মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দাবার চাল সব সময়ই জটিল, তবে এবার যা সামনে এলো তা রীতিমতো চক্ষু চড়কগাছ করার মতো। ইরাকের ধূসর ও জনমানবহীন মরুপ্রান্তরের গভীরে ইসরায়েল একটি গোপন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (WSJ)। গত শনিবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই গোপন ঘাঁটিটি মূলত ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা ও বিশেষ অভিযান পরিচালনার একটি ‘লজিস্টিক হাব’ বা রসদ সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের সীমানার ভেতরে এভাবে শত্রু রাষ্ট্রের গোপন অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই গোপন ঘাঁটিটি রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একটি বড় ধরনের যৌথ সামরিক অভিযানের ঠিক আগে অত্যন্ত গোপনে এই ঘাঁটিটি নির্মাণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার—ইরানের ভেতরে হামলা চালিয়ে ফিরে আসার সময় ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর জন্য একটি নিরাপদ ট্রানজিট পয়েন্ট তৈরি করা।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল দাবি করেছে, এই ঘাঁটির অবস্থান এবং এর কার্যক্রম সম্পর্কে হোয়াইট হাউস তথা ওয়াশিংটন পুরোপুরি অবগত ছিল। অর্থাৎ, ইরাকের মাটিতে ইসরায়েলের এই অবৈধ অনুপ্রবেশের পেছনে মার্কিন প্রশাসনের এক ধরনের নীরব সম্মতি বা ‘সবুজ সংকেত’ ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরাকের এই গোপন ঘাঁটিটি সাধারণ কোনো তাবু বা অস্থায়ী ক্যাম্প ছিল না। এটি ছিল অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন একটি কেন্দ্র। মূলত দুটি প্রধান উদ্দেশ্যে এই ঘাঁটিটি ব্যবহৃত হতো:
লজিস্টিক সাপোর্ট: ইসরায়েলি বিশেষ বাহিনী এবং বিমান বাহিনীর বিমানগুলোকে মাঝপথে জ্বালানি বা জরুরি রসদ সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে এটি কাজ করত।
অনুসন্ধান ও উদ্ধার (Search and Rescue): ইরানি আকাশসীমায় কোনো ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলে বা কোনো পাইলট বিপদে পড়লে, তাদের দ্রুত উদ্ধারের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দল এই ঘাঁটিতে সার্বক্ষণিক মোতায়েন ছিল। যাতে ইরানি বাহিনী তাদের হাতে পাওয়ার আগেই ইসরায়েল তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যেতে পারে।
একটি নিখুঁত গোপন অপারেশন কীভাবে ফাঁস হতে পারে, তার এক নাটকীয় উদাহরণ এই ঘটনা। মার্চের শুরুতে ওই মরু অঞ্চলের এক স্থানীয় মেষপালক মরুভূমির গভীরে নিয়মিতভাবে অদ্ভুত ও শব্দহীন হেলিকপ্টারের আনাগোনা লক্ষ্য করেন। জনমানবহীন ওই এলাকায় আকাশপথে এমন তৎপরতা দেখে তার মনে সন্দেহ জাগে এবং তিনি স্থানীয় ইরাকি কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান।
তথ্যটি পাওয়ার পর ইরাকি সেনাবাহিনী বিষয়টি তদন্ত করতে সেখানে একটি দল পাঠায়। কিন্তু তারা ঘাঁটির কাছাকাছি পৌঁছামাত্রই আকাশ থেকে ইসরায়েলি ড্রোন বা যুদ্ধবিমান তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। জীবন বাঁচাতে ইরাকি সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। মজার ব্যাপার হলো, সেই সময় ইসরায়েলি বাহিনী এই হামলা চালিয়েছিল অত্যন্ত চতুরতার সাথে, যাতে তাদের পরিচয় প্রকাশ না পায়। এর ফলে তখন ইরাকি সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আসার আগেই চাপা পড়ে যায়।
মার্চের শেষের দিকে ইরাক সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করে। সেখানে বলা হয়েছিল, ইরাকের সার্বভৌম ভূখণ্ডে একটি বিদেশি বাহিনী অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করেছে এবং সরকারি সেনাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। সেই সময় ইরাক এই হামলার জন্য সরাসরি মার্কিন বাহিনীকে দায়ী করেছিল। কারণ, ইরাকের আকাশসীমা মূলত মার্কিন রাডার ও বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকে।
তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এখন সেই রহস্যের পর্দা ফাঁস করে দিয়েছে। এই হামলার সাথে সংশ্লিষ্ট এক সূত্রের বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে যে, ইরাকি সেনাদের ওপর সেই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না। এটি ছিল সম্পূর্ণভাবে একটি ইসরায়েলি অপারেশন। যুক্তরাষ্ট্র কেবল বিষয়টি জানত এবং আড়ালে থেকে নজর রাখছিল। এটি এখন স্পষ্ট যে, ইসরায়েল ইরাকের মাটি ব্যবহার করে ইরানের ডেরায় আঘাত হানার ছক কষেছিল।
ইসরায়েলের জন্য ইরাকের মরুভূমিকে বেছে নেওয়ার পেছনে কৌশলগত কারণ রয়েছে। ইরান ও ইসরায়েলের মাঝখানে ইরাকের অবস্থান। সরাসরি ইসরায়েল থেকে ইরানে হামলা চালিয়ে ফিরে আসা জ্বালানির দিক থেকে বেশ ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমিকে তারা একটি ‘পিট স্টপ’ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে এর সম্ভাব্য প্রভাব:
১. ইরাক-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অবনতি: ইরাকি সরকার যদি নিশ্চিত হয় যে তাদের অনুমতি ছাড়া মার্কিন সহায়তায় ইসরায়েল এখানে ঘাঁটি গেড়েছিল, তবে দেশটিতে থাকা মার্কিন সেনাদের বিদায় করার দাবি আরও জোরালো হবে।
২. ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ: ইরান কখনোই তাদের দোরগোড়ায় ইসরায়েলের এমন উপস্থিতি মেনে নেবে না। ফলে ইরাকের ভেতরে ইরানি সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ইসরায়েলি বা মার্কিন স্বার্থে বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা রয়েছে।
৩. আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন: ইরাক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও তার ভূমি অন্য দুটি দেশের যুদ্ধের ময়দান হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই প্রতিবেদন যদি পুরোপুরি সত্য হয়, তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে নতুন একটি মাত্রা যোগ করবে। ইসরায়েল যে কেবল তাদের আকাশসীমা রক্ষায় ব্যস্ত নয়, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে তোয়াক্কা না করে ইরানের গভীরে আঘাত হানতে যেকোনো দূরত্বের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত—তা এই গোপন ঘাঁটি স্থাপনের মাধ্যমেই প্রমাণিত। তবে মরুভূমির বালিতে ইসরায়েল যে গোপন দুর্গ গড়েছিল, একজন সাধারণ মেষপালকের তীক্ষ্ণ চোখ এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে আজ তা বিশ্বের সামনে প্রকাশিত।
এখন দেখার বিষয়, বাগদাদ এবং তেহরান এই তথ্যের ভিত্তিতে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে কি আবারও কোনো বড় সংঘাতের কালো মেঘ জমছে?
তথ্যসূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, প্রেস টিভি।