বিশ্ব অর্থনীতিতে গত কয়েক বছর ধরে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের পর থেকে বিশ্ববাজারে সোনার দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তা অনেক বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদ এবং বাজার বিশ্লেষকের হিসাব-নিকাশও সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। সোনার এই আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে বিশ্বের বড় বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতিনির্ধারকদের কপালেও চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। একসময় যে সোনা কেবল গহনা বা আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো, তা আজ বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ কেন সোনার দাম মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে? সাধারণ মানুষ এখন কী করবে—সোনা কিনবে, নাকি বেচবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান চালচিত্র, ইতিহাস এবং ভূরাজনীতির গভীরে দৃষ্টি দিতে হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: এক ভরির দাম আড়াই লাখ টাকার ওপরে!
সোনার এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ মানুষ। দেশে বর্তমানে এক ভরি সোনার দাম আড়াই লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত ছিল। অথচ একটু অতীতে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, সে সময় দেশের বাজারে এক ভরি সোনার দাম ছিল মাত্র ১৭১ টাকা! ওই সময় দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৭০ ডলার, যা তৎকালীন মুদ্রামানে প্রায় ৫১০ টাকার সমান ছিল। অর্থাৎ, সে সময়কার একজন সাধারণ মানুষের মাথাপিছু আয় দিয়ে অনায়াসেই তিন ভরি সোনা কেনা সম্ভব হতো।
কিন্তু আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে বাংলাদেশে মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫১ টাকায়। আয়ের এই বিশাল উল্লম্ফন সত্ত্বেও বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী একজন মানুষের পুরো বছরের মাথাপিছু আয় দিয়ে মাত্র দেড় ভরি সোনা কেনা সম্ভব হচ্ছে। সম্পদের মূল্যবৃদ্ধির এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, সোনার দাম কতটা অস্বাভাবিক গতিতে বেড়েছে। বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ২০২৫ সালের শুরুতে কেউ যদি সোনায় ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতেন, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ১৬ লাখ টাকায় পরিণত হতো। অর্থাৎ, এক বছরে প্রায় ৬০ শতাংশ মুনাফা, যা অন্য যেকোনো প্রচলিত বিনিয়োগ খাতের তুলনায় অনেক বেশি।
কাগুজে মুদ্রার ওপর আস্থা হারাচ্ছে মানুষ
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এত দ্রুত সোনার দাম বাড়ার মূল কারণ হলো প্রচলিত কাগুজে মুদ্রা এবং ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের ধীরে ধীরে আস্থা হারিয়ে যাওয়া। সরকার চাইলেই যেকোনো সময় অতিরিক্ত টাকা ছাপাতে পারে, বন্ডের দাম পড়ে যেতে পারে, কিংবা মূল্যস্ফীতির কারণে মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে পারে। কিন্তু সোনার ক্ষেত্রে এমনটি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হাজার বছর ধরে মানুষ সোনার ওপর যে অগাধ আস্থা রেখে আসছে, তা আজও অটুট রয়েছে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যখনই পৃথিবীতে বড় কোনো অর্থনৈতিক সংকট বা মহামন্দা এসেছে, মানুষ তখনই কাগুজে টাকা ছেড়ে সোনার দিকে ঝুঁকেছে। ১৯৩০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে যখন মহামন্দা শুরু হয়, ব্যাংক দেউলিয়া হতে থাকে এবং অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, তখন মানুষ পাগলের মতো সোনা কিনতে শুরু করেছিল। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়েছিল যে, মার্কিন সরকার বাধ্য হয়ে সোনার দাম এক ধাক্কায় ২০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩৫ ডলার করে এবং নাগরিকদের সোনা জমা দিতে বাধ্য করে। এমনকি ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত মার্কিন নাগরিকদের ব্যক্তিগতভাবে সোনা কেনাবেচার ওপর কড়া বিধিনিষেধ ছিল।
ডলারের আধিপত্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বিশ্ব অর্থনীতিতে সোনার সাথে মার্কিন ডলারের এক গভীর ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত মার্কিন ডলারের মান সরাসরি সোনার মজুতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ওই দিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ঐতিহাসিক এক ঘোষণায় ডলারের বিপরীতে সোনা সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা বাতিল করেন। এর ফলে সোনার দাম রাতারাতি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করে এবং ৩৫ ডলার থেকে ৮৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকে।
পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে সৌদি আরবের সাথে ‘পেট্রোডলার’ চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ডলারকে পুনরায় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রায় পরিণত করতে সক্ষম হয়। বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে ডলার। কিন্তু ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার পর যুক্তরাষ্ট্র অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ‘কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং’ বা কিউই (QE) নামক এক নতুন ব্যবস্থার আশ্রয় নেয়। এর মাধ্যমে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিপুল পরিমাণ নতুন ডলার ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ে। একইভাবে ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও অর্থনীতি বাঁচাতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ছাপানো হয়। বাজারে অতিরিক্ত ডলারের এই জোগানের ফলে অর্থের মান কমতে শুরু করে এবং মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করে। মানুষ নিজেদের সম্পদ রক্ষায় আবারও সোনার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়।
ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ডি-ডলারাইজেশন
বর্তমানে সোনার দাম বাড়ার পেছনে কেবল অর্থনৈতিক কারণই দায়ী নয়; এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণ। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকলেও আজ বিশ্ব আবার বহুমুখী পরাশক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তিতে, বাণিজ্যে এবং সামরিক শক্তিতে চীনের অভাবনীয় উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের সেই একক আধিপত্যকে প্রবলভাবে চ্যালেঞ্জ করছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আকাশচুম্বী জাতীয় ঋণ বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার, যা তাদের মোট জিডিপির চেয়েও বেশি। এই বিপুল ঋণের সুদ মেটাতে মার্কিন সরকারকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ডলারের মানকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর। পশ্চিমা দেশগুলো যখন রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জব্দ করে, তখন বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো একটি পরিষ্কার বার্তা পায়। তারা বুঝতে পারে যে, ডলারভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে যেকোনো সময় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। এই ভীতি থেকেই চীন, রাশিয়া, ভারত, তুরস্ক, সৌদি আরব এবং কাতারের মতো দেশগুলো নিজেদের রিজার্ভকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ব্যাপকভাবে সোনা মজুত করতে শুরু করে। কারণ সোনা নিজেদের দেশের ভল্টে রাখা যায় এবং কোনো বিদেশি পরাশক্তি চাইলেই এর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তা জব্দ করতে পারে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনার হিড়িক
একসময় বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ছিল স্বর্ণের বড় বিক্রেতা। কিন্তু ২০০৮ সালের পর থেকে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। গত প্রায় ১৭ বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ধারাবাহিকভাবে স্বর্ণ কিনছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেই (জানুয়ারি-মার্চ) বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিট ২৪৪ টন সোনা কিনেছে। রেকর্ড দাম থাকা সত্ত্বেও তাদের সোনা কেনা থেমে নেই।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনাকে কেবল একটি লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে না; বরং তারা একে ডলারের বিকল্প, নিরাপদ সঞ্চয় এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে বিবেচনা করছে। যারা নিজেরা কাগুজে মুদ্রা ছাপে এবং সুদের হার নির্ধারণ করে, সেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোই যখন কাগুজে মুদ্রা ছেড়ে সোনায় বিনিয়োগ করছে, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সতর্কবার্তা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এই আগ্রাসী কেনাকাটার কারণেই বাজারে সোনার সরবরাহ কমছে এবং দাম হু হু করে বাড়ছে।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস: কোথায় গিয়ে থামবে সোনার দাম?
২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী সোনার চাহিদা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলে। গহনার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ চরম মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় সোনার দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ৩০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। তবে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে এই দামে কিছুটা সংশোধন দেখা যায় এবং প্রথম প্রান্তিকে সোনার গড় দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৮৩৭ ডলারে অবস্থান করে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে বড় ধরনের উত্থানের পর সাধারণত একটি সংশোধন বা পতন আসে। কারণ, অনেক স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে নিতে দ্রুত সোনা বিক্রি করে দেন। তাই আগামী দিনগুলোতে সোনার দাম কমে ৩,৫০০ থেকে ৪,১০০ ডলারের কাছাকাছি নামতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি হবে নতুন করে সোনা কেনার এক সুবর্ণ সুযোগ।
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সোনার ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী পূর্বাভাস দিচ্ছে। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক ‘গোল্ডম্যান স্যাক্স’-এর মতে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৬ হাজার ডলারে পৌঁছাতে পারে। সুইস ব্যাংক ‘ইউবিএস’ ধারণা করছে, দাম ৬,২০০ থেকে ৭,২০০ ডলার পর্যন্ত যেতে পারে। ফরাসি প্রতিষ্ঠান ‘সোসিয়েতে জেনেরাল’-এর পূর্বাভাসও ৬ হাজার ডলারের কাছাকাছি। সবচেয়ে চমকপ্রদ পূর্বাভাসটি দিয়েছে জার্মানির ‘ডয়েচে ব্যাংক’। তাদের গবেষণা বলছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনার এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ১০ হাজার ডলারে পৌঁছানো মোটেও অসম্ভব কিছু নয়।
সব মিলিয়ে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি এক চরম অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ঋণের বোঝা, মূল্যস্ফীতির চাপ, ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার নীতি এবং বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা—এই সবকিছুর যোগফলই হলো সোনার এই ঐতিহাসিক মূল্যবৃদ্ধি। ডলার এখনো বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হলেও, সোনা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তার পুরোনো রাজত্ব ফিরে পাচ্ছে। তাই সোনার দাম ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে কাগুজে মুদ্রার ওপর মানুষের আস্থার পারদ এবং বিশ্ব রাজনীতির আগামী দিনের গতিবিধির ওপর। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বৈশ্বিক অর্থনীতির এই জটিল সমীকরণগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো