ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় শিশু, বয়োবৃদ্ধ এবং অসুস্থ পরিবারের সদস্যদের দেখভালের মূল দায়িত্বটি অবৈতনিক ও অলিখিতভাবে নারীদের কাঁধেই ন্যস্ত থেকেছে। তবে সমসাময়িক আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এই চিরায়ত পারিবারিক কাঠামোয় এক বড় ধরনের রূপান্তর ঘটছে। গ্রামীণ জনপদ ছেড়ে শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা, যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপান্তর এবং নগরায়নের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়—সব মিলিয়ে একক আয়ের ওপর ভর করে একটি সংসার চালানো এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক কর্মসংস্থানের ধারণার বাইরে গিয়ে এখন সমান্তরালভাবে নারী ও পুরুষ উভয়কেই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হচ্ছে। কিন্তু এই দ্রুত পরিবর্তনশীল নাগরিক জীবনে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে—পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের যত্ন নেওয়ার মতো কেউ থাকছে না। গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় ভোরবেলা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যাওয়া একজন নারী শ্রমিকের কিংবা বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত একজন কর্পোরেট কর্মকর্তার প্রাত্যহিক উদ্বেগ একই সুতোয় গাঁথা; তা হলো নিরাপদ ও সাশ্রয়ী চাইল্ডকেয়ার বা শিশু যত্ন কেন্দ্রের অভাব। এই যে বিপুল সংখ্যক কর্মজীবী মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সংকট, একে কেন্দ্র করেই বিশ্বজুড়ে এক নতুন অর্থনৈতিক ধারণার বিকাশ ঘটেছে, যা ‘কেয়ার ইকোনমি’ বা যত্ন অর্থনীতি নামে পরিচিত।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), ইউএন উইমেন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একাধিক বৈশ্বিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, যত্ন অর্থনীতি কেবল একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আইএলওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭০৮ মিলিয়ন নারী শুধুমাত্র পরিবারের অবৈতনিক যত্নের দায়িত্ব পালনের কারণে শ্রমবাজারের বাইরে ছিলেন। অথচ যথাযথ বিনিয়োগের মাধ্যমে এই যত্ন অর্থনীতি ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৯৯ মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই চিত্রটি আরও বেশি বৈষম্যমূলক এবং একই সঙ্গে সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএন উইমেনের ২০২১ সালের ‘টাইম-ইউজ সার্ভে’ এবং ২০২৫ সালের হালনাগাদ তথ্য বলছে, দেশের নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে প্রায় সাত গুণ বেশি সময় অবৈতনিক গৃহস্থালি ও সেবামূলক কাজে ব্যয় করেন। গড়ে একজন নারী যেখানে প্রতিদিন ৫.৯ ঘণ্টা ব্যয় করেন এই অলিখিত যত্নের পেছনে, সেখানে কর্মসংস্থানমূলক কাজে দেন মাত্র ১.২ ঘণ্টা। এই বিশাল বৈষম্য নারীদের উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ারের অগ্রগতি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ অবদান রাখার পথে এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫৪ শতাংশ কর্মজীবী অভিভাবক মানসম্মত ও সাশ্রয়ী শিশু যত্ন কেন্দ্রের অভাবকে নারীর কর্মসংস্থানে টিকে থাকার প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং ১৮ শতাংশ নারী এই কারণে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
মজার বিষয় হলো, যে অবৈতনিক কাজকে আমরা কেবল পারিবারিক দায়িত্ব বলে এড়িয়ে যাই, অর্থনীতিতে তার অবদান আকাশচুম্বী। ২০২১ সালের এক জাতীয় প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীদের এই অদৃশ্য ও অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৬.৭ ট্রিলিয়ন টাকা, যা ওই বছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৮.৯ শতাংশের সমতুল্য। এই বিশাল অর্থনৈতিক অবদানকে প্রচলিত জিডিপির হিসাবের বাইরে রাখার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। যত্ন অর্থনীতিকে যদি প্রথাগত পোশাক শিল্প, কৃষি কিংবা প্রবাস আয়ের মতো একটি আনুষ্ঠানিক খাত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায়, তবে এটি দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। আইএলও ও ইউএন উইমেনের একটি গাণিতিক মডেলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি তার জিডিপির মাত্র ৩.৯৯ শতাংশ এই যত্ন খাতে বিনিয়োগ করে, তবে ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৭ মিলিয়ন বা ৭০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব, যার ৯১ শতাংশই হবে আনুষ্ঠানিক বা ফর্মাল জব। এর ফলে প্রশিক্ষিত চাইল্ডকেয়ার কর্মী, ডে-কেয়ার ম্যানেজার, বয়োবৃদ্ধদের সেবাদানকারী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সহায়তাকারীদের এক বিশাল পেশাদার বাজার তৈরি হবে।
তবে এই যত্ন অর্থনীতির সম্প্রসারণ যেন কেবল এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী নারীর কাজের বোঝা অন্য এক শ্রেণীর সুবিধাবঞ্চিত ও স্বল্প মজুরির নারীর কাঁধে স্থানান্তরের মাধ্যম না হয়। এই খাতে নিয়োজিত সেবাকর্মীদের জন্য ন্যায্য মজুরি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পেশাগত মর্যাদার আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে। পাশাপাশি, পারিবারিক কাজের দায়িত্ব শুধু নারীর একা—এই প্রথাগত মানসিকতা পরিহার করে পুরুষদেরও ঘরের কাজে সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এখন সময় এসেছে যত্ন অর্থনীতিকে ব্যক্তি বা পারিবারিক স্তরের দায় থেকে মুক্ত করে একটি জাতীয় বিনিয়োগের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ঘোষণা করার। সরকারের নীতি নির্ধারণী মহলে এই উপলব্ধি জাগ্রত হওয়া জরুরি যে, তামাক বা অন্যান্য ক্ষতিকর খাতের সাময়িক রাজস্বের মোহের চেয়ে একটি সুস্থ, সুরক্ষিত ও সমতাভিত্তিক মানবসম্পদ গড়ে তোলা দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি লাভজনক। অবিলম্বে জাতীয় উন্নয়ন এজেন্ডায় ‘কেয়ার ইকোনমি’কে অন্তর্ভুক্ত করে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে সাশ্রয়ী ডে-কেয়ার ও প্রবীণ নিবাস গড়ে তোলার কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করাই এখন সময়ের দাবি।