কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে টানা তিন দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে শূন্যরেখায় (নো ম্যানস ল্যান্ড) আটকে থাকা নারী ও শিশুসহ ১২ জন সাধারণ মানুষকে অবশেষে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে নিজেদের হেফাজতে ফিরিয়ে নিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। আজ সোমবার (১৫ জুন) সকাল ১১টার দিকে প্রাগপুর সীমান্তের ১৪৮/৩-এস পিলার সংলগ্ন এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিএসএফের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক জরুরি পতাকা বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। বৈঠক শেষে ওই ১২ জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে বিজিবি।
কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। অনুষ্ঠিত এই পতাকা বৈঠকে বিজিবির পক্ষে কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবির উপ-অধিনায়ক নুরুল হুদার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেয়। অন্যদিকে, বিএসএফের পক্ষে ভারতের রানীনগর কোম্পানি কমান্ডার এসি সুনীল কুমার যাদবের নেতৃত্বে সমসংখ্যক প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিলেন।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১২ই জুন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ওই ১২ জনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ‘পুশইন’ বা ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। বিষয়টি টের পেয়ে স্থানীয় সীমান্তবাসী তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবিকে খবর দেয়। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় বিজিবি সদস্যরা দ্রুত ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকতে না দিয়ে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সীমান্তের শূন্যরেখায় তাদের অবস্থান নিশ্চিত করে।
১২ই জুন ভোর থেকে আজ সোমবার সকাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় তীব্র মানবিক সংকটের মধ্যে অবস্থান করছিলেন। ওই ১২ জনের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন—উজির আলী (৫০), তাঁর স্ত্রী জয়নুর বেগম (৩৫), ছেলে শিহাদ (১৭), ইনজামুল (৮) এবং আড়াই বছরের শিশু সন্তান সামাদ। এছাড়া রফিকুল গাজীর পরিবারের তিন সদস্য এবং আফরোজা খাতুনের পরিবারের চার সদস্য রয়েছেন। বিজিবির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা সবাই নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক বলে দাবি করেছেন।
সীমান্তের এই জটিলতা নিরসনে বিজিবি প্রথম দিন থেকেই দফায় দফায় পতাকা বৈঠকের চেষ্টা করলেও বিএসএফের চরম অনীহা ও অসহযোগিতার কারণে বিষয়টি ঝুলে থাকে। গত ১২ই জুন বিকেলে বিজিবি প্রথম পতাকা বৈঠকের উদ্যোগ নিলেও বিএসএফের অসহযোগিতায় তা ভেস্তে যায়। পরদিন ১৩ই জুন সকাল সাড়ে ৯টায় বিলগাতুয়া সীমান্তের ১৫০/৩-এস পিলার সংলগ্ন এলাকায় দুই বাহিনীর মধ্যে আরেকটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সেদিন কোনো চূড়ান্ত সমাধান আসেনি।
বৈঠকে বিএসএফের কর্মকর্তারা দৌলতপুর সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক পুশইনের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন এবং শূন্যরেখায় আটকে থাকা ব্যক্তিদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে বা নিজেদের হেফাজতে নিতে চরম অনীহা প্রকাশ করেন। বিএসএফের এমন একগুঁয়ে অবস্থানের মুখে বিজিবির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কড়া প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয়। বিজিবির শক্ত অবস্থান দেখে পরবর্তীতে বিএসএফ পুরো বিষয়টি তদন্ত করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য সময় চেয়ে নেয়।
টানা তিন দিন ধরে আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাঁটাতারের বাইরে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করার কারণে এই ১২ জন মানুষের ওপর দিয়ে তীব্র শারীরিক ও মানসিক ধকল গেছে। একদিকে জুন মাসের প্রচণ্ড তাপদাহ ও গরম, অন্যদিকে রাতে মশার উপদ্রব এবং সেই সাথে অপ্রতুল খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণে নারী ও শিশুরা মানবিকভাবে চরম দুর্ভোগে পড়েন। সঠিক পরিচর্যার অভাবে আড়াই বছরের শিশু সামাদসহ অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়লেও বিএসএফের অনড় অবস্থানের কারণে তাদের শূন্যরেখাতেই অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে বসে থাকতে হয়েছিল।
আজকের সফল বৈঠক শেষে কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, “বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ কিন্তু দৃঢ় কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির একটি যৌক্তিক সমাধান করা হয়েছে। বিএসএফ নিজেদের ভুল স্বীকার করে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই ১২ জনকে তাদের হেফাজতে ফিরিয়ে নিয়েছে।” তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো মূল্যে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি সর্বদা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দিতে বিজিবির কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।