২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে যখন ইউক্রেনের আকাশে প্রথম রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন শোনা গিয়েছিল, তখন খোদ ক্রেমলিনের অনেক নীতিনির্ধারকও হয়তো ভাবেননি এই সংঘাত কত বড় মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিতে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের মে মাসে এসে ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির যে পরিসংখ্যান সামনে আসছে, তা কেবল শিউরে ওঠার মতো নয়, বরং এটি আধুনিক ইতিহাসের এক বীভৎস অধ্যায়। রাশিয়ার স্বাধীন সংবাদমাধ্যম মেদুজা (Meduza) এবং মিডিয়াজোনা (Mediazona)-এর যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ রাশিয়ার প্রায় ৩ লাখ ৫২ হাজার সেনা এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন।
এই বিপুল প্রাণহানি ইউক্রেন যুদ্ধকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মাটিতে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও প্রাণঘাতী সংঘাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রাশিয়ার কঠোর সেন্সরশিপ এবং সরকারি গোপনীয়তার দেয়াল ভেঙে মেদুজা ও মিডিয়াজোনা এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। তারা মূলত রাশিয়ার উত্তরাধিকার সংক্রান্ত রেকর্ড (Probate records), সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত শোকবার্তা এবং কবরস্থানগুলোতে নতুন করে তৈরি হওয়া হাজার হাজার কবরের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সংখ্যায় পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাশিয়ার নিয়মিত বাহিনীর অন্তত ৩ লাখ ৫১ হাজার ৮৯৭ জন সেনা নিহত হয়েছেন। এই বিশাল সংখ্যক মানুষ রাশিয়ার কর্মক্ষম জনশক্তির এক বড় অংশ। তবে এই সংখ্যাটি নিয়ে আরও ভয়াবহ তথ্য হলো—এতে চলতি ২০২৬ সালের নতুন কোনো হতাহতের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অর্থাৎ, যুদ্ধের বর্তমান গতিপ্রকৃতি বিবেচনা করলে এই সংখ্যা এখন সাড়ে তিন লাখ ছাড়িয়ে চার লাখের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
অনুসন্ধানী দলগুলো স্বীকার করেছে যে, ৩.৫ লাখের এই বিশাল অঙ্কটিও হয়তো যুদ্ধের প্রকৃত ভয়াবহতা পুরোপুরি তুলে ধরতে পারছে না। কারণ:
১. অধিকৃত অঞ্চলের মিলিশিয়া: দোনেৎস্ক এবং লুহানস্কের মতো ইউক্রেনের অধিকৃত অঞ্চলগুলো থেকে রাশিয়ার পক্ষে লড়া স্থানীয় মিলিশিয়া সদস্যদের মৃত্যুর পূর্ণ তথ্য রাশিয়ার মূল রেকর্ডগুলোতে অনেক সময় থাকে না।
২. বিদেশি যোদ্ধা ও ওয়াগনার গ্রুপ: উত্তর কোরিয়া, আফ্রিকা বা অন্যান্য দেশ থেকে আসা ভাড়াটে যোদ্ধা এবং সাবেক ওয়াগনার গ্রুপের সদস্যদের মৃত্যুর তথ্য প্রায়শই অগোচরে থেকে যায়।
৩. নিখোঁজ সেনা: বিপুল সংখ্যক রুশ সেনা এখনো ‘নিখোঁজ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত, যাদের একটি বড় অংশ আসলে রণক্ষেত্রে নিহত হয়েছেন কিন্তু তাদের দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
একই সময়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS) যুদ্ধের এক তুলনামূলক চিত্র প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, ২০২৫ সালের শেষ ভাগ পর্যন্ত রাশিয়ার ৩ লাখ ২৫ হাজার এবং ইউক্রেনের ১ লাখ ৪০ হাজার সেনা নিহত হয়ে থাকতে পারে।
রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতি ইউক্রেনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে সামরিক বিশ্লেষকরা রাশিয়ার ‘হিউম্যান ওয়েভ’ বা মানুষের স্রোত ব্যবহার করে হামলার কৌশলকে দায়ী করছেন। কোনো ধরনের যান্ত্রিক কাভার ছাড়াই রাশিয়ার সেনাদের ইউক্রেনের সুরক্ষিত বাংকারগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য করা হয়েছে, যার ফলে রুশ বাহিনীর মধ্যে হতাহতের হার আকাশচুম্বী। তবে ইউক্রেনের জনসংখ্যা রাশিয়ার তুলনায় অনেক কম হওয়ায়, ১ লাখ ৪০ হাজার সেনার মৃত্যু কিয়েভের জন্য রাশিয়ার ৩ লাখের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলছে।
বিপুল পরিমাণ সেনা হারানোর ফলে পুতিন প্রশাসন এখন মারাত্মক জনবল সংকটে ভুগছে। এই ঘাটতি পূরণে মস্কো এখন কিছু অপ্রচলিত ও বিতর্কিত পথ বেছে নিয়েছে:
আফ্রিকান রিক্রুটমেন্ট: রাশিয়ার অভ্যন্তরে বড় ধরনের গণ-মোবিলাইজেশন করলে জনমনে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে, এই ভয়ে ক্রেমলিন এখন আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলো থেকে উচ্চ বেতনে যোদ্ধা নিয়োগ করছে।
শিক্ষার্থীদের ড্রোন ইউনিটে অন্তর্ভুক্তি: যুদ্ধের প্রযুক্তিতে ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে ড্রোনের গুরুত্ব বেড়েছে। রাশিয়া এখন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে সরাসরি ড্রোন ইউনিটে যুক্ত করছে। মেধাবী তরুণদের এভাবে যুদ্ধের ময়দানে পাঠানোর ফলে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ একাডেমিক ও প্রযুক্তি খাত দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইউরোপ গত আট দশকে অনেক ছোট-বড় সংঘাত দেখেছে (যেমন যুগোস্লাভিয়া যুদ্ধ), কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের মতো এত বিপুল সামরিক প্রাণহানি আর কোনোটিতে হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ এখন কেবল ভূমি দখলের লড়াই নয়, বরং এটি একটি ‘অ্যাট্রিশন ওয়ার’ বা ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে পরিণত হয়েছে—যেখানে দেখা হচ্ছে কে কার কত বেশি রক্ত ঝরাতে পারে।
রাশিয়ার ৩.৫ লাখ মানুষের এই মৃত্যু কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি ৩.৫ লাখ পরিবারের গল্প। রাশিয়ার অনেক প্রত্যন্ত গ্রাম এখন পুরুষশূন্য হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি তাদের সেরা প্রজন্মের তরুণরাও কবরে চলে যাচ্ছে।
২০২৬ সালের এই মধ্যভাগে এসেও যুদ্ধের ময়দান থেকে শান্তির কোনো ইঙ্গিত মিলছে না। বরং রাশিয়ার অব্যাহত রিক্রুটমেন্ট এবং পশ্চিমাদের দেওয়া অত্যাধুনিক অস্ত্রের প্রভাবে ২০২৬ সালেও প্রাণহানির এই রেকর্ড ভাঙতে পারে বলে শঙ্কা করা হচ্ছে। ৩.৫ লাখ লাশের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই যুদ্ধ আধুনিক সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে—মানবিক মর্যাদার চেয়ে কি ভৌগোলিক দম্ভ বড়?
ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়। এই রক্তক্ষরণ বন্ধ না হলে আগামী প্রজন্মের জন্য এক জনশূন্য এবং আতঙ্কিত মহাদেশ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
সূত্র: মেদুজা, মিডিয়াজোনা এবং সিএসআইএস (CSIS)।