বাংলাদেশ রেলওয়ে দেশের আপামর জনসাধারণের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ মাধ্যম হলেও এর আধুনিকায়ন যেন এক অদৃশ্য আমলাতান্ত্রিক ও কাঠামোগত বেড়াজালে আটকে আছে। রেলবহরে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিলাসবহুল কোচ ও শক্তিশালী ইঞ্জিন যুক্ত হলেও ট্রেনের কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছেন না সাধারণ যাত্রীরা। এর পেছনের সবচেয়ে বড় ও প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে দেশের রেলপথের অত্যন্ত পুরোনো ‘সিঙ্গেল লাইন’ বা এক লেনের ট্র্যাক ব্যবস্থাকে। একটি যাত্রীবাহী বা মালবাহী ট্রেন যখন তার গন্তব্যের দিকে প্রবল বেগে ছুটে চলে, তখন বিপরীত দিক থেকে আসা অন্য একটি ট্রেনকে চলাচলের পথ করে দিতে তাকে বাধ্য হয়ে কোনো স্টেশন বা লুপ লাইনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এই অপেক্ষার প্রহর যাত্রীদের জন্য চরম বিরক্তিকর ও অসহনীয় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সিঙ্গেল লাইনের এই ভয়াবহ ফাঁদে পড়ে প্রতিদিন দেশের হাজার হাজার মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় একটি নিত্যনৈমিত্তিক ও সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানে দেশব্যাপী ডাবল লাইন বা দ্বৈত ট্র্যাক নির্মাণের মহাপরিকল্পনা রেলওয়ের মাস্টার প্ল্যানে থাকলেও, কর্তৃপক্ষের মতে এর বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পর্যাপ্ত বাজেটের অভাব।
সিঙ্গেল লাইন ব্যবস্থায় একই সময়ে একই রুটে বিপরীত দিক থেকে দুটি ট্রেন কোনোভাবেই চলাচল করতে পারে না। রেলওয়ের প্রযুক্তিগত নিয়ম অনুযায়ী, ক্রসিংয়ের সময় একটি ট্রেনকে তার মূল লাইন থেকে সরিয়ে পাশের লুপ লাইনে বা অপেক্ষাকৃত ছোট ও সুবিধাহীন কোনো স্টেশনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এই ক্রসিং প্রক্রিয়ার কারণে বিভিন্ন রুটে একটি ট্রেনকে গড়ে ১০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত সম্পূর্ণ অকারণে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কখনো কখনো এই অপেক্ষার সময় এক ঘণ্টাও ছাড়িয়ে যায়। এর প্রত্যক্ষ ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ট্রেনের সার্বিক গতির ওপর। বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব পরিসংখ্যান ও গবেষণার তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বর্তমানে যাত্রীবাহী ট্রেনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৩২ কিলোমিটার। অন্যদিকে অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত পণ্যবাহী বা মালবাহী ট্রেনের অবস্থা আরও শোচনীয়, যার গড় গতি ঘণ্টায় প্রায় ২৩ কিলোমিটার। আধুনিক বিশ্বে যখন বুলেট ট্রেনের গতি নিয়ে রীতিমতো মহাকাশ যুগের প্রতিযোগিতা চলছে, তখন বাংলাদেশের ট্রেনের এই ধীরগতি সত্যিই হতাশাজনক ও বেমানান। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রাজশাহীর মতো দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত রুটগুলোতেও শুধুমাত্র এই সিঙ্গেল লাইনের কারণে ট্রেনগুলোকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেরি করতে হয়। বিশেষ করে যখন আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন কোনো আন্তঃনগর বা ইন্টারসিটি ট্রেনকে অপেক্ষাকৃত ছোট স্টেশনে দাঁড় করিয়ে বিপরীত দিকের কোনো লোকাল বা মালবাহী ট্রেনকে পাস দেওয়া হয়, তখন যাত্রীদের ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে।
দেশের রেলপথের বিস্তারিত পরিসংখ্যানের দিকে নিবিড়ভাবে তাকালে সিঙ্গেল লাইনের এই ভয়াবহ আধিপত্যের চিত্রটি সবার সামনে আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ রেলওয়ের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে মোট ২ হাজার ৮৮৪ দশমিক ৬৭ রুট কিলোমিটার রেলপথ কার্যকর অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এত বিশাল ও বিস্তৃত রেলপথের মধ্যে ডাবল ট্র্যাক বা দ্বৈত লাইন রয়েছে মাত্র ২১৫ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার রুটে। অর্থাৎ, অবশিষ্ট ২ হাজার ৬৬৯ দশমিক ২১ কিলোমিটার রেলপথই সম্পূর্ণভাবে সিঙ্গেল লাইনের ওপর নির্ভরশীল। শতকরা হিসাবে হিসাব করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের অধীনস্থ মোট রুটের মাত্র ৮ শতাংশ জায়গায় ডাবল ট্র্যাকের সুবিধা রয়েছে অথবা রুটের কোনো একটি নির্দিষ্ট অংশে ডাবল ট্র্যাক স্থাপিত হয়েছে। দেশের বাকি ৯২ শতাংশ রেলপথই এক লেনের। দেশের রেলওয়ে ব্যবস্থাকে প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক সুবিধার জন্য পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল—এই দুই বড় ভাগে ভাগ করা হয়েছে, তবে উভয় অঞ্চলের কাঠামোগত চিত্রই প্রায় অভিন্ন এবং সমান হতাশাজনক।
রেলওয়ের একটি বিশদ অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্বাঞ্চলের মোট ১ হাজার ৩৯০ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে ডাবল ট্র্যাকের সুবিধা রয়েছে মাত্র ১১৯ দশমিক ৪৫ কিলোমিটারে। এই বিশাল অঞ্চলের বাকি অংশ, অর্থাৎ ১ হাজার ২৭১ দশমিক ৩৩ কিলোমিটারই হলো সিঙ্গেল লাইন। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলের অবস্থাও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। পশ্চিমাঞ্চলে সর্বমোট রেলপথ রয়েছে ১ হাজার ৪৯৩ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে ডাবল ট্র্যাকের পরিমাণ মাত্র ৯৬ দশমিক ০১ কিলোমিটার। আর এই অঞ্চলে সিঙ্গেল লাইনের পরিমাণ হলো ১ হাজার ৩৯৭ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার। রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই শতবর্ষী সিঙ্গেল লাইনগুলোই যাত্রীদের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা প্রতিটি ঈদ বা উৎসবের সময় চরম শিডিউল বিপর্যয়ের জন্ম দেয়।
ভুক্তভোগী যাত্রীদের ব্যক্তিগত যাতায়াতের অভিজ্ঞতা এই গাণিতিক পরিসংখ্যানের চেয়েও অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক ও বাস্তব। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজিম উদ্দিন নিজের নিয়মিত ট্রেন ভ্রমণের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই তিনি যাতায়াতের জন্য নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে ট্রেনকে বেছে নিয়েছেন। তিনি জানান, যমুনা নদীর ওপর নির্মিত রেল সেতুর কারণে সেতু পারাপারের এলাকায় বর্তমানে ট্রেনের গতি আগের চেয়ে বেশ কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু সেতুর দুই প্রান্তেই এখনো সেই পুরনো আমলের সিঙ্গেল লাইন ব্যবস্থা বহাল রয়েছে। এর ফলে সেতু এলাকায় এসে ট্রেনের গতি সাময়িকভাবে বাড়লেও একটু পরেই আবার বিরক্তিকর ক্রসিংয়ের মুখে পড়তে হয়। একটি ট্রেনকে অন্য একটি ট্রেনের জন্য নির্দিষ্ট লুপ লাইনে দীর্ঘক্ষণ ইঞ্জিন বন্ধ করে অপেক্ষা করতে হয়, যা সাধারণ যাত্রীদের কাছে চরম বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নাজিম উদ্দিনের মতে, লাইনগুলো যদি সব জায়গায় নিরবচ্ছিন্ন ডাবল লাইনের হতো, তবে এই ক্রসিংয়ের অযাচিত সমস্যা চিরতরে দূর হতো এবং ট্রেনের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেত, ফলে মানুষের মূল্যবান সময়ও বেঁচে যেত।
বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও নিজেদের অসহায়ত্ব ও একইসঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা গণমাধ্যমের কাছে জানিয়েছেন। বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (এএমএম) শাহনেওয়াজ এই কাঠামোগত সংকট প্রসঙ্গে বলেন, যাত্রীদের দীর্ঘ ভোগান্তি ও ক্লান্তিকর অপেক্ষার বিষয়টি তারা গভীরভাবে অনুধাবন করেন এবং এটি চিরতরে কমাতে দেশব্যাপী ডাবল লাইন নির্মাণের একটি বিশাল পরিকল্পনা তাদের দপ্তরে রয়েছে। তবে এই ধরনের বড় অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশাল অঙ্কের বাজেটই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি উল্লেখ করেন যে, ডাবল লাইন নির্মাণের কাজ একেবারে থেমে নেই, এটি চলমান রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ডাবল লাইন সফলভাবে স্থাপন করা হয়েছে। তার মতে, সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় বাজেট বা অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে এই কাজ আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। রেলওয়ের প্রযুক্তিগত তথ্য অনুযায়ী, একটি ডাবল ট্র্যাক লাইন সাধারণত একটি সিঙ্গেল ট্র্যাক লাইনের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা রাখে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত লাভজনক ও ফলপ্রসূ।
রেলওয়ের এই ভঙ্গুর দশাকে কাটিয়ে তুলতে আগামী অর্থবছরগুলোতে বেশ কিছু মেগা ও যুগান্তকারী প্রকল্পের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে দেশের রেলপথের সিঙ্গেল লাইন ধীরে ধীরে কমিয়ে এনে সেখানে আধুনিক ডাবল লাইন ও ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণের সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে চলতি অর্থবছরে রেলপথ খাতের জন্য সর্বমোট ৯ হাজার ৯৪০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দের একটি বিশাল প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই বিপুল বাজেটের অর্থে জয়দেবপুর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত রুটে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণের মেগা উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের যানজট কমাতে ঢাকা-টঙ্গী সেকশনে তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়েলগেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণের চলমান কাজ আরও বেগবান করার কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এই মেগা কাজগুলো সম্পন্ন হলে উত্তরাঞ্চলগামী ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের মাত্রা অনেকটাই কমে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা জোরালো আশা প্রকাশ করছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পাশাপাশি বর্তমানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত রুটে ডাবল লাইন নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। রেলওয়ে সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ১২৪ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাবল ট্র্যাক নির্মাণের একটি বড় কর্মযজ্ঞ বর্তমানে পুরোদমে এগিয়ে চলছে। এর পাশাপাশি টঙ্গী-আখাউড়া-লাকসাম-চট্টগ্রাম এবং টঙ্গী-আখাউড়া-কুলাউড়া-শাহবাজপুর রুটে ডুয়েল গেজ ও ডাবল ট্র্যাক করার দীর্ঘমেয়াদী মাস্টার প্ল্যানও সরকারের টেবিলে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রণীত আধুনিক ও যুগোপযোগী মাস্টার প্ল্যানে দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ সিঙ্গেল লাইনকে পর্যায়ক্রমে ডাবল ট্র্যাকে উন্নীত করার ওপর সর্বোচ্চ নীতিগত জোর দেওয়া হয়েছে। যদি এই মহাপরিকল্পনাগুলো যথাসময়ে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ পায় এবং কোনো ধরনের দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক কালক্ষেপণ ছাড়াই দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তবে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে দেশের সাধারণ মানুষ সিঙ্গেল লাইনের এই দীর্ঘস্থায়ী অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে। তখন বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি সত্যিকারের আধুনিক, দ্রুতগামী, সময়নিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্বদরবারে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন