• সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৬ পূর্বাহ্ন

আর্থিক কেলেঙ্কারিতে চার সাবেক এমডি কারাগারে, দুদক আতঙ্কে কাঁপছে ব্যাংক খাত

Reporter Name / ৪৭ Time View
Update : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

দেশের ব্যাংক খাতে সংঘটিত সীমাহীন লুটপাট ও আর্থিক অনিয়মের জেরে বর্তমানে কারাগারে বন্দি রয়েছেন সাবেক চার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একাধিক মামলায় তাদের কারাবাসের ঘটনায় দেশের পুরো আর্থিক খাতে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। গ্রেপ্তার ও শাস্তির ভয়ে অনেক শীর্ষ ব্যাংক কর্মকর্তা ইতোমধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, আর যারা দেশে আছেন তারা দিন কাটাচ্ছেন প্রবল উৎকণ্ঠায়। ব্যাংকের শীর্ষ পদে থাকা কর্মকর্তাদের এমন পরিণতিতে বর্তমান ব্যাংকারদের মধ্যেও এক ধরনের মানসিক ট্রমা তৈরি হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহে।

কারাগারে বন্দি এই চার শীর্ষ ব্যাংকারের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারে সহযোগিতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এননটেক্স গ্রুপের বিপুল অঙ্কের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় টানা ছয় বছর এমডির দায়িত্ব পালন করা আব্দুছ ছালাম আজাদ বর্তমানে কারাবন্দি। একইভাবে, অগ্রণী ব্যাংকের ১৮৯ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির এক পুরোনো মামলায় গত বছরের নভেম্বরে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের সাবেক এমডি ওবায়েদ উল্লাহ মাসুদ। এছাড়া, ইসলামী ব্যাংকের ১ হাজার ৯২ কোটি টাকা আত্মসাতে সহযোগিতার অভিযোগে ব্যাংকটির সাবেক এমডি মনিরুল মওলা এবং এক্সিম ব্যাংক থেকে ৮৫৭ কোটি টাকা পাচারে যুক্ত থাকার অভিযোগে সাবেক এমডি ফিরোজ হোসেনও দীর্ঘদিন ধরে কারাবাস করছেন।

ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের কারাদণ্ডের এই ঘটনা বিশ্বে নতুন নয়। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং বিভিন্ন সময়ে আর্থিক বিপর্যয়ের কারণে আইসল্যান্ড, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, আয়ারল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতেও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকারদের কঠোর শাস্তির নজির রয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি এতটাই ব্যাপক যে, দুদকের মতে এই খাতের অনিয়মের মামলার সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। একটি ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা ১৫ থেকে ২০ জন কর্মকর্তা হিসেবে এসব মামলায় কয়েক হাজার ব্যাংকারকে আসামি করার প্রক্রিয়া চলছে। এমডি, ডিএমডি থেকে শুরু করে বিভাগীয় ও শাখা প্রধানরাও এই তালিকায় রয়েছেন। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক এমডি ও ডিএমডি গোপনে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও পর্ষদের যোগসাজশে গত দেড় দশকে দেশের ব্যাংক খাত চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রভাবশালীদের চাপে শীর্ষ নির্বাহীরা অনিয়মে জড়াতে বাধ্য হলেও দিন শেষে তারাই বলির পাঁঠা হচ্ছেন। এই ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে বর্তমান ব্যাংকাররা নতুন করে ঋণ অনুমোদন দিতে ভয় পাচ্ছেন, ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতের অবস্থা এখন অত্যন্ত নাজুক। গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ শতাংশ এবং বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। দেশের ৬২টি ব্যাংকের অর্ধেকই ভঙ্গুর দশায় রয়েছে, যার মধ্যে ২৪টি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে এবং ১২টি ব্যাংক গ্রাহকের আমানত পর্যন্ত ফেরত দিতে পারছে না। বিশেষ করে এস আলম ও নাসা গ্রুপের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

ব্যাংক লুটের এই মহোৎসবের পেছনে মূলত রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত পর্ষদ ও প্রভাবশালীদের সরাসরি ইন্ধন ছিল। ২০০৯ সালের পর বেসিক ব্যাংক ধ্বংসের মূল কারিগর তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু কিংবা অগ্রণী, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকের আলোচিত সাবেক এমডিদের অনেকেই আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিদেশে পালিয়ে গেছেন। ব্যাংকার ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু নির্বাহীদের সাজা দিলেই হবে না, বরং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে লুটপাটের মূল হোতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা না হলে দেশের ধুঁকতে থাকা এই আর্থিক খাতকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।

তথ্যসূত্র: বণিকবার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category