ক্ষমতায় আসার প্রথম ছয় মাসের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে দৃশ্যমান সংস্কার ও সাধারণ মানুষের জন্য সুলভ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার যেসব অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তার সিংহভাগই এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, নাগরিকদের জন্য ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড চালু, স্বাস্থ্যকর্মীদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ এবং দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ের সাধারণ মানুষ এখনো আগের মতোই চিকিৎসা প্রাপ্তিতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিগত কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথা ঘোষণা করা হলেও কার্যকর পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক তৎপরতার অভাবে হাসপাতালগুলোতে সেবার মানে বাস্তবসম্মত কোনো রূপান্তর দৃশ্যমান হচ্ছে না।
চলতি মৌসুমে দেশব্যাপী হামের মারাত্মক প্রাদুর্ভাব সামাল দিতে গিয়ে সরকারের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা আবারও প্রকাশ্যে এসেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার হামের সংক্রমণে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৪৩ হাজার ছাড়িয়েছে এবং ৯ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যাদের একটি বড় অংশই শিশু। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী প্রশাসনের টিকার মজুত ঘাটতিকে দায়ী করা হচ্ছে, তবে হাসপাতালগুলোর অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও রোগী ব্যবস্থাপনার চরম বিশৃঙ্খলা নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই অন্য চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে সুস্থ শিশুরা সংক্রমিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যেখানে ইতিমধ্যে অর্ধশতাধিক মৃত্যু এবং প্রায় ২৫ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। তবে মশা নিধন ও প্রজননস্থল ধ্বংসে সমন্বিত কার্যক্রম এখনো কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি।
সরকারি প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ডিজিটাল ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রবর্তন। খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এই কার্ড বিতরণের কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এখনো পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা বা বরাদ্দ পাননি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) সহযোগিতায় প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবনা তৈরির কাজ চলছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যসেবার সার্বিক সক্ষমতা না বাড়িয়ে কেবল কার্ড বিতরণের ঘোষণা দিলে জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তব সেবার মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হবে। একই সঙ্গে সাভারে নির্মিত আধুনিক ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যানেজমেন্ট’ অবকাঠামোগতভাবে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময়ে তা পুরোপুরি সচল না হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার আরেকটি বড় উদাহরণ।
জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে প্রায় ৯৫ শতাংশ বেশি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা ও স্বচ্ছ তদারকি নিশ্চিত না হলে বিপুল বরাদ্দ শেষ পর্যন্ত অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া চিকিৎসা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ খরচের বোঝা এখনো কমেনি। এরই মধ্যে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত প্রায় তিন শতাধিক নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত যুগান্তকারী নীতিমালা বাতিল করার সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীরা জনস্বার্থবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, ওষুধের মূল্য তদারকি থেকে সরকারের সরে আসা সাধারণ রোগীদের আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় ও নীতিনির্ধারকরা অবশ্য দাবি করছেন, মাত্র ছয় মাসের মেয়াদে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন মূল্যায়ন করা সমীচীন নয়। তারা জানান, সারা দেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং অতিরিক্ত ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসকসহ নার্স ও মিডওয়াইফদের শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ের ৩১ ও ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীতকরণ, ক্যানসার স্ক্রিনিং ও নিরাপদ মাতৃত্বসেবা সম্প্রসারণের মতো কাঠামোগত কাজ এগিয়ে চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে হার্টের রিং, পেসমেকার, চোখের লেন্স এবং কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো জরুরি সেবার খরচ কমানোর নজিরও তুলে ধরা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের অভিমত হলো, নীতিমালার ঘোষণা বা বাজেট বরাদ্দের চেয়েও চিকিৎসাসেবা কতটা সহজলভ্য, মানসম্মত ও জনবান্ধব হলো—তার ওপরই শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে।