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবিলম্বে কার্যকর অবসরকালীন আর্থিক পরিকল্পনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের কোটি কোটি বেসরকারি কর্মীর ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার আবর্তে হারিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র: ডেলটা নিউজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category