নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এখনও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক রোডম্যাপ বা তফসিল ঘোষণা করা হয়নি। তবে মাঠপর্যায়ে নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রধান সরকারি দল বিএনপির অভ্যন্তরে ব্যাপক তোড়জোড় ও প্রার্থী বাছাইয়ের রূপরেখা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এবারের স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকার কারণে যোগ্য ও একক প্রার্থী নির্বাচনে হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে তিনটি বিশেষ মানদণ্ড বা ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সমমনা দলগুলোর সাথে জোটবদ্ধ বা যুগপৎভাবে ভোট করার গভীর চিন্তা-ভাবনা করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা।
দলীয় সিনিয়র নেতারা জানিয়েছেন, স্থানীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য (এমপি) বা প্রভাবশালী নেতাদের অযাচিত হস্তক্ষেপের বিষয়ে দলের সাংগঠনিক সভায় কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, দলীয় প্রভাবমুক্ত এবং প্রতিযোগিতামূলক।’
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দৃশ্যমান কোনো প্রস্তুতি এখনো জনসমক্ষে না এলেও, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে পৌরসভা, উপজেলা এবং সবশেষে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। সরকারের এই অনানুষ্ঠানিক বার্তাটি ইতোমধ্যেই দলের তৃণমূলের সর্বস্তরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। আর এই গ্রিন সিগন্যাল পেয়েই মাঠপর্যায়ে বিএনপির সমর্থনপ্রত্যাশী সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের এলাকায় গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন।
তৃণমূলের প্রার্থীরা জানান, বিগত বছরগুলোতে প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তারা সার্বক্ষণিক মাঠেই ছিলেন, তাই নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার কিছু নেই। তবে দলীয় হাইকমান্ড যেন কোনো গ্রুপিং বা বলয়ের দিকে না তাকিয়ে সরাসরি জনগণের সাথে সম্পৃক্ত এবং সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকেই চূড়ান্ত সমর্থন দেয়—এমনটাই তাদের প্রধান প্রত্যাশা।
দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থিত প্রার্থী থাকাটাই রেওয়াজ। কিন্তু দল দীর্ঘদিন পর এককভাবে ক্ষমতায় আসার পর বর্তমানে একেকটি ইউনিয়ন পরিষদেই বিএনপির সমর্থন পেতে মুখিয়ে আছেন অন্তত চার থেকে পাঁচজন করে প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা। মাঠপর্যায়ের এই প্রার্থীরা কেউ স্থানীয় সংসদ সদস্যের (এমপি) নিজস্ব অনুগত, কেউবা জেলা বা কেন্দ্রীয় নেতাদের ভিন্ন ভিন্ন বলয়ের আশির্বাদপুষ্ট।
এর বাইরে ভোটের মাঠে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির একক স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং বর্তমানে সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের সাথে পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও বড় ফ্যাক্টর হিসেবে মাঠে থাকবেন। এমন ত্রিমুখী ও জটিল বাস্তবতায় প্রার্থী বাছাইয়ে চরম কৌশলী ভূমিকা নিচ্ছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এ প্রসঙ্গে জানান, স্থানীয় সরকারের ভোটগুলোর সমীকরণ একটু ভিন্ন হয়। এখানে দলীয় পরিচয়ের বাইরেও আঞ্চলিকতা, গোষ্ঠীগত প্রভাব এবং এলাকার সার্বিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করেই দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং দলের স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য নজরুল ইসলাম খান প্রার্থী সমর্থনের তিনটি মূল মানদণ্ড স্পষ্ট করে বলেন, “প্রথমত জনগণের কাছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি; দ্বিতীয়ত বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে দলের প্রতি তাঁর ত্যাগ, আনুগত্য ও অবদান; এবং তৃতীয়ত—সবকিছুর পরেও অন্য প্রার্থীদের চেয়ে শিক্ষাগত ও সামাজিক ক্ষেত্রে অধিকতর যোগ্যতা। এই তিন মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়েই প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হবে।”
তিনি আরও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, দলের স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) থেকে শুরু করে সিনিয়র কিংবা জুনিয়র—যেকোনো পর্যায়ের কোনো নেতারই দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজস্ব কোনো প্রার্থীকে জেতানোর বা দলীয় শৃঙ্খলা ভাঙার ক্ষমতা নেই। পাশাপাশি, সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় স্তরেও জোটের স্বার্থে অন্য দলের যোগ্য প্রার্থীদেরও বিএনপি থেকে নীতিগত সমর্থন দেওয়া হতে পারে বলে তিনি জানান।
এর আগে, গত ৯ই মে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন (কেআইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বিএনপির বিশেষ সাংগঠনিক সভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দলের মনোভাব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, আগের জমানার মতো প্রশাসনিক বা দলীয় প্রভাবে কোনো বলয়ের প্রার্থীকে জোর করে বিজয়ী করে আনার কোনো সুযোগ এবার নেই। তাই আগেভাগেই স্থানীয় কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, এই স্থানীয় সরকার নির্বাচন মূলত তাদের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। একদিকে ভোট অবাধ ও বিতর্কমুক্ত রাখা যেমন সরকারের ভাবমূর্তির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি জনগণের মাঝে দলের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ন থাকার প্রমাণ হিসেবে এই নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের কোনো বিকল্প নেই।