• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২১ পূর্বাহ্ন
Headline
মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র নাকি মতাদর্শের কারাগার: উচ্চশিক্ষালয়ে ক্রমবর্ধমান দমনপীড়ন ও সংকটের স্বরূপ বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ২ ইসরায়েলে আরও একটি প্যাট্রিয়ট পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সাত বছরে ছয় নির্বাচন, কেন থিতু হতে পারছে না ইসরায়েল? ৫৫ বছরে সবজির দাম স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগ নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাপক লুটপাট করেছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঠাকুরগাঁও উপ-নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই : ইসি সচিব ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমন ৭ দিনের রিমান্ডে আগামীতে স্কুল-মাদ্রাসায় একই প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হবে: শিক্ষামন্ত্রী ঢাকা শহরে পদ্মা থেকে ১০০ কোটি লিটার পানি সরবরাহের নতুন প্রকল্প

মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্র নাকি মতাদর্শের কারাগার: উচ্চশিক্ষালয়ে ক্রমবর্ধমান দমনপীড়ন ও সংকটের স্বরূপ

Reporter Name / ০ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

উচ্চশিক্ষালয় কেবল গতানুগতিক জ্ঞান বিতরণের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কারখানা নয়; বরং এটি হলো এমন এক পবিত্র অভয়ারণ্য, যেখানে প্রচলিত রাষ্ট্রীয় নীতি, প্রতিষ্ঠিত সত্য এবং ক্ষমতার বিভিন্ন সমীকরণ গভীর সমালোচনামূলক মূল্যায়নের মুখোমুখি হয় | স্বৈরাচারী শাসক কিংবা মতান্ধ শক্তি সর্বদা সেই শিক্ষাঙ্গনকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, যা স্বাধীন চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে চায় | ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে দেখা গেছে যে, ফ্যাসিবাদের উত্থান কিংবা মতাদর্শিক নিয়ন্ত্রণের প্রথম শিকার হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো | শিক্ষক বরখাস্ত করা, প্রশাসনিক কায়দায় হয়রানি চালানো, পাঠ্যক্রমে অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ করা এবং ভিন্নমত পোষণকারীদের নির্মমভাবে দমন করার মতো অপকৌশলগুলো উচ্চশিক্ষার স্বৈরাচারীীকরণের চেনা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে | রাষ্ট্র বা কোনো বিশেষ মতাদর্শ যখন সত্যের ওপর একাধিপত্য দাবি করে, তখন স্বাধীনভাবে প্রশ্ন তোলার অধিকারটিই অপরাধে পরিণত হয়, যা দিনশেষে একটি গোটা সমাজের অগ্রযাত্রাকে স্থবির করে দেয় |

বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন হরণের এই রাজনৈতিক অপচেষ্টা নতুন কিছু নয় | হিটলারের আমলের নাৎসি জার্মানি থেকে শুরু করে সমসাময়িক ভারতের শিক্ষাক্রমে উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক ইতিহাসের সংযোজন, মার্কিন মুল্লুকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে পুলিশের বর্বর দমনপীড়ন এবং তুরস্ক কিংবা ইরানে মতাদর্শিক শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে শত শত শিক্ষককে ছাঁটাই করার ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, স্বাধীন চিন্তার টুঁটি চেপে ধরার প্রবণতা বিশ্বব্যাপী কতখানি জাঁকিয়ে বসেছে | বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি | দীর্ঘকাল ধরে দলীয় পেটোয়া বাহিনীর দৌরাত্ম্য, আবাসিক হলের জবরদখল এবং তোষামোদকারী প্রশাসনের কারণে দেশের উচ্চশিক্ষালয়গুলোর স্বাভাবিক অ্যাকাডেমিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে কলুষিত হয়েছে | বিশেষ করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর পুরোনো ব্যবস্থার জবাবদিহির জোরালো দাবি উঠলেও, অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতির ধারা বন্ধ হয়নি | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক আনুগত্যের নিরিখে শিক্ষকদের পদচ্যুত করা, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এমনকি তাদের ওপর শারীরিক লাঞ্ছনা ও সহিংসতার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে, যা অতীতে বিভিন্ন আমলের শিক্ষক নির্যাতনের ধারাবাহিকতারই এক নতুন রূপ |

বর্তমানে উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে পুঁজিবাদী নব্য উদারতাবাদ এবং ধর্মীয় উগ্রবাদের এক বিপজ্জনক মিশ্রণ তৈরি হয়েছে, যা ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ সহাবস্থান, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহনশীলতার সংস্কৃতিকে তিলে তিলে গ্রাস করছে | বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক ও যুক্তির লড়াই এখন ক্রমেই সংঘর্ষ ও সংঘাতময় রূপ ধারণ করছে | কোথাও কোথাও ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার করে কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে, যা কোনোভাবেই একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজের জন্য কাম্য হতে পারে না | মতাদর্শিক অনুকূলতা অর্জনের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক লড়াইয়ে শিক্ষাঙ্গনগুলো আজ মুক্তবুদ্ধি চর্চার পরিবর্তে যেন একেকটি সংকীর্ণ দলীয় কার্যালয় বা মতাদর্শিক কারাগারে পরিণত হয়েছে |

একটি কথা স্পষ্টভাবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, প্রকৃত একাডেমিক স্বাধীনতা কেবল চাকরির নিরাপত্তা বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রবিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি হলো সেই শক্তিশালী বর্ম, যা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দায়িত্বকে রক্ষা করে—ভয়হীন চিত্তে সত্যের সন্ধান করা, নিপীড়কের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করানো | তাই উচ্চশিক্ষালয়গুলোকে যেকোনো ধরনের দলীয় প্রভাব, সন্ত্রাসী ছাত্ররাজনীতি এবং ধর্মীয়-রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের কালো থাবা থেকে অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে | শিক্ষাঙ্গনকে ফিরিয়ে আনতে হবে যুক্তির চর্চা, স্বাধীন গবেষণা এবং মুক্তচিন্তার স্বাধীন আস্তানা হিসেবে | কারণ যে সমাজ স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা বা অধিকার হারিয়ে ফেলে, সে সমাজ নিজের ভুল সংশোধন করার শক্তিও চিরতরে হারিয়ে ফেলে | গণতন্ত্রের সুরক্ষার সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনের স্বাধীনতা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত; তাই বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষা করা মানে খোদ গণতন্ত্রকেই বাঁচিয়ে রাখা |


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category