বুড়ো বয়সেও পান খেয়ে মায়া মাসির ঠোঁট সবসময় টুকটুকে লাল থাকত। ধবধবে ফর্সা মুখে সে লাল ঠোঁটগুলো গোলাপ ফুলের মতো ফুটে থাকত।
তিনি হেসে বলতেন, ‘বিয়ের পর আমার শাশুড়ি ভাত খাওয়ার পর একটি পান সাজিয়ে হাতে তুলে দিয়ে বলতেন, ঘরের বউয়ের ঠোঁট পান খেয়ে লাল টুকটুকে না হলে মানায় না। সেই থেকে পান খাওয়ার অভ্যাস।’
অপ্রিয় হলেও সত্যি, সবার সাথে শ্বশুরবাড়ির সম্পর্ক মায়া মাসির মতো ভালো থাকে না। মেয়েদেরও না, ছেলেদেরও না।
এটি প্রায় চিরন্তন সমস্যা।
ব্যাপারটি মোটেও ভালো নয়। শ্বশুরবাড়ির সাথে আজীবন সম্পর্ক রাখতে হয়—সেটা বিষাক্ত হলে দিন শেষে কেউ শান্তি পায় না।
দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ থেকে আমার মনে হয় কিছু ব্যাপার খেয়াল করলে সম্পর্কটি ভালো রাখা যায়।
যেমন—
১) সম্মানবোধ—
পারস্পরিক সম্মানবোধ এ সম্পর্ক ভালো রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়। আমাদের সমস্যা হচ্ছে, এ জায়গাটিতে আমরা খুব কৃপণ। কেউ কাউকে সম্মান করি না। ফলে প্রথম দিনেই সম্পর্ক ধসে পড়ে।
২) অধিকার—
অনেক ক্ষেত্রে শাশুড়ি সীমা লঙ্ঘন করেন, অনেক ক্ষেত্রে বউ সীমা লঙ্ঘন করেন। জামাই-শ্বশুরও এর ব্যতিক্রম নয়। সবাইকে সবার অধিকার বুঝতে হবে। শাশুড়িকে বুঝতে হবে, এখন তার অনেক কিছু ছাড় দিতে হবে। বউকে বুঝতে হবে মা হিসেবে শাশুড়ির কিছু চিরন্তন অধিকার আছে, তাতে হাত দেওয়া যাবে না।
একইভাবে স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের ভাইবোনদেরও কিছু অধিকার থাকে—সেগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে কারো অধিকারের সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়। বিয়ের পর প্রত্যেক দম্পতির একেবারে নিজস্ব একটি বৃত্ত তৈরি হয়। তাতে অন্যের প্রবেশ নিষেধ।
৩) প্রত্যাশা—
অনেক শ্বশুর-শাশুড়ি বউ বা জামাইয়ের কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রত্যাশা করেন।
সংসারের পাহাড় বউ ঠেলবে—আর অন্যরা ঘুম থেকে উঠে নাস্তার টেবিলে যাবে—এ ধরনের আশা আমরা অনেকেই করি। এটি ঠিক নয়।
মনে রাখতে হবে ঘরে বউ আনা হয়েছে, রোবট নয়।
একইভাবে জামাইয়ের কাছেও অতিরিক্ত আশা না করাই ভালো।
তারাই শান্তিতে থাকেন যাদের প্রত্যাশা কম।
৪) ব্যক্তিগত ব্যাপার—
অনেক শ্বশুর-শাশুড়ি (বিশেষত শাশুড়ি) বাচ্চা কবে নেবে? বাচ্চা হচ্ছে না কেন? এ জাতীয় প্রশ্নে বউকে পাগল করে ফেলেন। অশান্তির আরেক জঞ্জাল এ ধরনের নাক গলানো।
অনেক কিছুই স্বামী-স্ত্রীর নিজস্ব ব্যাপার। সেগুলো নিয়ে তারাই ভাবুক। অন্যের ভাবার দরকার কী? ভাবলে লাভ হলে না হয় কথা ছিল—তা তো হয় না, উল্টো অশান্তি হয়।
কিছু ব্যাপারে যত চুপ থাকা যায় সম্পর্কে তত সুখ থাকে। বেশি মাথা ঘামালে তা জ্বলন্ত চুলা হয়ে যায়।
৫) ননদ এবং দেবর—
অনেক ক্ষেত্রে ননদ-দেবরদের অতিরিক্ত নাক গলানো অশান্তি তৈরি করে। কালেভদ্রে ননদরা বেড়াতে এসে ভাইয়ের বউয়ের হাজার দোষ ধরেন। সংসারটা তো তার না, ভাইয়ের বউয়ের। তার সংসারে নাক না গলিয়ে ননদরা নিজের সংসার নিয়ে মাথা ঘামালেই ভালো। বেড়াতে এসে এসব হাঙ্গামা করার দরকার কী?
আবার মাঝে মাঝে দেবররাও কম যান না। এক দেবরকে জানি, ভাইয়ের সংসার তো বটেই, ভাবির সবকিছুতেই তার খবরদারির চেষ্টা। এই ধরনের দেবরদের আমার চিড়িয়াখানার চিড়িয়া মনে হয়। নয়তো নিজের কাজকর্ম বাদ দিয়ে ভাবির পেছনে কেন লাগে?
৬) বদনাম—
অশান্তির আরেক কারণ। শ্বশুরবাড়ির লোকজন অনেক সময় বউ বা জামাইয়ের বদনামের ফর্দ খুলে বসেন। জনে জনে তা শোনান।
বউ বা জামাইরাও এক্ষেত্রে কম যান না।
আমার এক দূরসম্পর্কের খালা আছেন, তাঁর কাছে গেলে মনে হয় ভদ্রমহিলার ছেলের বউ রাক্ষুসি। আমাকে এক ঢোক পানির সাথে টুক করে গিলে ফেলবেন। আবার এক ভাবি আছেন, তাঁর কথা শুনলে মনে হয় শাশুড়ি সাক্ষাৎ শয়তানের হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট। কাছে গেলে কুচ করে কলিজা-গুর্দা কেটে নিয়ে কাবাব বানিয়ে খাবেন।
তাঁদের সম্পর্ক ভালো হবে কীভাবে?
পরামর্শগুলো একদম আমার ব্যক্তিজীবন থেকে নেওয়া।
বত্রিশ বছর ধরে আমার মা এবং স্ত্রী একসাথে আছেন। আমার চারজন বড় বোন আছেন। দুজন ছোটভাই আছে। আমার স্ত্রীর সাথে তাঁদের কখনোই ভুল বোঝাবুঝি হয়নি। এর কারণ তাঁরা উপরের নিয়মগুলো মেনে চলেছেন।
শুধু আমার স্ত্রী, বাবা- মা কিংবা ভাইবোন নয়, আমি নিজেও এসব নিয়ম মানার চেষ্টা করেছি।
বিয়েসূত্রে আমি আরেক জোড়া মা-বাবা পেয়েছি। যাদের সর্বোচ্চ সম্মান করার চেষ্টা করেছি। আবার একই সূত্রে চারজন বোন পেয়েছি, একজন ভাই পেয়েছি। আমি কখনোই জন্মসূত্রে পাওয়া ভাইবোনদের সাথে তাদের তফাত করিনি। অনেকেই পার্থক্যটা জানেনও না।
ব্যাপারটা পুরোটা নির্ভর করে ভারসাম্য রক্ষার উপর।
দুপক্ষই দাঁড়িপাল্লার ভারসাম্য ঠিক রাখলে শ্বশুরবাড়ির সাথে কখনো সম্পর্ক নষ্ট হয় না। বরং মধুর হয় এবং এ মধুরতা অমূল্য।
এর জন্য আর কিছু লাগে না—শুধু একটু বুঝদার হতে হয়।
#আসুন মায়া ছড়াই