আজ ঐতিহাসিক ১৭ এপ্রিল, মুজিবনগর দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অন্যতম প্রধান এই স্মৃতিকেন্দ্রটি আজ স্রেফ এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় হওয়া হামলায় গুঁড়িয়ে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাস্কর্যগুলো আজও সংস্কার করা হয়নি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের টানা দেড় বছর এবং নির্বাচনের পর গঠিত নতুন রাজনৈতিক সরকারের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযুদ্ধের এই অনন্য স্মারকগুলো পুনরুদ্ধারে চরম অবহেলা লক্ষ করা যাচ্ছে।
হামলার শিকার ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন একশ্রেণির উচ্ছৃঙ্খল জনতা কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্থাপনা না হওয়া সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের এই স্মৃতিপল্লিতে নজিরবিহীন হামলা চালায়। ভেঙে ফেলা হয় দেশের সর্ববৃহৎ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক মানচিত্র এবং এতে থাকা প্রায় সব ভাস্কর্য।
এই মানচিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ৯টি সেক্টরের যুদ্ধকালীন ঘটনাবলি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। ধ্বংস হওয়া স্থাপনাগুলোর মধ্যে ছিল—বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠান, জাতীয় চার নেতার প্রতিকৃতি, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ ও নির্মম হত্যাযজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম পতাকা উত্তোলন এবং প্রাণ বাঁচাতে শরণার্থীদের ভারতে পাড়ি জমানোর ঐতিহাসিক দৃশ্যপট।
হতাশ দর্শনার্থী ও ব্যবসায়ীদের হাহাকার
একসময় সারা বছরই দেশ-বিদেশের হাজারো দর্শনার্থীর পদচারণে মুখর থাকত মুজিবনগর কমপ্লেক্স। কিন্তু এখন সেখানে বিরাজ করছে এক ভুতুড়ে নীরবতা। দেশের ইতিহাস জানতে দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ একবুক হতাশা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
ঢাকা থেকে আসা কলেজশিক্ষার্থী মীর সিয়াম এবং খুলনার গৃহিণী কাজী জান্নাতুল মাওয়ার মতো অনেক দর্শনার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পরিবার নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে এসে তারা কেবল ধ্বংসস্তূপ দেখেছেন। তাদের মতে, ইতিহাসে যদি কোনো ভুল উপস্থাপন থেকেও থাকে, তবে তা সঠিকভাবে প্রতিস্থাপন করা উচিত; কিন্তু এভাবে ভেঙে ফেলে রাখা কোনো সমাধান হতে পারে না।
দর্শনার্থী শূন্যতার কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। মো. নাছিম নামের এক ব্যবসায়ী জানান, ৫ আগস্টের আগে প্রতিদিন যেখানে দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় হতো, এখন ৫০০ টাকা বিক্রি করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে অনেকেই ইতিমধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
ইতিহাস সংরক্ষণের তাগিদ
মেহেরপুর সরকারি মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল আল আমিন ধূমকেতু নির্বিচারে এসব ভাস্কর্য ভাঙার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল প্রথম সরকারের শপথ না হলে মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হয়তো স্রেফ একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দেওয়ার সুযোগ পেত পাকিস্তান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো বিষয়ে বিতর্ক থাকলে তা সংশোধন করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও নিদর্শনগুলো অবিলম্বে সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
কী বলছে কর্তৃপক্ষ?
মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জামাল উদ্দিন ক্ষতির ভয়াবহতা নিশ্চিত করে জানান, হামলায় স্মৃতি কমপ্লেক্সটির প্রায় ৩০০টি ভাস্কর্য ও বিভিন্ন স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ নিরূপণ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দাপ্তরিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। তবে এগুলো সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।