• শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬, ০৬:১৩ অপরাহ্ন
Headline
বিদেশ থেকে মহাখালীর হাসপাতাল পাড়া নিয়ন্ত্রণ করছে ‘রুবেল বাহিনী’ কতটুকু মাংস খাওয়া নিরাপদ? মাসিক ব্যবস্থাপনায় শৌচাগার সংকট ও সামাজিক সচেতনতার অভাব কলকাতায় কোরবানির ঈদ: রাজনৈতিক পালাবদলে চেনা উৎসবের নতুন রূপ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনী ঘিরে হুমকি: উদ্বিগ্ন নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মীরা আপনার হাতে থাকা টাকার মূল্য কতটা কমে গেছে জানেন? এটিএম বুথে নগদ টাকার সংকট, চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ চামড়ার বাজারে চরম ধস হতাশায় ভুগছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ঢুকলো ৪০ হাজার কাঁচা চামড়া যৌন সহিংসতার অভিযোগে জাতিসংঘ কর্তৃক ইসরাইল কালো তালিকাভুক্ত

আপনার হাতে থাকা টাকার মূল্য কতটা কমে গেছে জানেন?

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

ছোটবেলায় ঈদের দিন যে ২ টাকা বা ৫ টাকা সালামি পেয়ে আমরা আনন্দে আত্মহারা হতাম, আজ সেই টাকার কোনো মূল্য আছে কি? একটু ভেবে দেখুন তো, সে সময় আপনার বাবার আয় কত ছিল আর বর্তমানে আপনার আয় কত? আয় কয়েকগুণ বাড়ার পরও কি মাসের শেষ দিকে এসে হিমশিম খেতে হচ্ছে না? আপনি একা নন, বর্তমান সময়ে প্রায় প্রতিটি মধ্যবিত্ত বা সীমিত আয়ের মানুষের মুখে একই আক্ষেপ শোনা যায়—‘টাকা আছে, কিন্তু টাকার আগের মতো মূল্য নেই।’ অর্থনীতির ভাষায় টাকার এই নীরব ও অদৃশ্য ক্ষয়কে বলা হয় ‘ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস’ বা ‘পার্চেজিং পাওয়ার কমে যাওয়া’। অর্থাৎ আপনার পকেটে টাকার অঙ্ক একই থাকলেও, সেই টাকা দিয়ে আগের তুলনায় অনেক কম পরিমাণ পণ্য বা সেবা কেনা যাচ্ছে। আর সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে কলকাঠি নাড়ছে যে অদৃশ্য শক্তি, তার নাম ‘মূল্যস্ফীতি’।

গত কয়েক বছর ধরে দেশে যে হারে ধারাবাহিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে, তাতে দেশের মানুষের কাগজে-কলমে আয় বাড়লেও প্রকৃত বা বাস্তব আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে। আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে অত্যন্ত দ্রুত ও অস্বাভাবিক গতিতে। এই অসম প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হচ্ছেন স্থির আয়ের মানুষ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে মানুষের জমানো সঞ্চয় ফুরিয়ে যাচ্ছে, বাধ্য হয়ে মানুষ ঋণ নিচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে দেশে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে, যা আগের মাস মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থনীতিবিদ ও বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব বাজারে পড়ায় মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে টানা চার মাস মূল্যস্ফীতি বাড়ার পর মার্চে সামান্য কমলেও এপ্রিলে তা আবারও বেড়ে গেছে। গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসই মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করা দেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় অশনিসংকেত।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি এভাবে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করলে টাকার প্রকৃত মান বা ভ্যালু খুব দ্রুত কমে যায়। কয়েক বছর আগেও ১ লাখ টাকা দিয়ে যে পরিমাণ পণ্য বা সেবা কেনা যেত, আজ সেই একই পরিমাণ পণ্য কিনতে অনেক বেশি টাকার প্রয়োজন হচ্ছে। যদি বার্ষিক মূল্যস্ফীতি গড়ে ৯ থেকে ১০ শতাংশের ঘরে থাকে, তবে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা অর্ধেক বা তার বেশি কমে যেতে পারে। সহজ কথায়, আগে ১ লাখ টাকায় যে মানের জীবনযাত্রা নির্বাহ করা যেত, এখন সেই একই জীবনমান ধরে রাখতে একজন মানুষকে কমপক্ষে ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। এটি হচ্ছে ‘টাকার নীরব ক্ষয়’, যা মানুষ বুঝে ওঠার আগেই তার কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য নিঃশেষ করে দেয়।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজার ঘুরে নিত্যপণ্যের দামের দিকে তাকালেই টাকার মান কমে যাওয়ার এই রূঢ় বাস্তবতা খুব সহজেই বোঝা যায়। ২০২১ সালে যে ভালো মানের চাল ৫৮ থেকে ৬৫ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেই একই চাল কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৮৫ থেকে ১০০ টাকা। শুধু চাল নয়; ভোজ্যতেল, ডাল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ থেকে শুরু করে সবজি—প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম কয়েক দফায় লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। জিনিসপত্রের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে অনেক পরিবারের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসই সম্পূর্ণ বদলে গেছে। যে পরিবারটি আগে সপ্তাহে অন্তত দুই-তিন দিন গরুর মাংস খেত, এখন তারা মাসে একবারও মাংস কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। পুষ্টিকর খাবার, বড় মাছ কিংবা ফলমূল ধীরে ধীরে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের পাত থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। মানিক নগরের বাসিন্দা তানিয়া সুলতানা আক্ষেপ করে বলেন, “গত বছর যে টাকায় পুরো সংসার চলত, এখন সেই টাকায় কিছুই হয় না। চাল, বাড়িভাড়া, যাতায়াত—সবকিছুর খরচ বেড়েছে। মাস শেষ হওয়ার আগেই পকেটের টাকা ফুরিয়ে যায়।”

মূল্যস্ফীতি আসলে কী এবং কেন এটি ঘটে, তা বোঝা জরুরি। মূল্যস্ফীতি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, যখন সময়ের সাথে সাথে বাজারে পণ্য ও সেবার দাম বাড়তে থাকে এবং টাকার ক্রয়ক্ষমতা আনুপাতিক হারে কমতে থাকে। একসময় মানুষ পকেটে করে টাকা নিয়ে বাজারে যেত এবং বড় ব্যাগভর্তি করে বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরত। কিন্তু এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, মানুষ ব্যাগভর্তি করে টাকা নিয়ে বাজারে যায় এবং পকেটে করে বাজার নিয়ে ফেরে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে বেশ কয়েকটি বড় কারণ দায়ী। প্রথমত, ডলার সংকট এবং টাকার অবমূল্যায়ন। টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাজারে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির দাম বাড়ায় কৃষি ও শিল্প খাতে উৎপাদন এবং পরিবহন খরচ বেড়েছে। তৃতীয়ত, বাজার ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতা, চাঁদাবাজি এবং সিন্ডিকেটের কারণে অনেক সময় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়। এছাড়া অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক অস্থিরতাও দেশের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

বর্তমানে দেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি একাধিকবার দুই অঙ্কের ঘর অতিক্রম করেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন উচ্চ পর্যায়ে থাকলে শুধু অর্থনীতি নয়, বরং সমাজের কাঠামোও ভেঙে পড়ে। নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের সিংহভাগই চলে যায় খাবার কিনতে। ফলে চাল বা ডালের দাম সামান্য বাড়লেও তাদের পুরো জীবনযাত্রা থমকে যায়, সমাজে পুষ্টিহীনতা বাড়ে এবং জীবনমানের চরম অবনতি ঘটে। সরকারি বা বেসরকারি খাতে অনেক কর্মীর বেতন কিছুটা বাড়লেও, বাজারের আগুন দামের সাথে সেই সামান্য বৃদ্ধি কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে কাগজে-কলমে বেতন বাড়লেও মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে এবং জীবনযাত্রার মানে কোনো উন্নতি হচ্ছে না।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে ব্যাংকে টাকা জমিয়ে রাখাও এখন আর কোনো স্বস্তির বিষয় নয়। কারণ, ব্যাংকের সুদের হার প্রায়শই মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম থাকে। এর মানে হলো, ব্যাংকে আপনার জমানো টাকার অঙ্ক হয়তো বাড়ছে, কিন্তু সেই টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘নেগেটিভ রিয়েল রিটার্ন’। এই সংকটে সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। উচ্চবিত্তরা সম্পদ বাড়িয়ে নিতে পারে, আর নিম্নবিত্তরা কিছু সরকারি সহায়তা পায়। কিন্তু মধ্যবিত্তরা না পারে সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে, না পারে আয় বাড়াতে। ফলে বাধ্য হয়ে তারা তাদের সঞ্চয় ভাঙছে, সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়ানো বা কোচিং বন্ধ করছে, এমনকি পরিবারের চিকিৎসা ও বিনোদন ব্যয়ও ছাঁটাই করছে।

যদিও অর্থনীতিবিদরা মনে করেন যে, ২ থেকে ৩ শতাংশের মতো মৃদু মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির জন্য ভালো এবং তা ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সাহায্য করে। তবে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি কিংবা জিম্বাবুয়ে ও ভেনেজুয়েলার মতো ‘হাইপার-ইনফ্লেশন’ দেশের পুরো অর্থনৈতিক ভিত্তিকেই ধ্বংস করে দিতে পারে। এই নীরব ক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচতে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সরকারকে বাজার তদারকি জোরদার করা, সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া, উৎপাদন খরচ কমানো, ডলারের বাজার স্থিতিশীল করা এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনার মতো সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে মানুষের পকেটে টাকা থাকলেও সেই টাকার প্রকৃত মূল্য শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে বাধ্য।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category