কোনো ধরনের বিচারিক ও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম রাজ্য থেকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে জাতিগত বাংলাভাষী মুসলমানদের জোরপূর্বক বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে পাঠানো (পুশব্যাক) হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB)-এর পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে বহু পরিবার সীমান্তের ‘জিরো লাইনে’ (নো ম্যানস ল্যান্ড) চরম মানবেতর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে আটকা পড়ছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) জয়ী হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন শুভেন্দু অধিকারী। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তিনি তথাকথিত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ দমনের লক্ষ্যে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ (শনাক্তকরণ, ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া ও বহিষ্কার) নামের একটি চরম বিতর্কিত ও আগ্রাসী নীতি কার্যকর করেন।
শুভেন্দু অধিকারী নিজেই দাবি করেছেন যে, এই নীতিমালার অধীনে ইতিমধ্যে শত শত মানুষকে আটক করা হয়েছে এবং প্রায় ৫ হাজার মানুষকে ‘ফিরে যেতে’ বাধ্য করা হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাটির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিতাড়িত এই মানুষদের অনেকের কাছেই ভারতের বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র ‘আধার কার্ড’ সহ বৈধ নাগরিকত্বের নথিপত্র ছিল। এমনকি তাঁদের পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা অতীতে একাধিকবার ভারতের নির্বাচনে ভোটও দিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে বিতর্কিতভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন করে। এই সংশোধনের মাধ্যমে এক ধাক্কায় ৯০ লাখেরও বেশি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, যাদের একটি বড় অংশই বাংলাভাষী মুসলমান।
স্থানীয় ভারতীয় অধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়াটাই এখন স্থানীয় পুলিশের জন্য গ্রেপ্তার, আটক এবং সীমান্ত পার করে দেওয়ার প্রধান ‘ট্রিগার’ বা অজুহাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন অস্থায়ী ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ আনুমানিক ৪০০ জন মানুষকে আটক রাখা হয়েছে, যাদের সিংহভাগই মুসলিম। এই ঘটনা স্থানীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মনে তীব্র আতঙ্ক ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনের জন্য অন্তত ৯ জন প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে। সাক্ষীদের বিবরণ অনুযায়ী, বিএসএফ সদস্যরা গভীর রাতে একদল মানুষকে সীমান্ত এলাকায় নিয়ে আসে এবং কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে বা নদীপথ ব্যবহার করে জোরপূর্বক বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) জানিয়েছে, চলতি ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত তারা দেশের বিভিন্ন সীমান্ত জেলাগুলোতে বিএসএফের এমন অন্তত ২১টি পুশব্যাকের অপচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করেছে। এই অবৈধ পুশব্যাকের শিকার হওয়াদের মধ্যে দুই শতাধিক মানুষ ছিলেন, যার বড় একটি অংশই অবুঝ শিশু এবং অসহায় নারী।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত জেলাগুলোতে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি নির্মম ও লোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে:
পঞ্চগড় সীমান্ত (৫ জুন): বিএসএফ শিশুসহ ১০ জন বাঙালি মুসলমানকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের প্রায় ৫০ ফুট ভেতরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবির বাধায় এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেন জানান, প্রথম রাতে ওই আটকে পড়া দলটি খোলা আকাশের নিচে নো ম্যানস ল্যান্ডে এক ভয়াবহ বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টির মধ্যে পড়ে। দুই বাহিনীর ব্যাপক সেনা মোতায়েনের কারণে সীমান্তে এক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। একাধিক ‘পতাকা বৈঠক’ ব্যর্থ হওয়ার পর, প্রায় ৭৫ ঘণ্টা পর বিএসএফ দলটিকে আবার ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্ত (৬ জুন): ৩ জন পুরুষ, ২ জন নারী ও ১ জন শিশুসহ দুটি পরিবারের ছয় সদস্যকে বিএসএফ জোর করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়। বিজিবি তাদের প্রবেশ আটকালে তারা মাঝখানের সংকীর্ণ সীমান্তে খোলা আকাশের নিচে চরম অবহেলায় রাত কাটায়। পরবর্তীতে ভারতীয় পক্ষ তাদের ফেরত নেয়।
ঠাকুরগাঁও সীমান্ত (৮ জুন): এক গর্ভবতী মা এবং তাঁর শিশুসহ মোট ১১ জনকে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ‘শূন্য রেখায়’ খাবার ও আশ্রয়হীন অবস্থায় আটকে রাখা হয়, যা পরে বিএসএফ ফেরত নিয়ে যায়।
পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি ভারতের আসাম রাজ্যের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও বাংলাভাষী মুসলমানদের বিরুদ্ধে সমানে বর্ণবাদী আচরণ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি প্রকাশ্যেই বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে আক্রমণ করে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। সম্প্রতি তিনি এক বিবৃতিতে অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সাথে বলেন, “আমরা তাদের সীমান্তের কাছাকাছি একটি সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে যাই এবং সত্যি বলতে তাদের জোর করে সীমান্ত পার করিয়ে দিই।”
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী ভারতের এই নিষ্ঠুর আচরণের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “জাতীয়তা যাই হোক না কেন, কাউকে দুই সারি সশস্ত্র সীমান্তরক্ষীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শামিল।”
সংস্থাটি মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ভারত আন্তর্জাতিক নাগরিক ও political অধিকার সনদ, জাতিগত বৈষম্য বিলোপ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন এবং শিশু অধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাধ্য। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, আইনজীবীর সহায়তা এবং আপিলের সুযোগ ছাড়া এভাবে একতরফা বহিষ্কার আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া এবং নাগরিকত্ব সঠিকভাবে যাচাই না করে সীমান্ত দিয়ে পুশব্যাক করা কোনো মানুষকে বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না। বাংলাদেশের অবস্থান হলো, যেকোনো ধরনের প্রত্যাবাসন বা নাগরিক হস্তান্তর হতে হবে প্রতিষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক আইনি ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উল্লেখ করেছে যে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নাগরিকদের জাতীয়তা যাচাই এবং সুশৃঙ্খল হস্তান্তরের জন্য দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সেই প্রতিষ্ঠিত আইনি পথ সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে। সংস্থাটি ভারতকে অবিলম্বে এই নির্মম ও অবৈধ পুশব্যাক বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে যথাযথ কূটনৈতিক সমন্বয় করার জোর তাগিদ দিয়েছে।