মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এখন আর কেবল একটি গৃহযুদ্ধকবলিত জনপদ নয়; এটি এখন বিশ্বশক্তির এক ভয়াবহ ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা প্রচ্ছন্ন যুদ্ধের ময়দান। এই যুদ্ধের একদিকে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘বার্মা অ্যাক্ট’ ও গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, অন্যদিকে আছে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) এবং কিয়াকফিউ বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মরিয়া প্রচেষ্টা। আর এই দুই দানবের মাঝখানে পড়ে ভারত তার দীর্ঘদিনের লালিত ‘কালাদান প্রকল্প’ নিয়ে চরম অস্তিত্ব সংকটে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ত্রিমুখী লড়াইয়ের ভৌগোলিক কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করায় বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ঝুঁকিতে দাঁড়িয়ে আছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য বা ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর জন্য সমুদ্রপথের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সিত্তে (Sittwe) বন্দর। কলকাতা থেকে সরাসরি সমুদ্রপথে সিত্তে হয়ে মিজোরাম পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনের জন্য ভারত ‘কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্পে কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ভারতের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের ‘চিকেন’স নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোরের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি উত্তর-পূর্ব ভারতে পণ্য পৌঁছানো। ২০২৩ সালের মে মাসে ঘটা করে এই বন্দরের উদ্বোধন করা হয়েছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের মার্চের শেষভাগের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। আরাকান আর্মি (AA) এখন সিত্তে শহরকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। নৌবাহিনীর ঘাঁটি থেকে মাত্র কয়েকশ ফুট দূরে তাদের অবস্থান। সিত্তে যদি আরাকান আর্মির হাতে চলে যায়, তবে ভারতের কালাদান প্রকল্প কার্যত মৃত ঘোষণা করতে হবে। অভিযোগ আছে, চীন পর্দার আড়াল থেকে আরাকান আর্মিকে এমনভাবে প্ররোচিত করছে যাতে তারা ভারতের এই সংযোগ পথটি অচল করে দেয়। এর ফলে ভারতের সেভেন সিস্টার্স সবসময় অস্থির থাকবে এবং ভারত বাধ্য হয়ে বাংলাদেশের কাছে করিডোর বা ট্রানজিটের জন্য আরও বেশি মুখাপেক্ষী হবে।
রাখাইন রাজ্যে চীনের প্রধান স্বার্থ হলো কিয়াকফিউ (Kyaukphyu) গভীর সমুদ্র বন্দর এবং সেখান থেকে কুনমিং পর্যন্ত বিস্তৃত জ্বালানি পাইপলাইন। চীন এখানে এক অদ্ভুত দ্বিচারিতা বা ডাবল গেম খেলছে। একদিকে তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে, অন্যদিকে আরাকান আর্মির সাথে নিয়মিত গোপন বৈঠক করছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কুনমিংয়ে এবং মার্চ মাসে পুনরায় শান্তি আলোচনার নামে চীন বিদ্রোহীদের সাথে সমঝোতা করেছে। চীনের লক্ষ্য পরিষ্কার—জান্তা থাকুক বা আরাকান আর্মি আসুক, তাদের কিয়াকফিউ বন্দরের মালিকানা ও পাইপলাইনের নিরাপত্তা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে। ভারতের সিত্তে বন্দর অচল করে দিয়ে নিজেদের কিয়াকফিউ বন্দরকে একচ্ছত্র আধিপত্য পাইয়ে দিতে চীন আরাকান আর্মিকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে জান্তা সরকারকে হটিয়ে একটি অনুগত শক্তি বসাতে চায়। ‘বার্মা অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে তারা জান্তা বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে লজিস্টিক ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। আমেরিকার প্রধান আশ্রয়স্থল এখানে বাংলাদেশ। ভূ-রাজনৈতিকভাবে রাখাইন স্টেট বাংলাদেশের কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তের সাথে লাগোয়া। অভিযোগ আছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বা তার আগে থেকেই আমেরিকা বাংলাদেশকে চাপ দিয়ে আসছিল আরাকান আর্মিকে ‘মানবিক করিডোর’ দেওয়ার জন্য। এটি আসলে মানবিকতার আড়ালে বিদ্রোহীদের রসদ ও লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়ার একটি কৌশল।
সম্প্রতি ১৩ই মার্চ মিয়ানমার সীমান্তে ৬ জন ইউক্রেনীয় এবং ১ জন আমেরিকান নাগরিকের গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক পরামর্শদাতারা সরাসরি কাজ করছেন। আমেরিকা চায় আরাকান আর্মিকে ব্যবহার করে চীনের কিয়াকফিউ বন্দরের পথ রুদ্ধ করতে এবং বঙ্গোপসাগরে নিজেদের একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে।
অনেকেই মনে করেন মিয়ানমারে জান্তা সরকার হারলে বা আরাকান আর্মি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়লে বাংলাদেশের লাভ। কিন্তু বাস্তবতা এর বিপরীত হতে পারে।
সীমান্ত অস্থিরতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদ: আরাকান আর্মির উত্থান সরাসরি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে (যেমন কেএনএফ বা উলফা) উৎসাহিত করতে পারে। বিদ্রহি গ্রুপগুলো যদি সিত্তে বন্দরের অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে একজোট হয়, তবে বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে।
কাপলান পরিকল্পনা ও ‘হিল স্টেট’ চক্রান্ত: ব্রিটিশ আমলের সেই বিতর্কিত ‘হিল স্টেট’ বা একটি পৃথক খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা (যাতে মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের একাংশ থাকতে পারে) নিয়ে পর্দার আড়ালে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আশির দশকে আমেরিকা এই পরিকল্পনায় সমর্থন দিয়েছিল। আরাকান আর্মি যদি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে, তবে সেই আগুনের আঁচ বাংলাদেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে লাগার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত: আরাকান আর্মি এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বা মর্যাদার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। রাখাইনে যদি এক দশকের জন্য গৃহযুদ্ধ স্থায়ী হয়, তবে ১২ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন কোনোদিনই সম্ভব হবে না, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এক বিশাল বোঝা হয়ে থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকার এখন এক কঠিন অগ্নিকুণ্ডের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। একদিকে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ, অন্যদিকে চীনের বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং সর্বোপরি আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা। বাংলাদেশ যদি ভুল করে কোনো এক পক্ষকে সমর্থন দিয়ে ফেলে (যেমন আরাকান আর্মিকে লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া), তবে অন্য দুই শক্তি বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
ইতিহাস বলছে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহরের মহড়া এবং নভেম্বরে সেন্ট মার্টিনের রহস্যময় বিচ্ছিন্নতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল বড় কোনো দাবার চালের অংশ। এখন সিত্তে বন্দর কার হাতে যাবে, তা শুধু মিয়ানমারের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না; বরং তা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ভবিষ্যৎ।
মিয়ানমার এখন আর কেবল একটি রাষ্ট্র নয়; এটি এখন আমেরিকা-চীন-ভারতের এক ‘প্যান্ডোরা’স বক্স’ বা রহস্যময় বাক্স। সিত্তে ও কিয়াকফিউ বন্দর নিয়ে এই প্রক্সি যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বাংলাদেশ একটি স্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে পড়ে যাবে। আপনার বাড়ির আঙিনায় যদি তিনটি বিশাল পান্ডা কুস্তি লড়ে, তবে আপনার ঘরটি কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিকে এখন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সাজাতে হবে, যাতে এই পরাশক্তিগুলোর লড়াইয়ে আমাদের সার্বভৌমত্ব বলি না হয়।