• বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১২ অপরাহ্ন

ভোরের রাজধানী ভয়ংকর

Reporter Name / ১ Time View
Update : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

যান্ত্রিক এই শহরের কোলাহলমুক্ত নিস্তব্ধ ভোর এখন আর নগরবাসীর জন্য কোনো প্রশান্তি বা স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে না| বরং রাতের অন্ধকার কাটতে না কাটতেই রাজধানীর প্রশস্ত রাজপথ ও অলিগলিগুলো পরিণত হচ্ছে এক ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী মৃত্যুফাঁদে| ভোরের ফাঁকা রাস্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির সাময়িক ঘাটতি বা টহল ব্যবস্থার দুর্বলতাকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে কাজে লাগিয়ে একদল সংঘবদ্ধ, বেপরোয়া ও সশস্ত্র অপরাধী সাধারণ মানুষের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে| বিশেষ করে গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী বাস টার্মিনাল, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এবং কমলাপুর রেলস্টেশনসহ যেসব গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দিয়ে দূরপাল্লার যাত্রীরা যাতায়াত করেন, মূলত সেসব জায়গার পথে পথেই ওত পেতে থাকছে এই ভয়ংকর ও পেশাদার ছিনতাইকারী চক্র| গ্রাম বা মফস্বল থেকে আসা ক্লান্ত যাত্রীরা যখন নিজেদের গন্তব্যে যাওয়ার জন্য বাস, ট্রেন বা লঞ্চ থেকে নেমে পায়ে হেঁটে কিংবা রিকশা বা সিএনজিতে ওঠেন, ঠিক তখনই টার্গেটকৃত ওই যাত্রীদের সুবিধাজনক বা নির্জন জায়গায় পেয়ে ছোঁ মেরে কিংবা গলায় ছুরি ও চাপাতি ঠেকিয়ে সবকিছু লুট করে নেওয়া হচ্ছে| মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারে ঘুরে বেড়ানো এই ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যদের কাছে চলন্ত রিকশা কিংবা অটোরিকশা যাত্রীদের হাত থেকে হ্যাঁচকা টানে ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া এখন রীতিমতো শহরের এক ‘স্বাভাবিক নিয়মে’ পরিণত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর ও স্থায়ী অজানা ভীতির জন্ম দিয়েছে|
ছিনতাইকারীদের এই আগ্রাসী, নির্দয় ও অমানবিক আচরণের শিকার হয়ে সম্প্রতি বেশ কয়েকজন নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু গোটা দেশকে গভীরভাবে শোকাহত করেছে এবং একই সঙ্গে ভোরের ঢাকার সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক বিশাল প্রশ্নবিদ্ধ কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে| সবশেষ গত ২৯ আগস্ট ভোর সাড়ে ৬টার দিকে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার সামনের সড়ক দিয়ে রিকশায় করে হাসপাতালে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে চলন্ত রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান বগুড়ার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন (৫৫)| চোখের ডাক্তার দেখাতে স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় এসে তাকে যে এভাবে অকালে ও নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারেনি| রাজধানী ঢাকায় এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা একক ঘটনা নয়, বরং এমন মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা নগরীর বিভিন্ন স্থানে নিয়মিতই ঘটছে| এর আগে ২০২৩ সালের ১ জুলাই ভোর সোয়া ৪টার দিকে ফার্মগেটে ছিনতাইকারীদের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে নিহত হন ডিএমপির পুলিশ কনস্টেবল মনিরুজ্জামান তালুকদার| একইভাবে ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর কেরানীগঞ্জে ভোরের দিকে ছিনতাইকারীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন অটোরিকশাচালক মো. নয়ন (২৫)| গত ছয় মাসে কেবল চলন্ত বাহন থেকে ব্যাগ টান দেওয়ার ফলে মোট তিন জন নারীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে| এমনকি ছিনতাইয়ের টাকার ভাগাভাগি বা দ্বন্দ্ব নিয়ে শ্যামপুর বরইতলা এলাকায় সহযোগীর ছুরিকাঘাতে জনি নামে এক ছিনতাইকারী নিজেও খুন হয়েছেন|
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকায় ভোরবেলা বা রাত ২টার পর থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত সময়টাতে ছিনতাইয়ের ঘটনা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত কারণ রয়েছে| প্রথমত, মধ্যরাতের পর থেকে সকাল পর্যন্ত রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক একেবারেই ফাঁকা হয়ে যায়, ফলে অপরাধীরা তাদের কাজ শেষে কোনো ধরনের ট্রাফিক জ্যাম ছাড়াই অতি দ্রুতগতিতে পালিয়ে যাওয়ার অবাধ সুযোগ পায়| দ্বিতীয়ত, ভোরে বাস, ট্রেন বা লঞ্চ থেকে নামা যাত্রীদের চলাচল সাধারণত অনুমানযোগ্য এবং নির্দিষ্ট কিছু রুটেই তারা যাতায়াত করেন, যা আগে থেকেই ছিনতাইকারীদের নখদর্পণে থাকে| তৃতীয়ত, এই নির্দিষ্ট সময়ে রাস্তার আশপাশের দোকানপাট এবং অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় রাস্তায় কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা সাধারণ মানুষের ভিড় থাকে না, যার ফলে অপরাধীদের মধ্যে ধরা পড়ার বা গণপিটুনির শিকার হওয়ার ভয় তুলনামূলক অনেক কম থাকে| এছাড়া সম্প্রতি সময়ে ছিনতাইকারীরা তাদের কৌশলে নতুনত্ব এনেছে| রাত ১০টার পর বিভিন্ন সড়ক থেকে অটোরিকশায় করে যাত্রীদের তুলে নিয়ে এক ধরনের ‘মিনি অপহরণ’ করা হচ্ছে| এরপর নির্জন স্থানে নিয়ে অস্ত্রের মুখে সবকিছু লুটে নেওয়ার পর তাদের আবার রাস্তাতেই ফেলে যাওয়া হচ্ছে, যা নগরীর নৈশকালীন নিরাপত্ত ব্যবস্থাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে|
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাছে থাকা তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই অপরাধী চক্রের এক বিশাল ও সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে| বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় ডিএমপির তালিকাভুক্ত প্রায় এক হাজার তিনশ সাতাশি থেকে শুরু করে চৌদ্দশর মতো পেশাদার ছিনতাইকারী অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে| এর বাইরেও রাজধানীজুড়ে হাজারের বেশি ভাসমান বা অস্থায়ী ছিনতাইকারী রয়েছে, যারা মূলত ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে এসে একসঙ্গে কয়েকটি ঘটনা ঘটিয়ে আবার নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যায়| ডিএমপির তথ্য বলছে, তালিকাভুক্ত এই ছিনতাইকারীদের মধ্যে ওয়ারী বিভাগে সর্বোচ্চ ৩০৮ থেকে ৩৪০ জন সক্রিয় রয়েছে| এরপরেই তেজগাঁও এবং উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন করে এবং মতিঝিলে ১৬৮ জন সক্রিয় রয়েছে| ঢাকার ৫০টি থানা এলাকায় তিন শতাধিক থেকে শুরু করে চার শতাধিক ছিনতাইয়ের হটস্পট বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পুলিশের খাতায় চিহ্নিত করা হয়েছে| এর মধ্যে মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকাতেই সবচেয়ে বেশি ১০৮টি হটস্পট রয়েছে| এছাড়া পল্লবী, যাত্রাবাড়ী, দারুসসালাম, বিমানবন্দর, কোতোয়ালি, শেরেবাংলানগর এবং খিলক্ষেত এলাকার বিভিন্ন নির্জন সড়কও ছিনতাইয়ের বড় আখড়ায় পরিণত হয়েছে| পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ঢাকা শহরে ছিনতাই সংক্রান্ত মোট ৫৩১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৪৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে| আর ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ১৭২টি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪০২ জনকে| তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনি ঝামেলা এড়াতে কিংবা খোয়া যাওয়া মালামাল উদ্ধারের কোনো আশা না থাকায় অনেক ভুক্তভোগীই পুলিশের কাছে সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করেন না, ফলে প্রকৃত ছিনতাইয়ের ঘটনার সংখ্যা আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানের চেয়েও বহুগুণ বেশি|
ছিনতাইকারীদের এই বেপরোয়া তাণ্ডব প্রতিরোধ করতে এবং নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বেশ নড়েচড়ে বসেছে এবং কিছু নজিরবিহীন ও বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে| ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গনি জানিয়েছেন, রাজধানীতে ছিনতাই প্রতিরোধে মধ্যরাত থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত এক বিশেষ ধরনের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে| গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও নির্জন সড়কগুলোতে অন্তত ৮৯টি বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়ে পুলিশ নিবিড়ভাবে কাজ করছে| প্রতিটি চেকপোস্টে একজন অফিসারের নেতৃত্বে অন্তত আটজন করে ফোর্সের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে| একই সঙ্গে ডিএমপির প্রতিটি থানা থেকে চার থেকে পাঁচটি মোবাইল পেট্রোল টিম মাঠে নামানো হয়েছে, যারা ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহল দিচ্ছে| ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, এই বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় শুধু ৮৯টি চেকপোস্ট ও থানাভিত্তিক মোবাইল পেট্রোল টিমে প্রায় দুই হাজার একশ বারো থেকে শুরু করে আড়াই হাজার পুলিশ সদস্য মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত মাঠে থেকে ছিনতাই প্রতিরোধে নিরলস কাজ করছেন| ডিএমপির মুখপাত্র মো. আকতার হোসেন জানান, রাতের ঢাকাকে নিরাপদ করার জন্য প্রতিটি জোনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ঘুরে ঘুরে এই টহল কার্যক্রম তদারকি করছেন এবং সাদা পোশাকেও গোয়েন্দারা তথ্য সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন|
তবে পুলিশের এই নানামুখী উদ্যোগ ও চিরুনি অভিযানের পরও ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য কেন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমছে না, তার এক চাঞ্চল্যকর ও কাঠামোগত দুর্বলতার দিক তুলে ধরেছেন অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডক্টর তৌহিদুল হক| তার মতে, ছিনতাই প্রতিরোধে সরকার এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রবল সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা দেখা গেলেও, মাঠপর্যায়ে সেই সদিচ্ছার পরিপূর্ণ ও সফল বাস্তবায়ন হচ্ছে না| এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই অপরাধীদের নেপথ্যে থাকা গডফাদার বা প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়া| এছাড়া আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে নিশ্চিত না হওয়া, দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিট প্রদান এবং আদালত প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠা শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেটের কারণে গ্রেপ্তারকৃত ছিনতাইকারীরা অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই অনায়াসে জামিনে বের হয়ে আসে| অনেক ক্ষেত্রে তাদের মাত্র কয়েকদিন হাজতবাস করতে হয় এবং জামিনে মুক্তি পেয়েই তারা আবার তাদের সেই পুরনো পেশায় ফিরে গিয়ে আগের চেয়েও বেশি বেপরোয়া ও সহিংস হয়ে ওঠে| ডক্টর তৌহিদুল হক অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, পুলিশ যদি এই ধরনের পেশাদার অপরাধীদের বিষয়ে আরও কঠোর ও তৎপর না হয় এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার মতো নিখুঁত চার্জশিট প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হয়, তবে আইনের ফাঁকফোকর গলে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাবে এবং নিস্তব্ধ ভোরের রাস্তায় নিরীহ মানুষের তাজা রক্ত ঝরার এই অমানবিক মিছিল চলতেই থাকবে|


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category