ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ কেবল একটি অঞ্চলের সংঘাত নয়, বরং এটি পুরো বিশ্বের জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ইরান যখনই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধের হুমকি দিয়েছে বা জাহাজ চলাচল ব্যাহত করেছে, তখনই কেঁপে উঠেছে বিশ্ববাজার। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার থেকে লাফিয়ে ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া তারই প্রমাণ।
এই সংকট একটি রূঢ় সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে—পুরো বিশ্বের বাণিজ্য আজ অল্প কয়েকটি সরু সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। এই পথগুলোকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘সামুদ্রিক বটলনেক’ বা চলাচলের সরু পথ। নিচে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি সমুদ্রপথের গুরুত্ব ও সেগুলোর বর্তমান ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের সংযোগস্থল এই প্রণালিটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত এবং সংবেদনশীল কৌশলগত পথ। সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের ৩৯ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ১৯ শতাংশ এই এক চিলতে জলপথ দিয়ে যাতায়াত করে।
কেন এটি ঝুঁকির মুখে? গত দুই সপ্তাহে ইরান এই প্রণালিতে এক ডজনেরও বেশি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর আলটিমেটাম এবং ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর চাপের কারণে এই অঞ্চলটি এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায়। যদি দীর্ঘমেয়াদে এই পথ বন্ধ থাকে, তবে কেবল জ্বালানি নয়, বিশ্ব খাদ্য বাজারেও ধস নামবে। কারণ, বিশ্বের একটি বড় অংশের সার রপ্তানি হয় এই পথ দিয়ে। সার সংকটের অর্থ হলো বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং দুর্ভিক্ষ সদৃশ পরিস্থিতি।
মিশরের নিয়ন্ত্রণে থাকা সুয়েজ খাল এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে যাতায়াতের সময় প্রায় ১০ দিন কমিয়ে দেয়। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ১০ শতাংশ এবং কন্টেইনার পরিবহনের ২২ শতাংশ এই খালের ওপর নির্ভরশীল।
ঝুঁকি: ২০২১ সালে ‘এভার গিভেন’ নামক জাহাজ আটকে গিয়ে মাত্র ৬ দিনে ১০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হওয়ার ঘটনা বিশ্ব ভুলে যায়নি। তবে বর্তমানে সুয়েজ খালের চেয়েও বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে এর প্রবেশদ্বার ‘বাব আল-মানদাব’ প্রণালি। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ড্রোন ও রকেট হামলার ভয়ে অনেক কোম্পানি এখন সুয়েজ খাল এড়িয়ে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে যাতায়াত করছে, যা পরিবহন খরচ ও সময় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরকে যুক্ত করা পানামা খাল বৈশ্বিক বাণিজ্যের ২.৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মোট কন্টেইনার কার্গোর ৪০ শতাংশই এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে, যার বার্ষিক মূল্য প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার।
ঝুঁকি: অন্যান্য রুটের মতো এখানে যুদ্ধের ঝুঁকি না থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের ভয়াবহ খরায় খালের পানির স্তর কমে যাওয়ায় জাহাজের সংখ্যা ও আকার সীমিত করতে হয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প খালের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ পুনরায় প্রতিষ্ঠার হুমকি দেওয়ায় এখানে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাও দানা বাঁধছে।
সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মাঝখানে অবস্থিত এই পথটি বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রপথ। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ২৪ শতাংশ এবং অটোমোবাইল বাণিজ্যের ২৬ শতাংশ এই পথ দিয়ে হয়। চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এটি জীবনরেখা; বিশেষ করে চীনের জ্বালানি তেলের ৮০ শতাংশই মালাক্কা দিয়ে আসে।
ঝুঁকি: মালাক্কা প্রণালির প্রধান শত্রু হলো জলদস্যুতা। ২০২৫ সালে এই পথে ১৩০টিরও বেশি জলদস্যুতার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে কোনো সামরিক উত্তেজনা এই পথটিকে স্থবির করে দিতে পারে। এমনকি সুনামির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগও মালাক্কা প্রণালির জন্য বড় ঝুঁকি।
কৃষ্ণ সাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে বের হওয়ার একমাত্র পথ এই তার্কিশ প্রণালি। ইউক্রেন, রাশিয়া ও রোমানিয়ার গম রপ্তানির ২০ শতাংশ এই সরু পথ দিয়ে যায়। এর সর্বনিম্ন প্রস্থ মাত্র ৭০০ মিটার, যা জাহাজ চালনা অত্যন্ত কঠিন করে তোলে।
ঝুঁকি: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর মন্ট্রেক্স কনভেনশন অনুযায়ী তুরস্ক এখানে যুদ্ধজাহাজ চলাচল সীমিত করেছে। কিন্তু এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে বিশ্বব্যাপী গমের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। এছাড়া এই এলাকাটি শক্তিশালী ভূমিকম্প প্রবণ, যা অবকাঠামো ধ্বংসের বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
হরমুজ প্রণালির বর্তমান সংকট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আধুনিক বিশ্ব বাণিজ্য কতটা ভঙ্গুর। পুরো বিশ্বে অন্তত ২৪টি কৌশলগত পয়েন্ট থাকলেও এই পাঁচটি পথ বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো বিশ্ব অর্থনীতিতে হার্ট অ্যাটাক। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, জলদস্যুতা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তন—যে কারণেই হোক না কেন, এই বটলনেকগুলোতে জট লাগলে তার মূল্য দিতে হয় পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের সাধারণ ভোক্তাকে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচেষ্টাই হোক বা বিকল্প কোনো রেল রুট—বিশ্ব বাণিজ্যের এই সরু পথগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমানো এখন সময়ের দাবি।