ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গত বছর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, তখন দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। মানুষের আশা ছিল, এই সরকার দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে এবং প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই সেই প্রত্যাশার বেলুনে যেন ফুটো হতে শুরু করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে খোদ সরকারের ভেতরেই তৈরি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। বিশেষ করে সরকারের আড়ালে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বা একটি অদৃশ্য ক্ষমতা বলয়ের অস্তিত্ব নিয়ে খোদ উপদেষ্টারাই এখন প্রকাশ্যে বোমা ফাটাচ্ছেন, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জন্ম দিয়েছে এক নতুন বিতর্কের।
সরকারের ভেতরে যে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে অন্য কোথাও থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রথম বোমাটি ফাটিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি গণমাধ্যমকে স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন যে, সরকারের অধিকাংশ বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো মূলত উপদেষ্টা পরিষদের বাইরেই নেওয়া হতো।
তার সেই অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ নিয়ে একেবারে হাঁড়ির খবর ফাঁস করেছেন খোদ পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। সম্প্রতি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বিস্ফোরক দাবি করে বলেন, সরকারের মূল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাত সদস্যের একটি ‘কিচেন ক্যাবিনেট’, যাদের গোপন বৈঠক বসত প্রতি মঙ্গলবার। শুধু তাই নয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এই ক্যাবিনেটের একাধিক উপদেষ্টার অযাচিত হস্তক্ষেপ ও অতিরিক্ত প্রভাব খাটানোর কারণে তিনি রীতিমতো অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক ছিল যে, তিনি বিরক্ত হয়ে তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন, যদিও সরকারপ্রধান তা গ্রহণ করেননি।
রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বলতে বোঝায় এমন একটি অনানুষ্ঠানিক ও ক্ষুদ্র উপদেষ্টা গোষ্ঠীকে, যারা রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং মূল মন্ত্রিসভাকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণে সরাসরি প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা রাখে। উনিশ শতকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের শাসনামলে এই শব্দটির প্রথম উৎপত্তি ঘটে। জ্যাকসন যখন তার মূল ক্যাবিনেটকে পাশ কাটিয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন, তখন বিরোধীরা তাকে ব্যঙ্গ করে এই আখ্যা দিয়েছিল।
গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এই শব্দটি সাধারণত অত্যন্ত নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হয়। কারণ, যেখানেই এমন ছায়া বা অদৃশ্য ক্ষমতা কেন্দ্র তৈরি হয়, সেখানেই স্বচ্ছতার চরম অভাব দেখা দেয়, জবাবদিহিতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটি সাধারণ মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অস্পষ্ট ও ধোঁয়াশায় ঢাকা থাকে।
সরকারিভাবে কখনোই এমন কোনো ক্যাবিনেট বা গোষ্ঠীর অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়নি, ফলে এর সদস্যদের কোনো সুনির্দিষ্ট বা আনুষ্ঠানিক তালিকাও কোথাও নেই। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গণমাধ্যম এবং ক্ষুব্ধ উপদেষ্টাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, এই বলয়টি মূলত তৈরি হয়েছিল উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন অতি-প্রভাবশালী সদস্য, সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কয়েকজন আমলা এবং নিরাপত্তা কাঠামোর শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন ব্যক্তিকে নিয়ে।
যাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ, তারা অবশ্য এই পুরো বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। তাদের যুক্তি হলো, যেকোনো সংকটকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বার্থে সরকারপ্রধানকে কিছু নির্দিষ্ট ও বিশ্বস্ত মানুষের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়, যাকে অবৈধ ক্ষমতা বলয় বলাটা অযৌক্তিক।
জনমনে এখন সবচেয়ে বড় ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো—উপদেষ্টারা যখন স্বপদে বহাল ছিলেন, তখন কেন তারা এই ছায়া বলয়ের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটিও করেননি? এতদিন পর কেন তারা হঠাৎ করে সরব হয়ে উঠলেন?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই হঠাৎ মুখ খোলার পেছনে একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক একটি বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তি। এই চুক্তিটি সামনে আসতেই সরকারের ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। রাজনীতিতে ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ে অসন্তোষ সাধারণত তখনই প্রকাশ্যে আসে, যখন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তীব্র হয় বা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বদলাতে শুরু করে। এর পেছনে আরও তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে:
আস্থা ও সমন্বয়ের অভাব: সরকারের ভেতরে দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে উপদেষ্টাদের মধ্যে মতবিরোধ চরমে পৌঁছানোর কারণেই এখন বিষয়গুলো প্রকাশ্যে চলে আসছে।
দায় এড়ানোর কৌশল: অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক সিদ্ধান্তই হয়তো জনপ্রিয় হয়নি বা সমালোচিত হয়েছে। সেই ব্যর্থতার দায়ভার পুরো পরিষদের কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করতেই উপদেষ্টারা এখন বলতে চাইছেন যে, ওই সিদ্ধান্তগুলো তাদের ছিল না, বরং বিশেষ একটি গোষ্ঠীর ছিল।
ভবিষ্যতের রাজনৈতিক নিরাপত্তা: অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ময়দানে নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত রাখতে এবং যেকোনো সম্ভাব্য আইনি বা রাজনৈতিক বিতর্কের হাত থেকে বাঁচতেই উপদেষ্টারা এখন নিজেদের বক্তব্য আগেভাগেই নথিভুক্ত করে রাখছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছায়া সরকার বা অদৃশ্য ক্ষমতা কেন্দ্রের অভিযোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। অতীতে প্রায় প্রতিটি সরকারের আমলেই এমন অভিযোগ উঠেছে। তবে বর্তমান বিতর্কের বিশেষত্ব হলো, এই অন্তর্বর্তী সরকারের মূল ভিত্তিই ছিল নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং ছাত্র-জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষা। সেখানে যদি জবাবদিহিহীন কোনো অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতা বলয় তৈরি হয়ে থাকে, তবে তা সাধারণ মানুষের প্রতি এক ধরনের প্রবঞ্চনা। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত যেখান থেকেই আসুক না কেন, তার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিচেন ক্যাবিনেট বিতর্ক আজ দেশের মানুষকে আবারো সেই পুরনো প্রশ্নটির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা আসলে কোথায় এবং কার হাতে কেন্দ্রীভূত?