একসময়ে দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এবং অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত সোনালী আঁশ খ্যাত পাট খাত আজ তার ঐতিহ্য হারিয়ে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সুরক্ষার সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে যখন প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঠিক সেই সুবর্ণ সুযোগটি কাজে লাগাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। অপরিকল্পিত নীতি, উচ্চ উৎপাদন খরচ, ব্যাংক ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা, মানসম্মত বীজের তীব্র ঘাটতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া না থাকায় বিশ্ববাজারে এই সম্ভাবনাময় খাতের প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা দিন দিন হু হু করে কমে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় নানামুখী সহায়তার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতায় একের পর এক পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কৃষকদের লোকসানের মুখে পড়ার দৃশ্য পুরো জাতিকে হতাশ করে তুলেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর বা ইপিবির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর বা ফিন্যান্সিয়াল ইয়ার ২৬-এ বাংলাদেশ পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রায় ৮৮ কোটি ডলার আয় করেছে, যা গত বছরের তুলনায় নামমাত্র কিছুটা বেশি হলেও এর বড় অংশই এসেছে কেবল কাঁচা পাট ও সাধারণ সুতা বা ইয়ার্ন রপ্তানির মাধ্যমে। অথচ বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের বা বিজেএমএ-র পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত সাত বছরের ব্যবধানে দেশের ಒட்டு মোট পাটপণ্যের উৎপাদন প্রায় ৫৪ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। একসময়ে যে পরিমাণ উৎপাদন হতো, তার অর্ধেক বা তার চেয়েও কম উৎপাদনে নেমে আসায় দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি পাটকল ইতিমধ্যে তাদের কার্যক্রম চিরতরে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। আনুমানিক সাড়ে তিনশ বেসরকারি জুট মিলের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ২৫ থেকে ৩০টি কারখানা কোনোমতে তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ধরে রেখে টিকে আছে, আর বাকি সত্তর থেকে পঁচাত্তর শতাংশ মিলই হয় সম্পূর্ণ বন্ধ, নতুবা আংশিক উৎপাদনে ধুঁকছে।
বেসরকারি উদ্যোক্তারা অভিযোগ করছেন যে, সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে এক ধরনের চরম অসম প্রতিযোগিতা এই বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করেছে। সরকারি পাটকলগুলো বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ও বিশেষ আর্থিক সুবিধা পেলেও স্বাধীন উদ্যোক্তাদের সম্পূর্ণ নিজেদের পুঁজি এবং চড়া সুদের ব্যাংক ঋণের ওপর ভরসা করে টিকে থাকতে হচ্ছে। এর ওপর আবার নগদ সহায়তা বা ক্যাশ ইনসেনটিভের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে পাটপণ্য রপ্তানিতে ১২ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা পাওয়া যেত, তা কমিয়ে নামমাত্র পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। বহুমুখী পাটপণ্য ও সুতার ওপর থেকেও প্রণোদনা হ্রাসের পাশাপাশি অপরিকল্পিত করের বোঝা, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের দামের লাগামহীন ওঠানামা পুরো বেসরকারি খাতটিকে একরকম পঙ্গু করে দিয়েছে।
অন্যদিকে কাঁচা পাট রপ্তানি দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকায় বিপাকে পড়েছেন দেশের প্রান্তিক কৃষকরাও। পাট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, মৌসুমের শুরুতে ঘরোয়া মিলগুলোর চাহিদা মেটানোর পরেও প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে কাঁচা পাট উদ্বৃত্ত থাকে। কিন্তু রপ্তানি প্রক্রিয়া প্রায় বন্ধ থাকায় সেই অতিরিক্ত পাট সময়মতো বিক্রি করতে না পেরে কৃষকরা মার খাচ্ছেন। জামালপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা আক্ষেপ করে বলছেন যে, সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদনের খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, অথচ কাঁচা পাট বাজারে তোলার ঠিক প্রারম্ভিক মুহূর্তে সিন্ডিকেটের প্রভাবে দাম অত্যন্ত কম থাকে। পরবর্তী সময়ে যখন দাম কিছুটা বাড়ে, ততদিনে অভাবের তাড়নায় সাধারণ কৃষকদের সমস্ত পাট ফড়িয়া ও ব্যবসায়ীদের গোডাউনে চলে যাওয়ায় প্রকৃত চাষিরা কোনো লাভই দেখতে পান না।
এই চরম দুর্দশা থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষজ্ঞরা পাটকে কেবল কাঁচামাল বা সাধারণ সুতা হিসেবে রপ্তানি না করে উচ্চমূল্যের বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরিতে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। একই পরিমাণ কাঁচামাল ব্যবহার করে যেখানে সাধারণ পাট সুতা আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত কম মূল্যে বিক্রি হয়, সেখানে সেই সুতা দিয়েই নিখুঁত পরিবেশবান্ধব ব্যাগ বা আধুনিক টেক্সটাইল পণ্য তৈরি করলে তার দাম কয়েকগুণ বেশি পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশের বর্তমান অবকাঠামো, টেক্সটাইল লজিস্টিকস এবং তৈরি পোশাক খাতের বিশাল নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে একটু সদিচ্ছা থাকলেই এই খাত থেকে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্পূর্ণ সম্ভব। এজন্য অবিলম্বে ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাধাগুলো দূর করতে জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি দেশীয় মিলগুলোতে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং মানসম্মত বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে যে, বন্ধ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত মিলগুলোর একটি বড় অংশ ইতিমধ্যেই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় লিজ দেওয়া হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে বাকিগুলো চালুর প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি বাধ্যতামূলক পাটজাত মোড়ক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, নতুন গবেষণাগার স্থাপন এবং বিশ্ববাজারে দেশীয় ব্র্যান্ডিং জোরদার করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু উদ্যোক্তা ও সাধারণ কৃষকদের মতে, কাগুজে প্রতিশ্রুতি বা দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা দিয়ে বর্তমান সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব। যদি সময়মতো উচ্চ সুদের ঋণ মওকুফ, পর্যাপ্ত প্রণোদনা পুনর্বহাল এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত না করা হয়, তবে সোনালী আঁশের এই সোনালী ইতিহাস কেবল অতীতের পাতাতেই চিরতরে হারিয়ে যাবে।