• শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪০ অপরাহ্ন

রাজপথে নতুন ত্রাস ‘শিশু গ্যাং’: চুরি-ছিনতাইয়ে বেপরোয়া ভাসমান শিশুরা

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গত ১০ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকের ঘটনা এটি। রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা কারওয়ান বাজারের রেললাইন-সংলগ্ন মাছের আড়তের সামনে দিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন এক সাধারণ পথচারী। হঠাৎ করেই তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে আট থেকে নয় বছর বয়সী চারজন ফুটফুটে শিশু। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই বয়সের শিশুদের হাতে থাকার কথা ছিল বই, খাতা কিংবা খেলনা, কিন্তু তাদের হাতে তখন ঝলমল করছিল মৃত্যুভয় জাগানিয়া ধারালো ছুরি। তারা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও বেপরোয়া ভঙ্গিতে ওই পথচারীকে ছুরি দিয়ে ভয় দেখিয়ে তার ব্যবহৃত মূল্যবান মোবাইল ফোন এবং নগদ এক হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। ভুক্তভোগী পথচারী আচমকা এমন পরিস্থিতে পড়ে আতঙ্কে চিৎকার করলেও আশেপাশে থাকা কোনো মানুষ এই শিশুদের হাত থেকে তাকে বাঁচাতে বা সাহায্য করতে এগিয়ে আসার ন্যূনতম সাহসটুকু দেখাতে পারেনি। এরপর কোনো রকম ভয়ডর বা অপরাধবোধ ছাড়াই ওই চার শিশু বীরদর্পে রেললাইনের পাশের ঘুপচি ঘরের অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে যায়। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা কাল্পনিক ঘটনা নয়, বরং ঠিক একই রকম দুঃসাহসিক একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে গত মাসের শেষ সপ্তাহে রাজধানীর উত্তরার আব্দুল্লাহপুর এলাকায়। সেখানে যানজটে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসের খোলা জানালা দিয়ে ছোঁ মেরে এক যাত্রীর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায় দুই শিশু। শুধু কারওয়ান বাজার বা আব্দুল্লাহপুরেই নয়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এখন উঠতি বয়সী কিশোর অপরাধীদের মতোই ভয়ংকর ও বেপরোয়া আচরণ করছে এসব অবুঝ শিশু। সমাজের ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই দিন দিন ভয়ংকর রূপ নিয়ে বিস্তৃত হচ্ছে এই ‘শিশু গ্যাং’ বা শিশু অপরাধীদের সংঘবদ্ধ চক্র।
বিগত কয়েক বছর ধরে আমাদের সমাজে ‘কিশোর গ্যাং’ বা উঠতি বয়সীদের নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সমাজবিজ্ঞানী এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই কিশোর গ্যাংকে ছাপিয়ে নতুন করে গভীর আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই শিশু গ্যাংয়ের নীরব অথচ অত্যন্ত দ্রুত বিস্তার। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সাধারণত নির্দিষ্ট একটি পরিবার, অভিভাবক কিংবা স্থায়ী ঠিকানা থাকে, যা পুলিশ বা প্রশাসনের জন্য তাদের শনাক্ত করা এবং আইনের আওতায় আনা কিছুটা হলেও সহজ করে তোলে। কিন্তু শিশু গ্যাংয়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বহুগুণ বেশি জটিল। পুলিশের অনুসন্ধান বলছে, এই চক্রের সাথে জড়িত শিশুদের অধিকাংশই ভাসমান এবং অভিভাবকহীন। তাদের কোনো নির্দিষ্ট স্থায়ী ঠিকানা নেই এবং তারা মূলত শহরের ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল কিংবা ঘিঞ্জি বস্তি এলাকায় খোলা আকাশের নিচে অযত্নে অবহেলায় বড় হচ্ছে। পরিবারের কোনো শাসন, স্নেহ, দিকনির্দেশনা বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিন্দুমাত্র সুযোগ তাদের জীবনে নেই। সমাজের এই চরম অবহেলা ও সুযোগহীনতার বিষয়টিকে কাজে লাগিয়েই অন্ধকার জগতের পেশাদার অপরাধীরা তাদের খুব সহজে মগজধোলাই করে চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো ভয়ংকর অপরাধের পথে ধাবিত করছে। পুলিশের কাছে ভাসমান শিশুদের গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়ার এই প্রবণতা এখন একটি সম্পূর্ণ নতুন মাত্রার মাথাব্যথা ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিটের গোপন অনুসন্ধান ও সাম্প্রতিক এক বিশদ প্রতিবেদনে এই শিশু গ্যাংয়ের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে অত্যন্ত উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। ওই গোপন বার্তায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মূলত ভাসমান শিশুরাই সংঘবদ্ধ হয়ে চুরি, ছিনতাই এবং চাঁদাবাজির মতো অপকর্মে সরাসরি জড়িয়ে পড়ছে। তারা রাজধানীর বিভিন্ন বস্তি, ফুটপাত এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে নিজেদের নিরাপদ আস্তানা বা আড়াল হিসেবে বেছে নিচ্ছে। একেকটি নির্দিষ্ট এলাকায় তারা ১০ থেকে ২০ জনের ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি করে অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে তাদের অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। রাস্তায় কোনো পথচারীকে একা পেলেই তারা দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করে অস্ত্র ঠেকিয়ে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। একসময় পাড়া-মহল্লায় কিশোরদের মধ্যে দলবদ্ধ আড্ডা, তুচ্ছ বিষয়ে মারামারি কিংবা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের যে অপসংস্কৃতি ছিল, এখন তা শিশুদের মধ্যে সংক্রমিত হয়ে আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, রাজধানীর অন্তত ৫০টি থানা এলাকায় বর্তমানে ১১৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে এবং তাদের পাশাপাশি এই শিশু গ্যাংগুলোও সমান তালে পাল্লা দিয়ে অপরাধ করে যাচ্ছে। সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, এসব শিশু গ্যাংয়ের পেছনে অনেক ক্ষেত্রেই বয়স্ক বা প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীরা সরাসরি যুক্ত থাকছে এবং তারা নেপথ্যে থেকে শিশুদের ব্যবহার করে নিজেদের অর্থনৈতিক ফায়দা লুটে নিচ্ছে।
শিশু গ্যাংয়ের এই নীরব অথচ ভয়ংকর উত্থান নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গভীরভাবে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, সমাজে কিশোর অপরাধীদের পাশাপাশি এখন শিশু গ্যাং গড়ে ওঠার সুনির্দিষ্ট ও চাঞ্চল্যকর তথ্য তাদের হাতে আসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব ভাসমান ও বেপরোয়া শিশুদের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দৃঢ়ভাবে আশা প্রকাশ করেছেন যে, অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এসব অপরাধীকে সমাজ থেকে নির্মূল করা সম্ভব হবে। পুলিশের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সূত্রগুলোও নিশ্চিত করেছে যে, শিশু গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিটি থানাতেই প্রতিদিন অসংখ্য অভিযোগ আসছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ চুরি ও ছিনতাইয়ের। বিশেষ করে ঢাকার মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের কাছে নিয়মিত এই শিশু ও কিশোর গ্যাংয়ের লাগামহীন উৎপাত নিয়ে অভিযোগ করছেন। ছিনতাইয়ের পাশাপাশি তারা এখন পাড়া-মহল্লায় দলবেঁধে চাঁদাবাজিতেও জড়িয়ে পড়ছে। বস্তি, ফুটপাত, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, কাঁচাবাজার ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতেই এদের আস্তানা সবচেয়ে বেশি গড়ে উঠেছে। এসব জায়গায় বসবাসকারী অরক্ষিত ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের একটি বড় অংশ খুব সহজেই অপরাধী চক্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
শিশুদের এই বিপথগামী হওয়ার পেছনের মূল কারণগুলো নিয়ে পুলিশের নিজস্ব একটি গবেষণায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, মূলত তীব্র অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, চরম দারিদ্র্যতা, অপরাধপ্রবণ বন্ধু বা সহপাঠীদের নেতিবাচক প্রভাব এবং শিক্ষার সুযোগের চরম ঘাটতি শিশুদের গ্যাং কালচারে পা বাড়ানোর প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। এর পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালী ‘বড় ভাই’দের ছত্রচ্ছায়া, দলগত পরিচয়ের মাধ্যমে সমাজের কাছে নিজেদের শক্তিশালী হিসেবে তুলে ধরার অদ্ভুত প্রবণতা, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রভাব বিস্তারের মোহ এবং নিজ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের ভ্রান্ত আকাঙ্ক্ষা শিশুদের অপরাধে আকৃষ্ট করছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই প্রসঙ্গের গভীরতা ব্যাখ্যা করে বলেন, যখন কোনো এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক সরবরাহ বা অবৈধ দখলের মতো অপরাধের মাধ্যমে সহজে অর্থ উপার্জনের অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়, তখন সেখানে গ্যাংয়ের নতুন সদস্য সংগ্রহের জন্য অপরাধী চক্রগুলোর একটি প্রচ্ছন্ন প্রণোদনা থাকে। ভাসমান ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের খুব সহজেই প্রলোভন দেখিয়ে প্রভাবিত করা যায়। তাই অপরাধী চক্রগুলো প্রাপ্তবয়স্কদের বদলে এই শিশুদেরকেই তাদের প্রধান টার্গেটে পরিণত করছে। গ্যাংয়ের সদস্যরা দীর্ঘকাল ধরে পরিবার ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে এসব শিশুর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। কিশোর অপরাধীদের মতোই শিশু গ্যাং বর্তমানে হুবহু একই ধরনের অপরাধ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সংঘটিত করছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, আজকের এই শিশু গ্যাংয়ের সদস্যরাই সময়ের পরিক্রমায় একসময় দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাং এবং পরবর্তীতে পেশাদার সন্ত্রাসীতে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ এটি বড়মাপের অপরাধ জগতে প্রবেশের একটি প্রাথমিক সিঁড়ি হিসেবে কাজ করছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এই শিশু অপরাধীরা কিশোর গ্যাংয়ের মতো কোনো অভিজাত বা অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের সন্তান নয়। এদের বেশিরভাগই ভাসমান এবং তারা ফুটপাত ও বস্তিতেই সবচেয়ে বেশি রাত কাটায়। এদের নির্দিষ্ট কোনো অভিভাবক না থাকায় প্রায়ই এরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকে। পুলিশ সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার শতাধিক স্থানকে এই মুহূর্তে অপরাধের হটস্পট বা জোন হিসেবে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরা, বিমানবন্দর, বিশ্বরোড, কদমতলী, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, সদরঘাট, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, কমলাপুর রেলস্টেশন এবং হাইকোর্ট এলাকার মতো ব্যস্ততম জায়গাগুলো অন্যতম। ভাসমান এই শিশুদের সবচেয়ে বড় আস্তানা হলো ঢাকার বিভিন্ন বস্তি। পুলিশের গোপন প্রতিবেদনে ঢাকার মহাখালীর কড়াইল বস্তি, জুরাইন বালুর মাঠ বস্তি, গোপীবাগের টিটিপাড়া বস্তি, মালিবাগের কুমিল্লা বস্তি, মোহাম্মদপুরের বালুর মাঠ বস্তি, মালিবাগের রেললাইন বস্তি, খিলগাঁওয়ের নোয়াখাইল্লা বস্তি, মীর হাজিরবাগ বস্তি, ধলপুর সিটিপল্লী বস্তি, নামাশ্যামপুর বস্তি, গেন্ডারিয়ার রেললাইন বস্তি, পার গেন্ডারিয়া বস্তি, মহাখালীর সাততলা বস্তি, পোস্তগোলা ডিআইটি বস্তি, ডেমরার চরপাড়া বস্তি এবং পূর্ব দোলাইরপাড় ডিপটি গলির বস্তির নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। এসব বস্তিতে শিশু গ্যাংয়ের সদস্যরা শুধু বসবাসই করছে না, বরং তারা সেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে মাদক বেচাকেনার মতো ভয়ংকর অপরাধও নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে। এসব অপরাধীকে এখনই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হওয়ার ঘোর শঙ্কা রয়েছে।
এই ভয়ংকর সমস্যাটি কেবল রাজধানী ঢাকার সীমানার মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন একটি দেশব্যাপী সংকটে রূপ নিতে চলেছে। পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, ঢাকার বাইরেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শহরগুলোতে এই শিশু অপরাধীদের কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কুমিল্লা, ফেনী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শেরপুর, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী, দিনাজপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরা, বগুড়া, ফরিদপুর, পাবনা, টাঙ্গাইল, ঢাকার সাভার, সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরের টঙ্গী এবং কুষ্টিয়া অঞ্চলে কিশোর গ্যাংয়ের পাশাপাশি শিশু গ্যাংয়ের শক্তিশালী উপস্থিতি শনাক্ত করেছে পুলিশ। এই জেলাগুলোর বস্তি এলাকা বা নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসস্থলগুলোতেই এদের বিচরণ সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। শিশু ও কিশোর অপরাধীদের নিয়ে পুলিশের সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ওই বৈঠকে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, আট থেকে দশ বছর বয়সী শিশুরা গ্যাং তৈরি করে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং এদের পরিবারের কোনো খোঁজ না থাকায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ছে। জেলা এবং মহানগর পর্যায়ে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে প্রস্তুত করা তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, মূলত বিভাগীয় শহরগুলোতে এই ধরনের ভাসমান অপরাধীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ হাজারের মতো বস্তি রয়েছে, যার মধ্যে কেবল রাজধানীতেই রয়েছে ১১০টি বড় বস্তি। এই বিপুলসংখ্যক বস্তি, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও ফুটপাতগুলোই মূলত ভাসমান শিশু অপরাধী তৈরির প্রধান উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পুলিশ এখন তাদের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে তাদের আটক করে সংশোধনাগারে পাঠানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
অপরাধ বিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই গভীর সংকটের সমাধান কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দমনমূলক বা কঠোর পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুক এই সংকটের মূলে থাকা সামাজিক ও পারিবারিক চরম অস্থিরতাকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন। তার সুচিন্তিত মতে, সমাজে অপরাধ বেড়ে যাওয়ার পেছনে অসৎ সঙ্গ একটি অত্যন্ত বড় ও ক্ষতিকর নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। পেটের দায়ে ও জীবিকার তাগিদে নিম্নবিত্ত পরিবারের বা ভাসমান শিশু-কিশোররা ছিনতাই, চুরি ও চাঁদাবাজির মতো ভয়ংকর অপরাধে সহজেই জড়িয়ে পড়ছে। অনেক সময় তারা মাদক সেবনের অর্থ জোগাড় করতে কিংবা স্রেফ বয়সের দোষে অ্যাডভেঞ্চার বা রোমাঞ্চের বশবর্তী হয়েও এমন সর্বনাশা অন্ধকার পথে পা বাড়াচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হকও প্রায় একই ধরনের যৌক্তিক মত পোষণ করেছেন। তিনি মনে করেন, সমাজের সুবিধাভোগী ও পেশাদার অপরাধী চক্রটি অত্যন্ত সুকৌশলে এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অপরিণত বয়সের অপব্যবহার করছে। যেহেতু আইন অনুযায়ী শিশুদের কঠোর সাজা দেওয়া কঠিন, তাই এই আইনি ফাঁকফোকরকে কাজে লাগাতেই গ্যাং লিডাররা শিশুদের অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তার মতে, শুধু আইন প্রণয়ন করে বা পুলিশি সাজা দিয়ে সমাজ থেকে এই অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের একটি টেকসই সমাধান করতে হলে এসব সুবিধাবঞ্চিত ও ভাসমান শিশুর দিকে রাষ্ট্র ও সমাজকে মানবিক দৃষ্টিতে বিশেষ নজর দিতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তাদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা, মানসিক কাউন্সেলিং, পারিবারিক স্নেহ বা বিকল্প অভিভাবকত্ব এবং সামাজিক পুনর্বাসনের সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরি না করলে সমাজ থেকে শিশু অপরাধ দমন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category