• মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১১:১০ পূর্বাহ্ন
Headline
গণমাধ্যম রাষ্ট্র ও সমাজে আয়নার দায়িত্ব পালন করে : তথ্যমন্ত্রী স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য নীতিমালা প্রণয়নে সম্পাদকদের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী সিআইডি-ডিএমপিসহ বিভিন্ন ইউনিটে ৯৩ শিক্ষানবিশ এএসপির পদায়ন শাপলা চত্বরে ‘গণহত্যা’ হয়েছে: চিফ প্রসিকিউটর ২৬ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: তদন্তে হাইকোর্টে রিট ধর্ষণ মামলায় মাগুরার সাবেক এসপি জহিরুলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা খেলাপি ঋণের দুই মামলায় রিজেন্ট সাহেদ ফের গ্রেপ্তার চট্টগ্রামে পিস্তল-গুলিসহ ডেভিড ইমনের ২ সহযোগী গ্রেপ্তার প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ঘিরে কর্মকর্তাদের মাঝে অসন্তোষ নিজের বেতন নিজেই মেটান ভিনি!

বিদেশ থেকে মহাখালীর হাসপাতাল পাড়া নিয়ন্ত্রণ করছে ‘রুবেল বাহিনী’

Reporter Name / ৬০ Time View
Update : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

রাজধানী ঢাকার বক্ষব্যাধি ও ক্যানসার হাসপাতাল এলাকাটি দেশের লাখো মুমূর্ষু রোগীর কাছে এক পরম ভরসার জায়গা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উন্নত চিকিৎসার আশায় মানুষ এখানে ছুটে আসেন। কিন্তু বাইরে থেকে দেখে যা একটি চিকিৎসাকেন্দ্র বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বলে মনে হয়, এর ভেতরে কান পাতলেই শোনা যায় এক ভিন্ন এবং ভয়ংকর গল্প। মহাখালীর এই হাসপাতাল পাড়াটি এখন পরিণত হয়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক অভয়ারণ্যে। আর এই পুরো এলাকার ত্রাস ও একচ্ছত্র আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আজিজ রুবেল নামের এক শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং তার দুর্ধর্ষ বাহিনী। রুবেল বাহিনীর কথায় এখানকার সবকিছু ওঠে আর বসে। তাদের কথার অবাধ্য হলেই নেমে আসে নির্মম শারীরিক নির্যাতন, সশস্ত্র হামলা, এমনকি প্রকাশ্য হত্যার মতো ভয়ংকর পরিণতি। হাসপাতালের কোটি টাকার টেন্ডার থেকে শুরু করে ফুটপাতের দোকান—সবখানেই চলছে রুবেলের রাজত্ব। প্রাণের ভয়ে এখানকার চিকিৎসক, কর্মকর্তা, কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ কেউই মুখ খোলার সাহস পান না।

মহাখালী এলাকার এই অপরাধজগতের মূল হোতা আজিজ রুবেল বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। কিন্তু দেশের বাইরে বসেও তিনি তার বিশাল সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পুরো হাসপাতাল পাড়া নিয়ন্ত্রণ করছেন। জানা যায়, নার্সিং কলেজের এক সাধারণ কর্মচারীর ছেলে এই রুবেল। ছোটবেলা থেকেই বক্ষব্যাধি হাসপাতাল সংলগ্ন বস্তি এলাকায় তার বেড়ে ওঠা। সেই বস্তিটিই এখন তার অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি জায়গার ওপর গড়ে ওঠা এই বস্তি এবং এর আশপাশের ছোট-বড় শতাধিক দোকানপাট সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে রুবেল বাহিনী। অবাক করা বিষয় হলো, এই সরকারি জায়গা থেকে রুবেলের ক্যাডাররা প্রতি বছর কোটি টাকার বেশি ভাড়া বা চাঁদা আদায় করে থাকে। বস্তির সামনের একটি খাবারের দোকান রুবেলের আপন বোন রুমা পরিচালনা করেন। সন্ত্রাসী হামলার পর দোকানটি কিছুদিন বন্ধ থাকলেও রুবেলের প্রভাবে তা আবারও চালু করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, এখানকার প্রতিটি ধূলিকণাও যেন রুবেল বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে।

রুবেল বাহিনীর এই আধিপত্য ধরে রাখার প্রধান হাতিয়ার হলো রক্তের হোলিখেলা। তাদের নির্দেশ অমান্য করলে কী পরিণতি হতে পারে, তার জ্বলন্ত প্রমাণ ক্যানসার হাসপাতালের সাবেক উপপরিচালক ডা. আহমদ হোসেনের ওপর চালানো বর্বরোচিত হামলা। গত ২০ এপ্রিল বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে তিনি যখন তার কর্মস্থল থেকে টিবি গেট এলাকার গলি দিয়ে নিজের বাসায় ফিরছিলেন, ঠিক তখনই মাস্ক পরিহিত দুই দুর্বৃত্ত পেছন থেকে তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। দিনেদুপুরে এমন হামলার পর ওই দুই সন্ত্রাসী বীরদর্পে হেঁটে চলে যায়। তদন্তে জানা যায়, অত্যন্ত সম্মানিত এই চিকিৎসককে হত্যার উদ্দেশ্যে কোপাতে রুবেল মাত্র ২০ হাজার টাকায় ওই সন্ত্রাসীদের ভাড়া করেছিল। এই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা দায়ের করলেও, হামলাকারী এবং তাদের গডফাদারের নাম সবার কাছেই একটি ওপেন সিক্রেট। এই হামলার পর চরম আতঙ্কে ডা. আহমদ আর তার কর্মস্থলে ফিরে যাননি। বাধ্য হয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার জায়গায় অন্য একজন চিকিৎসককে অস্থায়ী দায়িত্ব দিয়েছে।

সন্ত্রাসীদের এই জিঘাংসার শিকার কেবল ডা. আহমদ একা নন। বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সাবেক এক প্রশাসনিক কর্মকর্তাকেও অফিস শেষে বাসায় ফেরার পথে দিনেদুপুরে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করা হয়েছিল। নিজের প্রাণ বাঁচাতে তিনি দ্রুত অন্য হাসপাতালে বদলি হয়ে যান। একই হাসপাতালের বর্তমান উপপরিচালক ডা. আবদুল্লাহ আল মেহেদীও নিজের বাসভবনের সামনে রুবেল বাহিনীর সশস্ত্র হামলার শিকার হয়েছেন। মূলত হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার টেন্ডার নিজেদের কবজায় রাখতেই চিকিৎসকদের ওপর এমন নারকীয় হামলা চালাচ্ছে তারা। টেন্ডার না দিলে সরাসরি হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালককেও টেন্ডারের জন্য এমন প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকরা এক চরম উভয় সংকটের মধ্যে দিন পার করছেন। তারা বলছেন, নিয়ম মেনে কাজ করতে গেলে সন্ত্রাসীরা হত্যার হুমকি দিচ্ছে, আর প্রাণ বাঁচাতে নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজ করলে তারা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হবেন।

টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রকাশ্য চাঁদাবাজির এক মহোৎসব চলছে হাসপাতাল পাড়ায়। মহাখালী নার্সিং মহাবিদ্যালয়ের একটি নির্মাণাধীন ভবনে কাজ চলার সময় ঠিকাদারের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে রুবেলের ক্যাডাররা। চাঁদা না পেয়ে তারা সেখানে প্রকাশ্যে ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক তৈরি করে। ভয়ে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এখন আর মুখ খুলতে চায় না। চাঁদাবাজির এই থাবা থেকে বাদ যায়নি রোগীদের জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দোকানগুলোও। ক্যানসার হাসপাতালের পাশের একটি ফার্মেসিতে চাঁদার দাবিতে একাধিকবার গুলি চালানো হয়েছে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সন্ত্রাসীরা এসে বলে, “টাকা দিবি কি দিবি না?” এবং এরপরই পিস্তল বের করে গুলি চালিয়ে চলে যায়।

তবে রুবেল বাহিনীর সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি দেশবাসী দেখেছিল আজ থেকে নয় মাস আগে। বক্ষব্যাধি হাসপাতালের কর্মচারী ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জামাল হোসেনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে এই সন্ত্রাসীরা। মাস্ক পরা দুই সন্ত্রাসী এসে তাকে নির্মমভাবে খুন করে চলে যায়। এই হত্যাকাণ্ডের পর নিহত জামালের পরিবার এক চরম মানবেতর ও আতঙ্কময় জীবনযাপন করছে। জামালের অবুঝ ছোট কন্যাটি আজও তার বাবাকে আকাশে খুঁজে ফেরে। প্রতিদিন যে বাবা তাকে চকলেট কিনে দিত, তাকে ঘুম পাড়াত, সেই বাবার শূন্যতা শিশুটির কান্না হয়ে ঝরে পড়ে। অন্যদিকে, এই খুনের ঘটনায় মামলা দায়ের করার পর প্রধান আসামি আজিজ রুবেলের বাহিনী নিহতের পরিবারকে অবিরত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রাণনাশের হুমকির মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন জামালের বড় ভাই। নিহত জামালের স্ত্রী চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি জিডি করেছেন, কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হচ্ছে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “যেখানেই যাই, সেখানেই ওদের লোক। ডিবিতে গেলেও দেখি ওদের মানুষ। তাহলে আমরা কার কাছে বিচার চাইব?”

সবচেয়ে বিস্ময়কর ও হতাশাজনক বিষয় হলো, স্বাস্থ্য খাতের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তর’ এই ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে মাত্র এক মিনিটের হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত। ঠিক নাকের ডগায় এমন ত্রাসের রাজত্ব চললেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যেন একেবারেই অসহায়। এই বিষয়ে জানতে চাইলে খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, তাকে এবং তার পরিবারকেও হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “একজন মানুষ যদি প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে থাকেন, তবে তার পক্ষে পেশাগত মনোবল ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন।”

এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, মহাখালী এলাকায় নজরদারি ও পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সেই ফাঁড়ি কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, সে বিষয়ে কেউ সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারছে না। এদিকে, সরকারি কাজে কোনো আপস করবেন না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন কিছু সাহসী কর্মকর্তা। তারা জানিয়েছেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিকভাবেই চলবে, কে হুমকি দিচ্ছে তা নিয়ে তারা আর ভাবতে রাজি নন। কিন্তু বাস্তবে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতো সুরক্ষিত প্রতিষ্ঠানের ঠিক পাশের হাসপাতালগুলোতেই যদি চিকিৎসকদের কুপিয়ে জখম করা হয়, তবে দেশের দূরবর্তী হাসপাতালগুলোর চিকিৎসকদের নিরাপত্তা কতটা ভঙ্গুর, তা সহজেই অনুমান করা যায়। রুবেল বাহিনীর এই লাগামহীন দৌরাত্ম্য কেবল একটি নির্দিষ্ট এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নয়, বরং এটি সমগ্র দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় অশনিসংকেত।

তথ্যসূত্র: যমুনা নিউজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category