• সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ০৫:২৮ অপরাহ্ন
Headline
মেধাবীদের ১০টি সিক্রেট নেপথ্যের অনুচ্চারিত নায়িকারা… বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনে যোগ দিতে দক্ষিণ কোরিয়া গেলেন এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বাংলাদেশ কেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলেনি: কারণ খতিয়ে দেখতে মন্ত্রণালয়ের কমিটি গঠন তরুণীর গোপন গেমিং জীবন ও স্বপ্ন পূরণের গল্প নিয়ে মাইক্রো ড্রামা ‘সিলভার সাদিয়া’ গর্ভের সন্তান ছেলে না মেয়ে, তা প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি: হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ প্রতিটি মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়তে রাষ্ট্র হবে সহায়ক শক্তি: ডা. জুবাইদা রহমান সরকার বা পদ কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়: পুলিশ সপ্তাহে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার কড়া বার্তা প্রধানমন্ত্রীর পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা বাড়ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: আক্রান্ত ছাড়াল ৫০ হাজার, মৃত্যু ৪১৫

মমতার নীতি থেকে সরে প্রথম দিনেই সীমান্তে বিএসএফকে জমি দেওয়ার নির্দেশ পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের

Reporter Name / ২ Time View
Update : সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় পটপরিবর্তনের পর রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দপ্তর নবান্নে আজ রচিত হলো এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়। শনিবার পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর আজ সোমবার প্রথমবারের মতো নবান্নে নিজের কার্যালয়ে বসেছেন শুভেন্দু অধিকারী। ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম দিনেই তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, প্রশাসনিক কাজে কোনো রকম কালক্ষেপণ করতে রাজি নয় তার সরকার। রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ন, দীর্ঘদিনের বকেয়া কাজ সম্পন্ন করা এবং বিশেষ করে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের যে প্রতিশ্রুতি তারা নির্বাচনী প্রচারণায় দিয়েছিলেন, প্রথম দিনেই তার বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। নবান্নের চোদ্দ তলার নির্দিষ্ট কক্ষে অনুষ্ঠিত প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই সীমান্ত সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে যুগান্তকারী সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যা রাজ্যবাসীর নজর কেড়েছে।

সোমবার সকাল থেকেই নতুন মুখ্যমন্ত্রীর দিনলিপি ছিল চূড়ান্ত কর্মব্যস্ততায় ভরপুর। সল্টলেকের দলীয় কার্যালয়ে বেশ কয়েকটি দলীয় কর্মসূচি সেরে বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ তিনি নবান্নে এসে পৌঁছান। সেখানে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে প্রথাগতভাবে ‘গার্ড অফ অনার’ প্রদান করে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়। এরপরই কালবিলম্ব না করে তিনি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা বৈঠকে বসেন। এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিয়ালা, স্বরাষ্ট্র সচিব সঙ্ঘামিত্রা ঘোষ, পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজিপি) সিদ্ধিনাথ গুপ্ত এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দসহ বেশ কয়েকটি দপ্তরের শীর্ষ আধিকারিকরা। রাজ্যের জনগণের নিরাপত্তা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এই বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মুখ্যমন্ত্রী নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বৈঠকের ছবি শেয়ার করে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও জনমুখী প্রশাসন গড়ে তোলাই তার সরকারের মূল লক্ষ্য এবং রাজ্যের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করাকেই তিনি প্রাথমিক অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

বেলা বারোটা নাগাদ মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয় নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক। যদিও মন্ত্রীদের দপ্তর এখনো বণ্টন করা হয়নি, তবুও এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে শপথ নেওয়া পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী—দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, ক্ষুদিরাম টুডু এবং নিশীথ প্রামাণিক। এই বৈঠকেই রাজ্যের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণকারী একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে এসে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই এসব সিদ্ধান্তের কথা গণমাধ্যমের সামনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই ছিল এক গভীর আবেগ এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার ছোঁয়া। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের এই দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে বিজেপির যে ৩২১ জন নেতা-কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে তাদের স্মরণ করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অকালে ঝরে যাওয়া এই মানুষগুলোর পরিবারের প্রতি বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ এবং তাদের হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা হবে। যাদের আত্মবলিদানের মধ্য দিয়ে এই নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের প্রতি সম্মান জানিয়ে সরকার ওই পরিবারগুলোর দায়িত্বভার গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মন্ত্রিসভার অন্যতম বৃহৎ এবং তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে রাজ্যের সীমান্ত সুরক্ষা নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উল্লেখ করেন যে, রাজ্যের জনবিন্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রাজ্যের জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং সীমান্ত সুরক্ষার স্বার্থে আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স বা বিএসএফের হাতে প্রয়োজনীয় জমি তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফ দীর্ঘদিন ধরে যে জমির দাবি জানিয়ে আসছিল, পূর্বতন সরকার তা আটকে রেখেছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, আগের সরকার অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের রাজনৈতিক স্বার্থে বাঁচানোর জন্যই ভূমি দপ্তরকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়নি। কিন্তু নতুন সরকার প্রথম দিনেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিএসএফকে জমি হস্তান্তরে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। ভূমি ও রাজস্ব দপ্তরের সচিব এবং মুখ্যসচিবকে এই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে বিএসএফ যতটা জমি চাইবে, সুরক্ষার স্বার্থে ঠিক ততটা জমিই তাদের প্রদান করা হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় বিজেপির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল রাজ্যে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার প্রতিষ্ঠা করা, অর্থাৎ কেন্দ্রে এবং রাজ্যে একই দলের শাসন থাকলে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হয়। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই সেই ডবল ইঞ্জিন নীতির সফল বাস্তবায়ন দেখা গেছে। পূর্বতন সরকার রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে যে সকল জনকল্যাণমূলক কেন্দ্রীয় প্রকল্প রাজ্যে বাস্তবায়ন করেনি, নতুন সরকার আজ সেগুলো সানন্দে গ্রহণ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রথম ক্যাবিনেটেই রাজ্য সরকার ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বাস্থ্য সচিব, মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরের উপদেষ্টা এবং মুখ্যসচিব এই প্রক্রিয়া অতি দ্রুত সম্পন্ন করবেন। এর পাশাপাশি ‘প্রধানমন্ত্রী জনআরোগ্য যোজনা’, ‘প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা’, ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’, ‘প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা ৩.০’ এবং অন্যান্য সমস্ত সেন্ট্রাল স্পনসরড স্কিমে রাজ্যকে সরাসরি যুক্ত করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, উজ্জ্বলা যোজনার প্রায় আট লাখ পঁয়ষট্টি হাজার আবেদন আগের সরকার কেন্দ্রে পাঠায়নি, যা বর্তমান সরকার অবিলম্বে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। এছাড়া, আইনি কাঠামোর ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এনেছে রাজ্য। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, আগের সরকার সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পুরোনো আইপিসি ও সিআরপিসি আইনই চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এখন থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রবর্তিত নতুন ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হলো।

রাজ্যের বিপুল সংখ্যক বেকার যুবক-যুবতীর জন্য এদিন এক বিশাল সুখবর নিয়ে এসেছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী। মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনের ঊর্ধ্বসীমা একধাক্কায় পাঁচ বছর বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্যের তরুণ সমাজকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, যেহেতু ২০১৫ সালের পর থেকে রাজ্যে সরকারি চাকরিতে সেভাবে কোনো স্বচ্ছ নিয়োগ হয়নি এবং নিয়োগ দুর্নীতির কারণে প্রচুর শিক্ষিত ছেলেমেয়ের সরকারি চাকরির বয়স অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, তাই তাদের প্রতি সুবিচার করতেই এই বয়সসীমা বাড়ানো হলো। এই সিদ্ধান্তে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ চাকরিপ্রার্থী নতুন করে আশার আলো দেখতে পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার আরেকটি বড় প্রমাণ হিসেবে নতুন সরকার আজ থেকেই রাজ্যে জনগণনা বা সেন্সাসের কাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গত ২০২৫ সালের ১৬ জুন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জনগণনা শুরু করার জন্য চিঠি পাঠানো হলেও পূর্বতন সরকার সেই ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে ফেলে রেখেছিল। একে তিনি শুধু রাজ্যের সঙ্গে নয়, বরং সমগ্র দেশ ও সংবিধানের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি অভিযোগ করেন, আগের সরকারের মূল লক্ষ্যই ছিল এই জনগণনা আটকে দিয়ে নারীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মুহূর্ত থেকেই এই কাজ পুনরায় শুরু করার ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছে।

দিনভর একের পর এক বৈঠক এবং ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁর সরকার পূর্ববর্তী সরকারের মতো একনায়কতন্ত্র বা ‘আমিত্ব’ নীতিতে বিশ্বাস করে না, বরং ‘আমরা’ নীতিতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে। ডা. বি. আর. আম্বেদকরের বাণী উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, এই সরকার চলবে ‘ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, অফ দ্য পিপল’ আদর্শে। মন্ত্রিসভার পর দুপুরে রাজ্যের তেইশটি জেলার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে এবং বিকেলে বিজেপির জয়ী প্রার্থীদের সঙ্গেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সারেন। আগামী দিনগুলোতে নির্বাচনী ইশতেহার বা সংকল্পপত্রের অন্যান্য প্রতিশ্রুতিগুলোও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি রাজ্যবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন। পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের কথা না শোনার যে অভিযোগ ছিল, তা দূর করে সমালোচকদেরও কাজ দিয়ে জবাব দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ক্ষমতার পালাবদলের পর নবান্নের এই প্রথম দিনটি শুধু রাজনৈতিক রদবদলেরই নয়, বরং প্রশাসনিক কর্মযজ্ঞে এক অভাবনীয় গতির সূচনা হিসেবেই রাজ্যের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category