গত ২৬ অক্টোবর পুরান ঢাকার কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশের একটি অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক যে চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন, তা দেশের আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিমূলে এক বিরাট আঘাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে | তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন যে, সরকার যদি অনুমোদন দেয় তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত পন্থার আশ্রয় নিতে দ্বিধাবোধ করবে না | রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ একজন পুলিশ কর্মকর্তার মুখ থেকে এ ধরনের বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য আসার পর স্বাভাবিকভাবেই দেশজুড়ে মানবাধিকার সংগঠন, বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞ এবং সচেতন নাগরিকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে | তাঁরা এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রধানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন | দেশের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষার পাশাপাশি আইনের আশ্রয় লাভের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে, অথচ আইজিপির এই বক্তব্য সরাসরি সেই সাংঘর্ষিক অধিকারের পরিপন্থী এবং এটি প্রকারান্তরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পথকে পুনরায় প্রশস্ত করারই একটি বিপজ্জনক ইঙ্গিত দেয় |
পুলিশ প্রধানের বক্তব্যে আরও উল্লেখ করা হয়েছিল যে, পুলিশ কঠোর ভূমিকা পালন করলে তাদের ফ্যাসিস্ট তকমা দেওয়া হয় আবার নিষ্ক্রিয় থাকলে দুর্বল বলে সমালোচনা করা হয়, যার জন্য তাদের উপযুক্ত কাজের পরিবেশ প্রয়োজন | কিন্তু এই যুক্তির আড়ালে মূলত পুলিশ বাহিনীর মূল দায়িত্বকেই লঘু করে দেখা হয়েছে | পরিবেশ বা পরিস্থিতির অবনতি যাই হোক না কেন, পুলিশের কাজ কদাচিৎ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া হতে পারে না | পুলিশ বাহিনীকে যেকোনো মূল্যে অপরাধ দমন করতে হবে এবং চিহ্নিত অপরাধীদের ধরে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ায় আদালতের বিচার ব্যবস্থার হাতে সঁপে দিতে হবে | আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় বসে থাকার বা নিজের পছন্দমতো বিচার করার কোনো অবকাশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই | সমাজের অতি প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি বা এমনকি খোদ পুলিশ বাহিনীর কোনো সদস্যও যদি অপরাধে জড়িত থাকে, তবে তাকেও কঠোরভাবে প্রচলিত আইন ও যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মোকাবিলা করতে হবে, যার কোনো বিকল্প থাকতে পারে না |
সবচেয়ে বড় কথা হলো, ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, যেখানে বিগত সরকারের আমলের অসংখ্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নগ্ন ইতিহাস নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ঘৃণা ও সংস্কারের দাবি উঠেছিল, ঠিক তার পরবর্তী সময়ে একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার এমন উসকানিমূলক মন্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক | এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামোগত জায়গাটিতে কাঙ্ক্ষিত মানসিক পরিবর্তন এখনো সাধিত হয়নি এবং পুরোনো স্বৈরাচারী সংস্কৃতির ভূত তাদের মাথা থেকে পুরোপুরি যায়নি | যখন এই বক্তব্য ঘিরে চারদিকে সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করে, তখন পুলিশ সদর দপ্তর থেকে অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে দুটি পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যা দিয়ে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় | প্রথম বিবৃতিতে দাবি করা হয় যে আইজিপি শব্দটি তার আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করেছেন এবং পরবর্তীতে আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয় এটি সম্পূর্ণ রূপক অর্থে বলা হয়েছে | কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নামক কলঙ্কজনক শব্দটিকে আক্ষরিক কিংবা রূপক—কোনো অর্থেই ব্যবহার করার ন্যূনতম নৈতিক বা আইনি অধিকার পুলিশের নেই | কারণ এই শব্দটির আড়ালেই যুগ যুগ ধরে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে এবং অপরাধের বিচার না করে সরাসরি প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পৈশাচিকতাকে জায়েজ করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে |
অপরাধ নির্মূলের নামে এ ধরনের শর্টকাট বা বিচারবহির্ভূত পন্থার আশ্রয় না নিয়ে পুলিশ বাহিনীর মূল মনোযোগ দেওয়া উচিত মামলার নিখুঁত তদন্ত এবং প্রসিকিউশন বা বিচারিক প্রক্রিয়াকে ত্রুটিমুক্ত করার দিকে | আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থায় অপরাধীরা অনেক সময় শাস্তি থেকে বেঁচে যায় কেবল দুর্বল তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণের ঘাটতি এবং পুলিশি কার্যক্রমে পেশাদারিত্বের অভাবের কারণে | তাই পুলিশের উচিত নিজেদের জনবল ও তদন্তের মান উন্নত করা, যাতে অপরাধীরা আদালতে পর্যাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথভাবে দণ্ডিত হতে পারে | বর্তমান সরকারের দায়িত্ব হবে এই পুলিশ প্রধানের বক্তব্যের বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া এবং পুরো বাহিনীকে মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং সংবিধানের সঠিক পাঠ দেওয়া |