হাসপাতালের বারান্দায় শ্বাসকষ্টে ধুঁকছে কোলের শিশু। অক্সিজেনের ভারী সিলিন্ডার কাঁধে নিয়ে দিশেহারা বাবা ছুটছেন এক শয্যা থেকে অন্য শয্যায়। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই, আইসিইউ তো আক্ষরিক অর্থেই সোনার হরিণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাসপাতালগুলোতে এখন এমনই এক হৃদয়বিদারক ও ভয়াবহ চিত্র বিরাজ করছে। হামের প্রকোপে যখন সারা দেশে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি, ঠিক তখনই সামনে এসেছে দেশের স্বাস্থ্য খাতের চরম অব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতির অভাবের এক নগ্ন রূপ। জানা গেছে, পুরো দেশের হাম পরীক্ষার একমাত্র ভরসাস্থল রাজধানীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) পরীক্ষাগারে কিট (সরঞ্জাম) তলানিতে এসে ঠেকেছে। মজুত আছে মাত্র সাতটি কিট!
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, নতুন কিট না এলে আগামী ১১ মের পর দেশজুড়ে হামের নমুনা পরীক্ষা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। একদিকে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে রোগ শনাক্তের প্রাথমিক ও প্রধান হাতিয়ারটিই ফুরিয়ে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই মহামারির রূপ নিয়েছে, অথচ নীতিনির্ধারকদের জরুরি উদ্যোগ ও সমন্বয়ের ঘাটতি পুরো সংকটকে এক গভীর খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।
কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার ধস এবং কিট সংকট
দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো—সারা দেশের ১৭ কোটি মানুষের জন্য হাম পরীক্ষার ল্যাবরেটরি মাত্র একটি। রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ছাড়া দেশের আর কোথাও হাম পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রতিদিন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সারা দেশ থেকে গড়ে প্রায় ৩০০ রোগীর রক্তের নমুনা এই পরীক্ষাগারে এসে জমা হয়। কিন্তু কিট সংকটের কারণে পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইতিমধ্যেই আইপিএইচ-এর ল্যাবে ৭ হাজার ৭৫৮টি নমুনা পরীক্ষার অপেক্ষায় স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। মজুত থাকা মাত্র সাতটি কিট দিয়ে সর্বোচ্চ ৬৩০টি রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। অর্থাৎ, বর্তমান হারে পরীক্ষা চালিয়ে গেলে আগামী ছয় দিনের মধ্যেই এই কিট নিঃশেষ হয়ে যাবে। গত এপ্রিল মাস থেকেই এই কিট সংকটের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অথবা জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নেওয়ার চরম ঘাটতির কারণে এখন পর্যন্ত নতুন কিটের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে শনাক্ত হতে শুরু করে। এরপর থেকে গত সোমবার পর্যন্ত ১৬ হাজার ২৫৯টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৮ হাজার ৭৬৯টি নমুনা পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে, যার মধ্যে ৩ হাজার ৭৪৪ জনের শরীরেই হামের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, সংক্রমণের হার প্রায় ৪২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। যেখানে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০টি নমুনা পরীক্ষা করার সক্ষমতা রয়েছে, সেখানে কিটের অভাবে গত মঙ্গলবার মাত্র ১০৭টি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোমিনুর রহমান জানিয়েছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে এক মাস আগেই কিটের চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু এখনো তা এসে পৌঁছায়নি। আগামী ১৫ মের দিকে ১৫টি মেগা কিট আসার আশা করা হচ্ছে। কিন্তু মাঝখানের এই সময়টিতে পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, তা ভেবেই শিউরে উঠছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
মৃত্যু ও সংক্রমণের ভয়াবহ পরিসংখ্যান
হাম কেবল একটি সাধারণ সংক্রামক ব্যাধি হিসেবেই থেমে নেই; এটি এখন শিশুদের জন্য রীতিমতো যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ৩১৭ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে ২৬৩ জন শিশু। সারা দেশে অন্তত ৪২ হাজার ৯৭৯ জন শিশু হামের উপসর্গে আক্রান্ত। এদের মধ্যে ২৯ হাজার ৮৩১ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই অবনতিশীল যে, প্রতিদিন নতুন নতুন মৃত্যুর খবর আসছে। সিলেট ও ময়মনসিংহের চিত্র রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। সিলেটে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার পাঁচ মাস বয়সী প্রিয়ম সরকার এবং বিশ্বনাথ উপজেলার ছয় মাস বয়সী ওমরের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে। অন্যদিকে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও মৃত্যুর মিছিল থামছে না, সেখানে মৃতের সংখ্যা ২৫ ছাড়িয়েছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান পরিস্থিতির ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করে বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। অধিকাংশ শিশুই তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে আসছে। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে সঠিক চিকিৎসার সুযোগ না থাকায়, মুমূর্ষু শিশুদের ঢাকায় পাঠাতে পাঠাতে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। এই বিলম্বের কারণেই জটিলতা বাড়ছে এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে ফুটফুটে শিশুরা।
উদ্যোগের ঘাটতি ও বিশেষজ্ঞদের হতাশা
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফায়সাল এই পরিস্থিতিকে স্পষ্ট অবহেলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, এটি এমন এক গাফিলতি, যা জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। কিট সংকটে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেলে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র যেমন পাওয়া যাবে না, তেমনি ঢাকামুখী রোগীদের চাপও কমানো সম্ভব হবে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন হাম পরীক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা কেবল ঢাকাতেই কেন্দ্রীভূত থাকবে? জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে এই পরীক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশকে হামের উচ্চ ঝুঁকির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তখনই এটিকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে জরুরি অবস্থা জারি করা উচিত ছিল। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য একটি সমন্বিত চিকিৎসা প্রটোকল বা গাইডলাইন তৈরি করে দ্রুত তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তবে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় বা জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। এমনকি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও অক্সিজেনের মতো অতি জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও দীর্ঘসূত্রতা পরিলক্ষিত হয়েছে।
সরকারি পদক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতা
ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকার অবশ্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় দেশব্যাপী ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ইতিমধ্যেই ১ কোটি ৬১ লাখ (প্রায় ৮৯ শতাংশ) শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, কিট সংকট নিরসনে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে এবং আশা করা হচ্ছে ১৫ মের আগেই টিকা ও কিট পাওয়া যাবে। হাসপাতালগুলোতে আলাদা ইউনিট করা হয়েছে এবং অস্থায়ী হাসপাতালও চালু করা হয়েছে।
তবে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ক্রয় পদ্ধতি পরিবর্তন, টিকা কিনতে অযাচিত বিলম্ব এবং কর্মীদের আন্দোলনের কারণে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার বিষয়টিও জনসম্মুখে এসেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যা করা উচিত ছিল এবং আশু করণীয়
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মহামারি মোকাবিলার মৌলিক ধাপগুলোর মধ্যে ডেথ রিভিউ, সমন্বিত চিকিৎসা প্রটোকল, ব্যাপক পরীক্ষা, আইসোলেশন এবং জনসচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। টিকা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে যে ভুল ধারণা রয়েছে, তা দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। স্কুলভিত্তিক টিকাদান কর্মসূচি পুনরায় চালু করা এবং টিকা না পাওয়া শিশুদের শনাক্তে দ্রুত জরিপ চালানো এখন অপরিহার্য। পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মী ও লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানো না গেলে কেবল ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপর নির্ভর করে এই সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব।
একটি স্বাধীন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কেবল একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কিট সরবরাহের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল হয়ে থাকতে পারে না। বিকল্প উৎস থেকে কিট সংগ্রহ, নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জরুরি আপৎকালীন পরিকল্পনা থাকাটা যেকোনো স্বাস্থ্য কাঠামোর প্রাথমিক শর্ত।
আজ যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোনো বাবা তার শ্বাসকষ্টে ভোগা সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে বসে কাঁদছেন, তখন সেই কান্নার দায় কেবল ওই নির্দিষ্ট ভাইরাসের নয়; এই দায় সেই ভঙ্গুর ব্যবস্থারও, যা একটি আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও নিজেকে প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এখনই যদি মহামারি ঘোষণা করে সর্বশক্তি নিয়োগ করা না হয়, তবে আগামী দিনগুলোতে এই মৃত্যুর পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা হয়েই থাকবে না, এটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে চিরকাল প্রশ্নবিদ্ধ করবে আমাদের সক্ষমতা ও সদিচ্ছাকে।
(সূত্র: সমকাল ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যম)