• বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ০৪:৪৬ অপরাহ্ন
Headline
চল্লিশের পর নারীর সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য রক্ষা: ৮টি পরামর্শ ফাহাদ রহমানের মুকুটে যুক্ত হলো দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম সায়নীর শিরশ্ছেদের জন্য ১ কোটি রুপি পুরস্কার ঘোষণা, বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ রামিসা হত্যা: দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমার আশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ: কৃষিমন্ত্রী গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব সরকার যতদিন চাইবে, মাঠে থেকে কাজ করবে সেনাবাহিনী: সেনাপ্রধান সরকারি বিদ্যালয় সংকট: ঢাকায় স্বল্পব্যয়ে মাদরাসায় ঝুঁকছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ইবোলার টিকা আসতে ৯ মাস লাগতে পারে: ডব্লিউএইচও আড়াইহাজারে চাঁদা দাবির জেরে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা: স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাসহ আটক ৩

সাংবাদিকদের স্বাধীনতা বনাম মালিকদের নিয়ন্ত্রণ: টেলিভিশন মাধ্যমের আড়ালের বাস্তবতা

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একটি গণতান্ত্রিক ও সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে স্বাধীন এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সেই গণমাধ্যমের, বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর অন্দরমহলের চিত্র কতটা স্বাধীন ও কর্মীদের জন্য কতটা নিরাপদ? সম্প্রতি টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স’ (অ্যাটকো) একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, পূর্ববর্তী কর্মস্থলের ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ বা এনওসি (NOC) ছাড়া কোনো কর্মী অন্য কোনো টেলিভিশনে যোগ দিতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্তটি গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়া, অন্যদিকে শ্রম আইনের চরম লঙ্ঘন—সব মিলিয়ে টেলিভিশন সাংবাদিকতায় বর্তমানে এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা বিশ্লেষণ করব সাংবাদিকদের স্বাধীনতা বনাম মালিকপক্ষের নিয়ন্ত্রণের এই দৃশ্যমান ও অদৃশ্য লড়াইয়ের পেছনের বাস্তবতা।

সংবিধান ও শ্রম আইনের লঙ্ঘন

অ্যাটকোর এই ‘এনওসি’ বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তটি সরাসরি বাংলাদেশের সংবিধান এবং প্রচলিত শ্রম আইনের পরিপন্থি।

  • সাংবিধানিক অধিকার: বাংলাদেশের সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি নাগরিকের তার পছন্দমতো পেশা ও জীবিকা নির্বাচনের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।

  • শ্রম আইন: শ্রম আইন স্পষ্টভাবে বলে যে, কোম্পানি কর্তৃক জারিকৃত কোনো অভ্যন্তরীণ নীতি বা চুক্তি যদি দেশের প্রচলিত শ্রম আইনের পরিপন্থী হয়, তবে সেটি আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ বলে গণ্য হবে।

মালিক সমিতি একদিকে যেমন সংবিধান ও আইনবিরোধী নিয়ম-কানুন চাপাচ্ছে, অন্যদিকে টেলিভিশন কর্মীদের আইনগতভাবে প্রাপ্য নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে।

বেতন-ভাতা ও ওয়েজবোর্ডের বঞ্চনা

প্রিন্ট মিডিয়ার (সংবাদপত্র) সাংবাদিকদের জন্য সরকার ওয়েজবোর্ড গঠন করেছে। রেডিও, টেলিভিশন এবং অনলাইন মিডিয়ার কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে এই ওয়েজবোর্ড তাদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এ বিষয়ে মালিক সমিতি একেবারে ‘নির্বাক যুগের সিনেমার চেয়েও নির্বাক’।

  • বেতন কাঠামো: ২০১৯ সালে গঠিত নবম ওয়েজবোর্ডের সুপারিশে ন্যূনতম বেতন ও অন্যান্য ভাতার যে উল্লেখ ছিল, তা আজ পর্যন্ত অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেলে বাস্তবায়িত হয়নি। মালিকরা নিজেদের খেয়ালখুশি মতো একটি বেতন কাঠামো চালু রেখেছেন, যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

  • উৎসব ভাতা ও ইনস্যুরেন্স: শ্রম আইনের ১৪০ ধারা অনুযায়ী উৎসব ভাতা প্রদান বাধ্যতামূলক। সাংবাদিকতা বিশ্বজুড়েই একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। অথচ দেশের বেশিরভাগ টেলিভিশন সাংবাদিকই কোনো ঝুঁকি ভাতা বা ইনস্যুরেন্স সুবিধা পান না। স্বাস্থ্যবীমার কথা তো সেখানে অলীক স্বপ্ন।

কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও ওভারটাইমের আক্ষেপ

শ্রম আইন অনুসারে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিধান করা বাধ্যতামূলক। নিরাপত্তা বলতে শুধু ভবনের মজবুত হওয়াই বোঝায় না; বরং কতটুকু জায়গায় কতজন মানুষ বসবেন, কাজের জায়গার বায়ুর মান (Air Quality) কেমন, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা আছে কি না—সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কোনো টেলিভিশন চ্যানেলেই এসব বিধিমালার তোয়াক্কা করা হয় না। অথচ মজার ব্যাপার হলো, এই টেলিভিশন মালিকদের অন্য যে পোশাক বা শিল্প কারখানা রয়েছে, সেখানে বিদেশি ক্রেতাদের চাপে তারা ঠিকই প্রতিটি কর্মীর জন্য ইনস্যুরেন্স ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করেন। তাদের সব অবহেলা যেন শুধু টেলিভিশন কর্মীদের বেলায়।

  • কাজের সময় ও ওভারটাইম: শ্রম আইনে সাধারণত দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের কথা বলা আছে। কিন্তু টেলিভিশন মিডিয়ায় এই হিসাব প্রায় অচল। ব্রেকিং নিউজ, লাইভ অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক ঘটনা বা দুর্ঘটনার সময় কর্মীদের টানা ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। বিশেষ করে রিপোর্টার, টেলিভিশন প্রেজেন্টার, ভিডিও এডিটর এবং পিসিআর-এর সাথে সংশ্লিষ্টদের যেকোনো সময় কাজে ডাকা হতে পারে। কিন্তু এই অতিরিক্ত কাজের জন্য কোনো ওভারটাইম বা আলাদা পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। মালিকপক্ষের যুক্তি—‘মিডিয়ার কাজ এমনই!’

ছুটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও পেনশন

  • মাতৃত্বকালীন ছুটি: শ্রম আইন অনুসারে প্রত্যেক নারী কর্মী বেতন-ভাতাসহ ৬ মাস (অনেক ক্ষেত্রে সংশোধিত নিয়মে) মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রাপ্য। কিন্তু বেশিরভাগ মিডিয়াতেই এই ছুটি চার থেকে ছয় মাসের কম দেওয়া হয়, এবং অনেক ক্ষেত্রে তা হয় বেতনবিহীন।

  • নৈমিত্তিক ও অর্জিত ছুটি: প্রতি বছর ৩০ দিন বিনোদনমূলক ছুটি এবং ১৪ দিন অসুস্থতা ছুটি প্রত্যেক গণমাধ্যম কর্মীর প্রাপ্য, যার জন্য তিনি পূর্ণ বেতন পাবেন। এছাড়া সরকারি ছুটির দিনে কাজ করলে তার জন্য ক্ষতিপূরণমূলক ছুটি পাওয়ার কথা। কিন্তু বছরের পর বছর কাজ করলেও কর্মীরা জমা ছুটির বিপরীতে কোনো নগদ অর্থ পান না।

  • পেনশন ও গ্র্যাচুইটি: সরকার সর্বজনীন পেনশন স্কিম করার সময় সব প্রতিষ্ঠানকে কর্মীর পেনশনের চাঁদার অর্ধেক দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানই এই বিষয়টি মেনে চলে না। কাজের মেয়াদ শেষে গ্র্যাচুইটি দেওয়ার আইন থাকলেও তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কর্মীদের দেওয়া হয় না।

চাকরিচ্যুতি ও নিয়োগপত্রের প্রহসন

শ্রম আইনে বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে ৪ মাসের বেতন (ক্ষতিপূরণ হিসেবে) দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু মিডিয়াতে প্রায়ই বিনা নোটিশে বা এক মুহূর্তের নোটিশে কর্মী ছাঁটাই করা হয় এবং তাদের এক মাসের বেতন দিতেও মালিকপক্ষ চরম অনীহা দেখায়।

অ্যাটকো যখন এনওসি নিয়ে বড় বড় কথা বলছে, তখন চরম বাস্তবতা হলো—টেলিভিশন মিডিয়ায় এখনও অসংখ্য কর্মী কোনো লিখিত নিয়োগপত্র ছাড়াই কাজ করছেন। শ্রম আদালতে মামলা করার ক্ষেত্রে নিয়োগপত্র থাকা বাধ্যতামূলক নয় ঠিকই, কিন্তু যার নিয়োগপত্রই নেই, তার এনওসি বা ছাড়পত্র কীভাবে হবে?

বিচার ব্যবস্থাও কর্মীদের অনুকূলে নেই। শ্রম আদালতে মামলা করতে দীর্ঘ সময়, খরচ এবং মালিকপক্ষের প্রভাবের কারণে অধিকাংশ কর্মী ন্যায়বিচার পান না। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে চুপ থাকেন।

মালিকদের ঢাল হিসেবে সাংবাদিক ও টেলিভিশন

সবশেষে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি—মালিকরা কেন এত টাকা খরচ করে টেলিভিশন চ্যানেল চালান? চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের মালিক এ কে আজাদ একবার নিজেই বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন যে, সাংবাদিকরা পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না।

এর মূল কারণ হলো, এই টেলিভিশন মালিকদের কাছে তাদের মিডিয়া হাউসটি একটি ‘প্রটেকশনের হাতিয়ার’। এই হাতিয়ার ব্যবহার করেই মালিকরা তাদের অন্যান্য ব্যবসার অনিয়ম ও দুর্নীতিকে রক্ষা করেন এবং সামাজিকভাবে প্রভাব বিস্তার করেন। একটি চ্যানেলের মালিকের সামাজিক পরিচিতির বড় অংশই আসে তার টেলিভিশন চ্যানেলটির কারণে।

আপনি চিন্তা করে দেখুন, কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান যদি ভেজাল পণ্য বিক্রি করে, তবে কি সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়, নাকি মালিকের বিরুদ্ধে? অথচ ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমের ২৮২ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা ও নির্যাতনের মামলা হয়েছে। বহু সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, হাজারেরও বেশি সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু মালিকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। একটি টেলিভিশন চ্যানেলে মালিকের অনুমোদন বা পলিসি ছাড়া কোনো রিপোর্টই প্রচারিত হয় না। অর্থাৎ, ‘উদর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানোর মতো মালিকের দায়ভার বহন করতে হচ্ছে সাধারণ সাংবাদিকদের।

অ্যাটকোর এই এনওসি বাধ্যবাধকতার সিদ্ধান্ত হয়তো সাময়িকভাবে মালিকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু যে বুদ্ধি তাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছে, সেই বুদ্ধি শুদ্ধ ও মানবিক না হলে মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির এই জটিলতা চলতেই থাকবে। সাংবাদিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে একটি স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ গণমাধ্যম কখনোই গড়ে উঠতে পারে না।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category