• বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ০৪:৫১ অপরাহ্ন
Headline
‘দ্য রিং’ খ্যাত মার্কিন অভিনেত্রী ডেভেই চেজ আর নেই অতীত সাগরে ডুবসাঁতার- হাতে তিনটি স্বর্ণপদ্ম আধুনিক যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর উন্নয়ন পরিকল্পনা চলছে: সেনাপ্রধান আদালতের সমন উপেক্ষা: সময় টিভির সাবেক এমডি আহমেদ জোবায়ের কারাগারে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভারসাম্য রক্ষার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর সাগর-রুনি হত্যা মামলা: তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ পেছাল ১২৭ বার ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোকসানে দেশের ব্যাংক খাত পুশইনে বিএসএফের নতুন কৌশল ও রুট পঞ্চগড়ে সেনানিবাস স্থাপনের দাবি তুললেন সারজিস আলম মাতারবাড়ী সংযোগ সড়ক প্রকল্পে সাড়ে৪শ কোটি টাকার হরিলুট

ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোকসানে দেশের ব্যাংক খাত

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক / ৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বিগত কয়েক দশক ধরে নানা জালিয়াতি ও অব্যবস্থাপনা আড়ালে রাখা হলেও, আর্থিক খাতের সংস্কার উদ্যোগের ফলে অবশেষে বের হয়ে এসেছে প্রকৃত কঙ্কালসার চিত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত ‘ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ এবং মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুরো ব্যাংক খাত সামগ্রিকভাবে এক বিশাল লোকসানি খাতে পরিণত হয়েছে। বিগত ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে দেশের ব্যাংকিং খাতের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। মূলত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বিপুল অর্থ লুটপাট, বেনামি ঋণ জালিয়াতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষক দ্বারা সম্পদের গুণগত মান যাচাইয়ের (AQR) ফলে ব্যাংকগুলোর এই প্রকৃত ক্ষত জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়েছে। গুটিকয়েক বহুজাতিক ও বেসরকারি ব্যাংক রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করলেও, ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে থাকা ব্যাংকগুলোর আকাশচুম্বী লোকসানের পাহাড়ের নিচে চাপা পড়েছে পুরো খাতের সামগ্রিক পারফরম্যান্স।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২২ সালে দেশের ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা ছিল ১৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালে সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকায়। এমনকি ২০২৪ সালেও খাতের নিট মুনাফা ছিল ১২ hide_info হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। তবে ২০২৫ সালে এসে পুরো খাত এক ধাক্কায় প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার নিট লোকসানের অতল গহ্বরে পতিত হয়। এর আগে ২০০৪ সালে ৭৭৬ কোটি এবং ২০০৬ সালে ২ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা লোকসান করেছিল ব্যাংক খাত। পরবর্তীতে ২০১২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের বহুল আলোচিত হল-মার্ক কেলেঙ্কারির ধাক্কায় পুরো খাত ১ হাজার ৯৫ কোটি টাকা লোকসান গোনে। তবে অতীতের সব রেকর্ডকে বহুগুণ ছাড়িয়ে ২০২৫ সালের এই সোয়া এক লাখ কোটি টাকারও বেশি লোকসান দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক চরম বিপর্যয়কর বার্তা দিচ্ছে।

লুটপাটের শিকার ১০ ব্যাংকের দেড় লাখ কোটি টাকা হাওয়া

জাতীয় বাজেটের সাথে সরকার প্রকাশিত ‘ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও তথ্যাবলি’ বই এবং ব্যাংকগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশের শীর্ষ লোকসানি ১০টি ব্যাংক মিলেই গত বছর ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৩২ কোটি টাকার লোকসান করেছে। তবে ভালো ব্যাংকগুলোর ইতিবাচক আয়ের কারণে সামগ্রিক নিট লোকসান ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে। লোকসানের এই তালিকায় এককভাবে শীর্ষে রয়েছে বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের লুণ্ঠনের শিকার ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। বিদায়ী বছরে ব্যাংকটি রেকর্ড ৬৬ twist_info হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা নিট লোকসান দেখিয়েছে। লোকসানের দ্বিতীয় স্থানে থাকা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লোকসান করেছে ৩১ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া এক্সিম ব্যাংক ২৮ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা এবং ইউনিয়ন ব্যাংক ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। মূলত একীভূত হতে যাওয়া এই শীর্ষ পাঁচ ব্যাংকের চরম আর্থিক ধস পুরো খাতকে টেনে নিচে নামিয়েছে। এর বাইরে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক ৩ হাজার ৮২০ কোটি, এবি ব্যাংক ৩ হাজার ৭০৬ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংক ২ হাজার ৫৬১ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ২ হাজার ৪৩০ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৯৯৩ কোটি এবং পদ্মা ব্যাংক ৯৩০ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে।

চরম সংকটেও ভালো ব্যাংকগুলোর রেকর্ড মুনাফা

পুরো খাতের এই কঙ্কালসার অবস্থার মধ্যেও গুটিকয়েক সুশাসিত দেশি ও বহুজাতিক ব্যাংক ব্যবসায়িক সততা বজায় রেখে রেকর্ড মুনাফা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। গত বছর শেষে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি নিট মুনাফা করে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে বহুল পরিচিত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (এসসিবি)। ব্যাংকটি ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা ঘরে তুলেছে। অন্যদিকে দেশীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে এককভাবে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটি গত বছর রেকর্ড ১ হাজার ৫৮১ কোটি টাকার নিট মুনাফা অর্জন করেছে (বার্ষিক প্রতিবেদনে কর-পরবর্তী সামগ্রিক আয় ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা)। এছাড়া দ্য সিটি ব্যাংক ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংক ৯১০ কোটি টাকা এবং প্রাইম ব্যাংক ৮৯০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। মূলত এই ব্যাংকগুলোর দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং উচ্চ সুদবহির্ভূত আয়ের কারণে পুরো খাতের লোকসানের খতিয়ানটি আরও বড় হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

আয়হীন দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ ও মূলধন ঘাটতির মরণকামড়

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশই এখন ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ বা ডিস্ট্রেসড ঋণে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যে ঋণ বিনিয়োগ করেছে, তার প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৬০ টাকা থেকেই এখন কোনো নিয়মিত আয় বা কিস্তি আসছে না। গত বছর শেষে এই দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ আগের বছরের ৭ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা থেকে এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায়। এর মধ্যে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকাই হলো বিশেষ সুবিধায় পুনঃতফসিল করা ঋণ, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। বাকি অংশটি প্রথাগত খেলাপি, অবলোপন ও আদালতের আদেশে স্থগিত থাকা ঋণ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠলেও বছরের শেষ তিন মাসে রেকর্ড ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করার মাধ্যমে তা কাগজ-কলমে কিছুটা কমানো হয়।

খেলাপি ও দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের এই নিয়ন্ত্রণহীন উল্লম্ফনের ফলে দেশের ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মূলধন ভিত্তি প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। আন্তর্জাতিক ব্যাসেল-৩ নীতি অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর যেখানে মোট ঝুঁকিভিত্তিক ঋণের সাড় ১২ শতাংশ মূলধন (CAR) সংরক্ষণ করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেখানে ২০২৫ বছর শেষে তা ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে গেছে, যা আগের বছরও ইতিবাচক ৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ ছিল। মূলত দেশের দুর্বল ২০টি ব্যাংকের যৌথভাবে ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল মূলধন ঘাটতি তৈরি হওয়ার কারণেই পুরো খাতের এই বিপর্যয়কর দশা তৈরি হয়েছে।

লভ্যাংশে কঠোরতা ও পরিস্থিতি উত্তরণের সরকারি প্যাকেজ

ব্যাংক খাতের এই চরম আর্থিক রক্তক্ষরণ ও দুর্বল ভিত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণার নিয়ম অত্যন্ত কঠোর করেছে। নতুন নীতিমালার কারণে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে ২০২৫ সালে মাত্র ১৬টি ব্যাংক তাদের শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পেরেছে। নিয়মানুযায়ী, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের ওপরে অথবা যাদের মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে, তারা কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। আগামী ২০২৬ সালের জন্য এই শর্ত আরও কঠোর করে বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার কম হলে তারা কোনো নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “আগের সরকারের আমলে কৃত্রিম উপায়ে ঋণ নিয়মিত দেখিয়ে ব্যাংকের প্রকৃত ক্ষত লুকিয়ে রাখা হতো। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সুশাসন ফেরাতে প্রকৃত চিত্র সামনে এনেছে। এই অবস্থা কাটাতে ও অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে। বন্ধ কলকারখানা সচল ও উৎপাদনশীল খাতে এই ঋণ বিতরণ শুরু হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ঋণ আদায় বাড়বে এবং দ্রুত ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”

(তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ও জাতীয় দৈনিক)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category