একসময় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন তিনি। হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি আর ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিশাল আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তাঁর মন্ত্রণালয়। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের পর এবার দুর্নীতির জালে আটকা পড়েছেন বিগত সরকারের ক্ষমতাধর সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু।
তাঁর এবং তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের অংশ হিসেবে এবার এক বড় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আদালতের নির্দেশে সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী, তাঁর স্ত্রী সীমা হামিদ এবং ছেলে জারিফ হামিদের আয়কর সংক্রান্ত যাবতীয় নথি জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রোববার (১০ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত এই তাৎপর্যপূর্ণ আদেশ প্রদান করেন।
রোববার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক সাব্বির ফয়েজ-এর এজলাসে নসরুল হামিদ বিপু ও তার পরিবারের সদস্যদের আয়কর নথি জব্দের বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে পৃথক তিনটি আবেদনের মাধ্যমে এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও দুদকের সহকারী পরিচালক মিনহাজ বিন ইসলাম আদালতে এই আবেদনগুলো পেশ করেন।
দুদকের আবেদনে যা বলা হয়েছে:
আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন যে, নসরুল হামিদ বিপু এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অবৈধ সম্পদের প্রকৃত উৎস খুঁজে বের করতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আয়কর সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র পর্যালোচনা করা একান্ত প্রয়োজন।
শুনানি শেষে বিচারক সাব্বির ফয়েজ দুদকের আবেদন মঞ্জুর করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে তাদের আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ দেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ হোসেন সংবাদমাধ্যমের কাছে এই আদেশের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) মামলাগুলোর ক্ষেত্রে অভিযুক্তের আয়কর নথি বা ট্যাক্স রিটার্ন ফাইল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দালিলিক প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। আয়কর নথিতে মূলত একজন নাগরিকের বাৎসরিক আয়, আয়ের উৎস এবং মোট সম্পদের পরিমাণ (আইটি-১০বি ফর্ম) উল্লেখ থাকে।
দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই আয়কর নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হবে:
১. আয় ও সম্পদের অসামঞ্জস্যতা: নসরুল হামিদ বিপু ও তাঁর পরিবারের দৃশ্যমান বিপুল সম্পদ এবং এনবিআরে তাদের প্রদর্শিত আয়ের মধ্যে কোনো বিশাল অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা সহজেই ধরা পড়বে।
২. বেনামি সম্পদ: অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা নিজেদের নামে সম্পদ না করে পরিবারের সদস্যদের নামে বেনামি প্রতিষ্ঠান খুলে কালো টাকা সাদা করার চেষ্টা করেন। স্ত্রী ও ছেলের আয়কর নথি সেই বেনামি সম্পদের হদিস দিতে পারে।
৩. অর্থ পাচারের সূত্র: দেশে আয়ের উৎস কম থাকা সত্ত্বেও বিদেশে যদি কোনো সম্পদের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে এই আয়কর নথিই আদালতে অর্থ পাচারের প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
নসরুল হামিদ বিপু টানা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এসেছে। তবে এই খাতের সফলতা নিয়ে সরকার যতই প্রচার চালাক না কেন, নেপথ্যের দুর্নীতি নিয়ে সবসময়ই সরব ছিলেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে ‘কুইক রেন্টাল’ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নামে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে বিনা দরপত্রে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও হাজার হাজার কোটি টাকার ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ প্রদানের মতো বিষয়গুলো নিয়ে নসরুল হামিদ বিপুর ভূমিকা ছিল চরম বিতর্কের কেন্দ্রে। অভিযোগ রয়েছে, এই বিশাল বাজেটের প্রকল্পগুলো থেকে বিপুল অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য হয়েছে, যার একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর এই অভিযোগগুলোরই এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেছে দুদক।
দুর্নীতির বড় মামলাগুলোতে সাধারণত দেখা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের অবৈধ আয়ের অর্থ সরাসরি নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে না রেখে পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা ট্রাস্ট গঠন করে সেখানে স্থানান্তর করেন।
নসরুল হামিদ বিপুর ক্ষেত্রেও তাঁর স্ত্রী সীমা হামিদ এবং ছেলে জারিফ হামিদের নামে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং রিয়েল এস্টেট খাতে বিশাল বিনিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এই সম্পদ অর্জন করা হয়েছে কি না এবং সেই সম্পদের বিপরীতে রাষ্ট্রকে সঠিক পরিমাণ কর দেওয়া হয়েছে কি না—তা যাচাই করতেই স্ত্রী ও ছেলেকে এই তদন্তের সরাসরি আওতায় আনা হয়েছে।
বিগত সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে যে দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে, নসরুল হামিদ বিপুর পরিবারের আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ সেই প্রক্রিয়ারই একটি ধারাবাহিক ও জোরালো অংশ। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা এবং রাষ্ট্রের সম্পদ কীভাবে লুটপাট করে ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক বিত্তবৈভব গড়ে তোলা হয়েছে, আয়কর নথির চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেই থলের বিড়াল এবার বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদকের এই আইনি পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, অপরাধ যত সুকৌশলেই করা হোক না কেন এবং অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, আইনের দীর্ঘ হাত থেকে রেহাই পাওয়া কঠিন। এখন সবার দৃষ্টি থাকবে এনবিআর থেকে প্রাপ্ত নথিতে কী ধরনের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে এবং দুদক পরবর্তীতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে তার দিকে।