বিদায়ি বছরে দেশবাসীর মধ্যে বাসা বেঁধেছিল ভূমিকম্প আতঙ্ক। বছরের শেষ প্রান্তে এসে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে সারা দেশে ১০ জন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হন। অনেক দুর্বল কাঠামোর ভবন হেলে পড়ে, ফাটল ধরে। ৬ মাসের ব্যবধানে ১৪ বার ভূ-কম্পন অনুভূত হয়। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা দুর্বল কাঠামোর বহুতল স্থাপনার কারণে রাজধানী ঢাকার বাসিন্দারা বছরজুড়েই ভূমিকম্প ঝুঁকিতে ছিলেন অনিরাপদ, আতঙ্কে
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এতে হালকা কম্পন অনুভূত হয়। এরপর মাত্র আট দিনের ব্যবধানে ২৪ ডিসেম্বর রংপুরের বদরগঞ্জে ২ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এতে খুব হালকা কম্পন অনুভূত হয়। ওই সময়ই বিশেষজ্ঞরা জানান, ছোট ছোট ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস। বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় তারা সরকারের সংশ্লিষ্টদের সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন।
বিএমডি সংশ্লিষ্টরা জানায়, গত বছরের ৫ মার্চ ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্পন অনুভূত হয়। এতে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়। এরপর ১৭ জুলাই মিয়ানমারের মাওলাইকে ৪ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকাসহ সারা দেশে হালকা কম্পন অনুভূত হয়। এর তিন মাসের মাথায় ২০ অক্টোবর কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারির কৃষ্ণপাট এলাকায় ৩ দশমিক ৪ মাত্রার ভূ-কম্পন অনুভূত হয়। পরের মাস অর্থাৎ গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এতে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় বড় কম্পন অনুভূত হয়। হেলে পড়ে অনেক ভবন। ওই ভূমিকম্পে সারা দেশে ১০ জন নিহত হন। পরের দিন ২২ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর পলাশ। একইদিন সন্ধ্যায় ১ সেকেন্ডের ব্যবধানে প্রথমে ৩ দশমিক ৭ মাত্রায় ঢাকার বাড্ডায় এবং ৪ দশমিক ৩ মাত্রায় নরসিংদীতে ভূকম্পন হয়। এরপর ২৬ নভেম্বর রাত ৩টা ২৯ মিনিটে বঙ্গোপসাগরে ৪ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল টেকনাফ থেকে ১১৮ কিলোমিটার দূরে। এর ঠিক এক মিনিট পরে ৩ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এবারের উৎপত্তিস্থল ছিল সিলেট এলাকা। পরের দিন বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা ১৫ মিনিটের পর ৩ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে। এরপর ২ ডিসেম্বর মঙ্গলবার ভোর রাতে একটি ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। ঢাকাসহ কিছু এলাকায় এর কম্পন পাওয়া গেছে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৯। উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের ফালাম এলাকায়। ওই স্পটটি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকা। উৎপত্তিস্থল থেকে ঢাকার দূরত্ব প্রায় ৪৩০ বর্গকিলোমিটার। সবশেষ ৪ ডিসেম্বর সকাল ৬টা ১৪ মিনিটে ৪ দশমিক ১ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক এবং ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী জানান, বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। সেজন্য ঢাকাসহ সারা দেশের ভবন বা স্থাপনাগুলো ভূমিকম্প সহনীয় করে গড়ে তুলতে হবে। গত বছরের বারবার ভূমিকম্প এর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভূমিকম্প সহনীয় নির্মাণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন ভূমিব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন করে নির্মাণ নিশ্চিত করা এবং একটা নির্ধারিত সময় পরপর ভবন বা স্থাপনার কাঠামোগত নিরাপত্তা নীরিক্ষা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
বাংলাদেশ সরকারের আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক এবং ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ড. মো. আব্দুল লতিফ হেলালী বলেন, ভূমিকম্প সহনীয় নগর গড়তে একটি উন্নত দেশ হওয়া সত্ত্বেও জাপানের প্রায় ৩০ বছর লেগেছে। সেখানে ঢাকাকে ভূমিকম্প সহনীয় করে গড়ে তুলতে অন্তত ৫০ বছর লাগবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এমন বাস্তবতার মধ্যে বাংলাদেশে কাজ শুরু করার পর তা আবার বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম জানান, গত বছর বারবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এতে নগরীর কিছু ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং কয়েকটি ভবন হেলে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। রাজউক তাৎক্ষণিকভাবে সেসব বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। রাজউক চেষ্টা করছে ৭ থেকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল নির্মাণ নিশ্চিত করতে। এ লক্ষ্যে বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে এটা তখনই সফল হবে, যখন ভবন মালিকরা রাজউকের অনুমোদন নিয়ে ভবন নির্মাণ করবে।