• শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৭ অপরাহ্ন
Headline
দুই মাসেই তলানিতে বিএনপির জনপ্রিয়তা, সরকারের দলীয়করণ নিয়ে তোপ নাহিদের জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর সরকার, বিয়ামের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা গণভোটের ৭০ শতাংশ রায় উপেক্ষিত, নতুন ফ্যাসিবাদ নিয়ে বিএনপিকে জামায়াতের তোপ ১ মে পল্টনে শ্রমিক দলের সমাবেশ, নির্বাচন নিয়ে জামায়াতকে ফখরুলের তোপ বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিত, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের নতুন কড়াকড়ি রাজধানীর ৮০ পাম্পে ১২ লাখ বাইকের জটলা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে? “ফিলিস্তিন, লেবানন ও ইরানে ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধ, যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য নিয়ে ধোঁয়াশা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের জোর প্রস্তুতি জামায়াতের ‘লাফিং গ্যাস’: যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রে এটি মারাত্মক আসক্তির কারণ হয়ে উঠেছে

আলোকিত মানুষ নাকি সিআইএ’র গোপন এজেন্ডা: বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র নিয়ে বিতর্কের নেপথ্যে কী?

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬

‘বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র’—নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বইয়ের মলাট, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি আর ‘আলোকিত মানুষ চাই’ স্লোগানের এক রোমান্টিক চিত্র। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেশের লাখো তরুণ-তরুণীর বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার কারিগর এই প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে এই প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে এমন কিছু প্রশ্ন উঠেছে, যা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। প্রশ্নগুলো খুব সোজা নয়, বরং বেশ তীক্ষ্ণ: বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র কি সত্যিই ‘আলোকিত মানুষ’ গড়ার কোনো নিরীহ আয়োজন, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-এর কোনো সুদূরপ্রসারী গোপন এজেন্ডা?

বিতর্কের শুরুটা বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার দশক আগে।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস: একটি মধ্যাহ্নভোজ ও সিআইএ সংযোগের গুঞ্জন

১৯৭৮ সালের ১৭ই ডিসেম্বর। মাত্র ১৫ জন সদস্য নিয়ে একটি ক্ষুদ্র পাঠচক্র হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল আজকের বিশাল বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র। কিন্তু এই যাত্রার পেছনের গল্পটি কি ততটাই মহান, যতটা আমরা কল্পনা করি?

লেখক রুদ্র সাইফুল সম্প্রতি একটি বিস্ফোরক দাবি সামনে এনেছেন। তাঁর মতে, ১৯৭৮ সালের জুন মাসে ঢাকা কলেজের তৎকালীন শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে একটি লাঞ্চ মিটিং (মধ্যাহ্নভোজ) করেছিলেন সিঙ্গার বাংলাদেশের তৎকালীন উপ-মহাব্যবস্থাপক মুজিবুল হক দুলু। অভিযোগ রয়েছে, সেই লাঞ্চ মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের এক কর্মকর্তা এবং তৎকালীন সিআইএ-এর ঢাকা স্টেশন চিফ ‘ফিলিপ চেরি’। এই ফিলিপ চেরি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিতর্কিত নাম, যাকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রশ্ন হলো, সিআইএ কেন এমন একটি পাঠচক্র তৈরিতে আগ্রহী হবে? সমালোচকদের মতে, স্নায়ুযুদ্ধের (Cold War) সেই উত্তাল সময়ে তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজে রাশিয়া (সোভিয়েত ইউনিয়ন) ও ভারতের প্রভাব বলয় খর্ব করা এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি মার্কিনপন্থি, অরাজনৈতিক ও সফট-কোর বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী তৈরি করা। যদিও চার দশক আগের এই গোপন আঁতাতের কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ পাওয়া কঠিন, কিন্তু বর্তমানের অনেক ঘটনার সাথে এই তত্ত্বের অদ্ভুত মিল থাকায় বিতর্কটি কেবল প্রতিষ্ঠাকালীন ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ নেই।

অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতা: সরকারের টাকা নাকি বিদেশি অনুদান?

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রকে ঘিরে দ্বিতীয় বড় বিতর্কের জায়গাটি হলো এর অর্থায়ন। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সম্প্রতি এ নিয়ে সরব হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র প্রতি বছর সরকারের কাছ থেকে ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার বিশাল অনুদান পায়। কিন্তু এই বিপুল অর্থের সিংহভাগই ব্যয় হয় কনসালটেন্সি, ভবন নির্মাণ ও প্রশাসনিক কাজে। প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এর সুফল খুব একটা পৌঁছায় না। তাঁর মতে, এই বিশাল অর্থ যদি দেশের প্রতিটি জেলার সরকারি বা স্থানীয় পাঠাগারগুলোতে দেওয়া হতো, তবে তা অনেক বেশি কার্যকর হতো।

অবশ্য এই অভিযোগের কড়া জবাব দিয়েছেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও বিতার্কিক ডা. আবদুন নূর তুষার। তিনি নওফেলের সমালোচনার জবাবে মনে করিয়ে দেন যে, খোদ নওফেলের প্রয়াত পিতা এবং চট্টগ্রামের প্রখ্যাত নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী নিজেই চট্টগ্রামে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচিতে ব্যাপক সহযোগিতা করেছিলেন। তুষারের যুক্তি—যে প্রতিষ্ঠানের সাথে সাবেক মন্ত্রীর বাবা নিজেই যুক্ত ছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠান নিয়ে হঠাৎ এত তীক্ষ্ণ সমালোচনা কেন?

কিন্তু অর্থ নিয়ে বিতর্ক এখানেই থামছে না। লেখক ও চিন্তক ইমতিয়াজ মাহমুদ সামনে এনেছেন বিদেশি অর্থায়নের প্রশ্নটি। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক ও লেখক আনিসুল হক একসময় দাবি করেছিলেন, এই কেন্দ্র মূলত সরকারি অনুদানেই চলে, বিদেশি কোনো ফান্ড তারা নেয় না। কিন্তু ইমতিয়াজ মাহমুদ এবং অন্য সমালোচকরা বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ওয়েবসাইট ঘেঁটেই দেখিয়েছেন যে, সেখানে বেশ কয়েকটি বিদেশি দাতা সংস্থার নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ ও ‘র‍্যামন ম্যাগসাইসাই’ কানেকশন

বিতর্কের সবচেয়ে গভীর জায়গাটি হলো বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের পাঠ্যসূচি বা কারিকুলাম নিয়ে। ২০০৪ সালে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ফিলিপাইনভিত্তিক ‘র‍্যামন ম্যাগসাইসাই’ (Ramon Magsaysay) পুরস্কার লাভ করেন। ইমতিয়াজ মাহমুদ এই ফাউন্ডেশনটিকে ‘রকফেলার ফাউন্ডেশন’-এর (মার্কিন পুঁজিপতি গোষ্ঠী) একটি ছদ্মবেশী অঙ্গসংগঠন বা ‘পোষ্য দালাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

সমালোচকদের দাবি, ম্যাগসাইসাই ফাউন্ডেশন থেকে পুরস্কার ও অর্থ পাওয়ার সাথে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের কাজের ধরনের একটি অদ্ভুত ‘মতলবের মিল’ রয়েছে। অভিযোগটি হলো—এই কেন্দ্র খুব সযত্নে এমন একটি সিলেবাস তৈরি করে, যাতে স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা ভুলেও সমাজতন্ত্র, বিপ্লব, মার্কসবাদ, পুঁজিবাদের শোষণ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের গভীর রাজনৈতিক ইতিহাসের মতো ‘সিরিয়াস’ বিষয়গুলোর দিকে ঝুঁকে না পড়ে। তরুণ মনকে এসব থেকে দূরে রাখতে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সমরেশ মজুমদারের ‘গর্ভধারিণী’র মতো রোমান্টিক বা সফট-বিপ্লবের উপন্যাস। অর্থাৎ, বিপ্লবের স্বপ্নকে রোমান্টিসিজমের মোড়কে আটকে রাখাই কি তাদের মূল লক্ষ্য?

সাংস্কৃতিক মনোপলি এবং মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা

একটি দেশের পাঠাভ্যাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গতিপথ নির্ধারণের অধিকার আসলে কার হাতে থাকা উচিত? অনেকেই মনে করেন, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র দেশে বই পড়ার ক্ষেত্রে একধরনের ‘একচেটিয়া আধিপত্য’ বা মনোপলি (Monopoly) তৈরি করেছে।

এর পাশাপাশি, খোদ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রখ্যাত কবি মোহাম্মদ রফিকের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে একজন সমালোচক লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সায়ীদ সাহেবের ভূমিকা ছিল ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ রাজনীতির পক্ষে।

বর্তমান সরকারের অবস্থান

সাম্প্রতিক সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা এবং ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। অনেকেই মনে করেন, এটি একটি জীবন্ত ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান, যাকে অহেতুক বিতর্কের মুখে ঠেলে দিয়ে ধ্বংস করা ঠিক হবে না।

সবশেষে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছি? বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র কি সত্যিই সিআইএ’র প্রজেক্ট? এই প্রশ্নের সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার মতো কোনো অকাট্য দালিলিক প্রমাণ বা ক্লাসিফায়েড ডকুমেন্ট আমাদের হাতে নেই। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পেছনে সিআইএ কর্মকর্তার উপস্থিতির গুঞ্জন, রকফেলার ও ম্যাগসাইসাই ফাউন্ডেশনের সূত্রে বিদেশি অর্থের জোগান, আর্থিক অস্বচ্ছতার অভিযোগ এবং নির্দিষ্ট ঘরানার পাঠ্যাভ্যাস তৈরির চেষ্টা—সব মিলিয়ে যে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে, তা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।

‘আলোকিত মানুষ গড়ার’ যে স্বপ্ন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র দেখায়, তা দেশের সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানটি যেন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মনোপলি বা বৈশ্বিক পরাশক্তির মগজধোলাইয়ের হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সেটি নিশ্চিত করার সময় এখনই। কারণ, প্রজন্মের মনন গঠনের চেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় একটি জাতির জন্য আর কিছুই হতে পারে না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category