যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত তৃতীয় সপ্তাহে (১৫তম দিনে) প্রবেশ করেছে। ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র ‘খারাগ দ্বীপে’ মার্কিন বাহিনীর বোমা হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে উত্তেজনা এখন চরমে পৌঁছেছে।
সংঘাতের সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি (একনজরে)
| অঞ্চল/দেশ | ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ও প্রধান ঘটনা |
|---|---|
| ইরান | নিহত অন্তত ১,৪৪৪ জন এবং আহত ১৮,৫৫১ জন। |
| লেবানন | নিহত অন্তত ৭৭৩ জন। চিকিৎসাকর্মী ও জাতিসংঘ ঘাঁটিতে হামলা। |
| ইসরায়েল | ইরানে ৭,৬০০ এবং লেবাননে ১,১০০ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা। তেল আবিবে ইরানের পাল্টা আঘাত। |
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, খারাগ দ্বীপে ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হলেও তেল স্থাপনাগুলোতে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করা হয়নি। তবে ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়, তবে তেল স্থাপনাগুলোই পরবর্তী লক্ষ্য হবে বলে তিনি আল্টিমেটাম দিয়েছেন।
ইরানের পাল্টা হুমকি: তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাদের কোনো জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সংশ্লিষ্ট সব তেল অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
মার্কিন সামরিক মোতায়েন: মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ শত্রুদের প্রতি ‘কোনো দয়া না দেখানোর’ ঘোষণা দিয়েছেন। ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় ১০ হাজার ইন্টারসেপ্টর ড্রোন এবং ২,৫০০ মেরিন সেনাসহ উভচর যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’ মোতায়েন করছে যুক্তরাষ্ট্র।
সর্বোচ্চ নেতা আহত: মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাবি করেছেন, হামলায় ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আহত হয়েছেন। তার অবস্থান বা তথ্য দিলে ১০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
ইসরায়েলে যৌথ হামলা: ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বার্ষিক ‘আল-কুদস দিবস’-এর অংশ হিসেবে ইরানের আইআরজিসি এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ একযোগে ইসরায়েলে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে আতঙ্ক: সৌদি আরব দেশের পূর্বাঞ্চল ও মরুভূমিতে ছয়টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। কাতার সফলভাবে মিসাইল প্রতিহত করেছে। ওমানে ড্রোনের আঘাতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বাহরাইনে নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে জরুরি সাইরেন বাজানো হয়েছে। এই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাহরাইন ও সৌদি আরবে অনুষ্ঠিতব্য ফর্মুলা ওয়ান (F1) রেস বাতিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
লেবাননে মানবিক বিপর্যয়: ইসরায়েলি হামলায় বুর্জ কালাউইয়াহ এলাকায় ১২ জন চিকিৎসাকর্মী (ডাক্তার, নার্স ও প্যারামেডিক) নিহত হয়েছেন। এছাড়া দক্ষিণ লেবাননের মেস আল-জাবালে নেপালি শান্তিরক্ষী বাহিনীর (UNIFIL) সদর দপ্তরেও ইসরায়েলি গোলা আঘাত হেনেছে। হিজবুল্লাহ নেতা নাঈম কাসেম জানিয়েছেন, তারা দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।
ইরাকে মার্কিন দূতাবাসে হামলা: বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসের হেলিপ্যাডে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এতে দূতাবাসের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইরাকের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠায় তুরস্ক নিজ নাগরিকদের সেখানে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
জ্বালানি সংকট ও বিমান ভাড়া: যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে কানাডা ২৩.৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানি খরচ বাড়ার কারণে এয়ার ইন্ডিয়া ও ইন্ডিগোর মতো বড় এয়ারলাইনসগুলো টিকিটের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দিয়েছে।
কূটনৈতিক পরিবর্তন: হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় ভারত, ফ্রান্স ও ইতালির মতো দেশগুলো নিজেদের বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনকে এড়িয়ে সরাসরি ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রভাব হ্রাসের একটি বড় ইঙ্গিত।