দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রকল্পটি এখন শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে প্রধান আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে রাশিয়া। কিন্তু কাজ যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে, তখন দুই দেশের সামনে পাহাড়সম এক সংকট এসে দাঁড়িয়েছে—রাশিয়ার পাওনা অর্থ কীভাবে পরিশোধ করা হবে? যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে পাওনা শোধের সব পথই এখন কার্যত বন্ধ। দুই দেশের উচ্চপর্যায়ে দীর্ঘ আলোচনা এবং বিভিন্ন বিকল্প উপায় খোঁজার চেষ্টা চললেও, শেষ পর্যন্ত কোনোটিই আলোর মুখ দেখেনি।
সংকটের মূল কারণ: মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সুইফট (SWIFT) জটিলতা
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাংকগুলোর মধ্যে নিরাপদ অর্থ লেনদেনের বার্তা পাঠানোর একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন বা ‘সুইফট’ (SWIFT)। এটি বিশ্বের সর্বাধিক দেশ ও ব্যাংকের ব্যবহৃত নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে প্রতিদিন কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার লেনদেন হয়। কিন্তু ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর পশ্চিমা দেশগুলো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে সুইফট সিস্টেম থেকে রাশিয়াকে বহিষ্কার করে। মূলত অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ থাকায় এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণেই রাশিয়ার সাথে স্বাভাবিক ব্যাংকিং লেনদেন করা বাংলাদেশের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ঋণের পাহাড় ও বর্তমান আর্থিক চিত্র
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন কর্তৃক বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের মূল ঋণের বাইরেও প্রাথমিক কাজের জন্য বাংলাদেশ রাশিয়ার কাছ থেকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে এই প্রাথমিক ঋণ পরিশোধ শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে তা এক পয়সাও পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। শুধু ঋণ নয়, রাশিয়া থেকে কেনাকাটা করা অন্যান্য সামগ্রীর দায়ও মেটানো যাচ্ছে না।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে রাশিয়ার সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় প্রতি ডলার ৮০ টাকা ধরে প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাশিয়ার দেওয়া এক্সপোর্ট ক্রেডিট বা ঋণের পরিমাণ ছিল ৯১ হাজার কোটি টাকা (১১.৩৮ বিলিয়ন ডলার)। কিন্তু পরবর্তীতে ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাড়ার ফলে প্রকল্পের বর্তমান আকার দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৪১ কোটি টাকায়।
এদিকে, ঋণ পরিশোধের সময়সীমা নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। মূল ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের মার্চ মাস থেকে। অন্তর্বর্তী সরকার এই সময়সীমা দুই বছর পিছিয়ে ২০২৯ সালের মার্চে নির্ধারণের জন্য রাশিয়ার কাছে আবেদন করেছিল। তবে রাশিয়া তা আংশিক মেনে নিয়ে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কিস্তি পরিশোধ শুরুর সময় নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে, প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকে এসক্রো অ্যাকাউন্ট ও জমে থাকা অর্থ
রাশিয়াকে সরাসরি অর্থ পাঠাতে না পারায় বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, রাশিয়ার বিভিন্ন দায় পরিশোধের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে তিনটি ‘এসক্রো’ (Escrow) হিসাব খোলা হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই হিসাবগুলোতে প্রায় ১২০ কোটি ডলার জমা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের বিপরীতে জমা হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ডলার।
এই হিসাব থেকে প্রকল্পের স্থানীয় ঠিকাদারদের বিল এবং সরবরাহকারী দায় পরিশোধসহ বিভিন্ন খাতে একটি অংশ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও, বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের এসক্রো অ্যাকাউন্টে পরিশোধযোগ্য দায়ের পরিমাণ ১০২ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
ব্যর্থ হওয়া বিকল্প উপায়সমূহ
রাশিয়ার পাওনা মেটানোর জন্য গত দুই বছরে একাধিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা হলেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকির মুখে সবগুলোই মুখ থুবড়ে পড়েছে:
১. চীনের মাধ্যমে পরিশোধের চেষ্টা: সরাসরি অর্থ নিতে ব্যর্থ হওয়ার পর ২০২৪ সালের এপ্রিলে রূপপুরের পাওনা পরিশোধের জন্য পিপলস ব্যাংক অব চায়নার মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের একটি প্রটোকল চুক্তিতে সই করে বাংলাদেশ ও রাশিয়া। কিন্তু সুইফট চ্যানেলে চীনের মাধ্যমে অর্থ দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়ার প্রবল আশঙ্কা থাকায় শেষ পর্যন্ত আর এই পথে হাঁটা যায়নি।
২. চীনের ‘সিআইপিএস’ (CIPS) সিস্টেমে যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ: গত বছরের ৫ থেকে ১০ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল চীনে যায়। সেখানে অ্যাকাউন্ট খোলার পাশাপাশি সুইফটের বিকল্প হিসেবে চীনের নিজস্ব লেনদেন ব্যবস্থা ‘সিআইপিএস’-এ যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সিংহভাগই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোতে গচ্ছিত। এছাড়া মোট রপ্তানি আয়ের ৮৫ শতাংশের বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে। ফলে এই বিশাল বাণিজ্য ও রিজার্ভকে ঝুঁকির মুখে ফেলে চীনের সিস্টেমে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চায়নি বাংলাদেশ।
৩. সোনালী ব্যাংকে ফরেইন কারেন্সি (এফসি) অ্যাকাউন্ট প্রস্তাব: গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়া প্রস্তাব দেয়, তাদের পাওনা নেওয়ার জন্য ‘এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট’-এর নামে সোনালী ব্যাংকে কয়েকটি এফসি অ্যাকাউন্ট খোলা হোক। পরিকল্পনা ছিল এসক্রো হিসাব থেকে অর্থ এফসি হিসাবে স্থানান্তর করে রাশিয়া তা নিজেদের মতো করে ব্যবহার করবে। কিন্তু এই প্রস্তাবও বাতিল হয়ে যায়, কারণ সোনালী ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার সব ক্লিয়ারিং অ্যাকাউন্টই যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্র দেশগুলোর সাথে সম্পৃক্ত।
৪. বাংলাদেশে পুনর্বিনিয়োগের প্রস্তাব: কোনো উপায় না দেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি অভিনব প্রস্তাব দেওয়া হয়। সোনালী ব্যাংকের এসক্রো হিসাবে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ একটি নির্দিষ্ট সুদে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই পুনর্বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ। কিন্তু রাশিয়া এখন পর্যন্ত এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি।
জরিমানার প্রসঙ্গ ও বাংলাদেশের অবস্থান
অর্থ পরিশোধে বিলম্ব হওয়ায় রাশিয়া একপর্যায়ে জরিমানা আরোপের কথা তুলেছিল। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান অত্যন্ত শক্ত ও স্পষ্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার কোনো ব্যাংক পেমেন্ট নিতে পারছে না। তাদের দায় পরিশোধের জন্য বিভিন্ন বিকল্প উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সমাধানে আসা যায়নি। ফলে সোনালী ব্যাংকে আলাদা অ্যাকাউন্ট খুলে রাশিয়ার পাওনা জমা রাখা হচ্ছে।”
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ঋণ পরিশোধ না করতে পারার সমস্যাটি বাংলাদেশের দিক থেকে তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ অর্থ প্রস্তুত রেখেছে, কিন্তু তারাই অর্থ নিতে পারছে না। ফলে জরিমানা দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না এবং রাশিয়াকেও বাংলাদেশের এই অনড় অবস্থানের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতের আশা ও উপসংহার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এই বিষয়ে বলেন, “রাশিয়ার ঋণ পরিশোধের সব প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেই তাদের দায় পরিশোধ করা হবে। যখনই সুযোগ হবে, তারা অর্থ নিতে পারবে। তবে অর্থ পরিশোধ শুরু করা না গেলেও রূপপুর প্রকল্পে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তার মতে, বিশ্বরাজনীতিতে পরিবর্তন ছাড়া এই সমস্যার কোনো সমাধান নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের যুদ্ধ বন্ধ হয় (বা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে কোনো বড় পরিবর্তন আসে), তবে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের একটি সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আর সেটি হলেই কেবল এই বকেয়া দায় পরিশোধ নিষ্পত্তি করা যাবে।
মূল ঋণ পরিশোধের সময় (২০২৮ সাল) যত ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে এই আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের দায় মেটানোর উদ্বেগও ততটাই বাড়ছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ছাড়া আপাতত রূপপুরের এই বিশাল আর্থিক জট খোলার কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।
তথ্যসূত্র: সমকাল