• বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৪ অপরাহ্ন

হরমুজ সংকট বদলে দিচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানির ভবিষ্যৎ: রয়টার্সের বিশ্লেষণ

Reporter Name / ২ Time View
Update : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

টানা ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ ও বিঘ্নিত থাকার পর অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ প্রবাহ ফিরতে শুরু করেছে। তবে সাময়িকভাবে এই সংকট কেটে গেলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তা ইতিমধ্যে একটি গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের চরম ভঙ্গুরতা ও দুর্বলতা বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তিগুলোর সামনে নতুন করে উন্মোচিত হয়েছে। একই সাথে এটি বিভিন্ন দেশের সরকারকে তাদের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচলিত পদ্ধতিগুলো আমূল পরিবর্তন ও পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ খালের এই নজিরবিহীন অচলাবস্থা মূলত ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক আরব তেল নিষেধাজ্ঞার সেই ভয়াবহ প্রভাবেরই এক আধুনিক প্রতিচ্ছবি। পাঁচ দশক আগের সেই সংকট যেভাবে সংরক্ষণ, উৎসের বৈচিত্র্যকরণ এবং কৌশলগত বিশেষ মজুদ গড়ে তোলার মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি নীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল; ঠিক একইভাবে বর্তমানের এই হরমুজ সংকটও বিশ্বকে নতুন পথের দিশা দেখাচ্ছে। যদিও আজকের আধুনিক জ্বালানিব্যবস্থা অতীতের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক, তবুও হরমুজ প্রণালির এই আকস্মিক বিঘ্ন বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সম্পূর্ণ সরে আসার একটি ব্যাপক ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করতে পারে।

এই হরমুজ সংকট বর্তমানে আরেকটি বড় ধরণের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, যার স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে এশিয়া মহাদেশজুড়ে। এতদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল থাকা দেশগুলো এখন জ্বালানির স্বল্পমূল্য বা সস্তা দরের চেয়ে ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ রক্ষা করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর সরাসরি ফল হিসেবে আশা করা হচ্ছে যে, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদ (এসপিআর) অভূতপূর্বভাবে সম্প্রসারণ করবে। এর পাশাপাশি দেশীয় ভূখণ্ডে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ শক্তি এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করবে। বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো বিদেশের জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নের এই ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে তাদের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল ও নীতি নতুন করে পর্যালোচনা করা শুরু করেছে।

উল্লেখ্য যে, ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন তাদের পুরো জ্বালানিব্যবস্থা পুনর্গঠন করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই হরমুজ সংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত হানে। রাশিয়া থেকে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে গ্যাসের ব্যবহার কমাতে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে বৈচিত্র্য আনতে এবং গ্রিন এনার্জি বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। ফলে হরমুজের এই ধাক্কা ইউরোপের সেই জীবাশ্ম জ্বালানি বর্জনের গতিকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বর্তমানে বৈশ্বিক বিনিয়োগের চেনা ধরন ও আর্থিক প্রবাহই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার খুব দ্রুত তার রূপ পরিবর্তন করছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে বিশ্বব্যাপী সামগ্রিক জ্বালানি খাতে মোট বিনিয়োগ রেকর্ড ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর এক পূর্বাভাস রয়েছে। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই বিশাল বিনিয়োগের সিংহভাগই কিন্তু নতুন কোনো তেল বা গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার ও উৎপাদনের পেছনে ব্যয় হচ্ছে না; বরং এই অর্থের বড় অংশ পরিচালিত হচ্ছে আধুনিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শক্তিশালী বিদ্যুৎ পরিকাঠামো নির্মাণ, বড় বড় ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থা এবং জাতীয় গ্রিডের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর কাজে। একই সময়ে ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলজুড়ে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) বিক্রি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। অন্যদিকে, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোতে চীনের তৈরি সস্তা ও আধুনিক সৌর প্যানেল (সোলার প্যানেল) রপ্তানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

জ্বালানি বাজারে এই রূপান্তরের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকার এখন নিজস্ব জ্বালানি সাশ্রয় ও অপচয় রোধের ওপর রাষ্ট্রীয় ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াচ্ছে। হরমুজ সংকটের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশ তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে নতুন ও কঠোর সংরক্ষণমূলক জ্বালানি নীতি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এই পুরো পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে একটি ধ্রুব সত্যকে আবারও নতুন করে তুলে ধরেছে—তা হলো, জ্বালানির সাশ্রয়যোগ্যতা বা সস্তা মূল্যের মতোই জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বৈশ্বিক তেল বাজারের একক সরবরাহের ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করার পরিবর্তে তাই পৃথিবীর প্রতিটি সরকার এখন একটি বৈচিত্র্যময় ও বহুমুখী নিজস্ব জ্বালানিব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আর এই কাঠামোগত পরিবর্তন আগামী বছরগুলোতে বিশ্বের শিল্পনীতি, বড় বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।

অবশ্য এই সংকটের মানে এই নয় যে বিশ্ব থেকে ‘তেল যুগ’-এর তাৎক্ষণিক ও চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটে গেছে। বিশ্বের অনেক উন্নত ও অনুন্নত অঞ্চলে এখনো পরিবহন খাত, বৃহৎ পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, বিমান চলাচল, ভারী কলকারখানা এবং সাধারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আরও বেশ কিছু দিন অপরিহার্য হিসেবেই থাকবে। তবে হরমুজের এই ধাক্কা নিঃসন্দেহে মানব ইতিহাসের একটি বড় সন্ধিক্ষণ বা টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে, যেখানে দেশগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করা হাইড্রোকার্বনের ওপর তাদের দীর্ঘদিনের কৌশলগত নির্ভরতা পদ্ধতিগতভাবে হ্রাস করতে শুরু করবে। ফলে বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদার ঊর্ধ্বমুখী গতিপথ এবার ধীরে ধীরে সমতল বা স্থবির হতে বাধ্য। সেই অর্থে, হরমুজ সংকটকে কেবল জ্বালানি সরবরাহের একটি আকস্মিক সামরিক বা রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে কম এবং বৈশ্বিক টেকসই জ্বালানি রূপান্তরের পরবর্তী যুগান্তকারী পর্যায়কে ত্বরান্বিতকারী এক অনন্য অনুঘটক হিসেবেই ইতিহাসে বেশি স্মরণ করা হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category