• শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৪ অপরাহ্ন
Headline
সাবেক সেনা কর্মকর্তা গুলশান আরা ও দেবাশীষ রিমান্ড শেষে কারাগারে টেলবোন ব্যথার লক্ষণসমূহ মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক সুরক্ষায় কনস্যুলার সেবার পরিধি বাড়ানো হচ্ছে: হুমায়ুন কবির প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে ফল প্রকাশ পর্যন্ত নিয়োগ পরীক্ষা তদারকি করবেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ নার্স রীপা গোমেজের খোঁজ নিলেন প্রধানমন্ত্রী বিএনপি সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকারে বিশ্বাসী: মীর শাহে আলম সব ষড়যন্ত্র প্রতিহতে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে : টুকু রেশমের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে: ভূমিমন্ত্রী মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে পেছনে ফেলল বাংলাদেশ ডেঙ্গুতে আরও ৪ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১,১৮১

ইরানের পর মিয়ানমার: যুদ্ধের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ!

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী মিয়ানমার এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধের কোনো বিচ্ছিন্ন রণক্ষেত্র নয়| এটি ক্রমশ চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মতো পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থ আদায়ের এক ভয়ংকর ভূ-রাজনৈতিক দাবা খেলায় পরিণত হয়েছে| এই জটিল সমীকরণে বাংলাদেশের অবস্থানটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে| বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি, চট্টগ্রাম বন্দর এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপের কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনার পাশাপাশি ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাখাইনের জন্য প্রস্তাবিত ‘মানবিক করিডোর’-এর পেছনের কারণগুলো এখন নতুন করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে| অনেকেই মনে করছেন, মিয়ানমারের রাখাইনে সক্রিয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মিকে কৌশলগত সমর্থন দিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই করিডোর বা বন্দর ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে| কিন্তু প্রশ্ন হলো, মিয়ানমারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এত গভীর আগ্রহের আসল কারণ কী?

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো মিয়ানমারে একটি ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তন করা| বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়ে একটি অনড় ও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে| এর প্রধান হাতিয়ার হিসেবে সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে বিপুল ভোটে পাস হয়েছে ‘ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট’| এটি মূলত ২০২২ সালের মূল বার্মা অ্যাক্টের একটি সংশোধিত ও অধিকতর কঠোর রূপ| নতুন এই আইনে জান্তা সরকারের রাজস্বের প্রধান উৎসগুলোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে| বিশেষ করে মিয়ানমার অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এন্টারপ্রাইজ এবং দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ সুগম করা হয়েছে, যার ফলে জান্তার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও আর্থিক লেনদেনের সক্ষমতা পঙ্গু হয়ে যেতে পারে| এর পাশাপাশি মিয়ানমারে বিমান জ্বালানি বা জেট ফুয়েল সরবরাহকারী বিদেশি কোম্পানিগুলোর ওপরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার খড়গ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে| স্থলযুদ্ধে বিদ্রোহীদের কাছে প্রতিনিয়ত মার খাওয়া জান্তা বাহিনী এখন টিকে আছে মূলত তাদের বিমান হামলার শক্তির ওপর নির্ভর করে| জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে সেই বিমান বাহিনীর ডানা ছেঁটে দেওয়াই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য|

তবে ‘ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট’-এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো, এটি মিয়ানমারের নির্বাসিত ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’ এবং রাখাইনের ‘আরাকান আর্মি’র মতো সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে অমারাত্মক সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা দেওয়ার একটি বৈধ আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে| একই সঙ্গে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে| অর্থাৎ, সামরিক জান্তার পতন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সর্বাত্মক চাপ প্রয়োগ করে যাবে|

কিন্তু পৃথিবীর আরেক প্রান্তে অবস্থিত মিয়ানমারকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এত তাড়াহুড়োর কারণটি মূলত চীন-কেন্দ্রিক| চীনের জ্বালানি ও বাণিজ্য পরিবহনের প্রধান রুট হলো মালাক্কা প্রণালী, যেখানে সিঙ্গাপুরে মার্কিন নৌঘাঁটি থাকায় চীনের একটি বড় কৌশলগত দুর্বলতা রয়েছে| এই ঝুঁকি এড়াতে চীন বিকল্প হিসেবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণ করেছে| এই বন্দর থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত সরাসরি পাইপলাইন ও সড়ক যোগাযোগ তৈরি করা হয়েছে, যা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ| কিয়াউকফিউ বন্দরের ফলে চীনের জ্বালানি সরবরাহের দূরত্ব যেমন কয়েক হাজার কিলোমিটার কমেছে, তেমনি তারা মার্কিন রণতরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে সরাসরি প্রবেশাধিকার পেয়েছে| যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ‘কোয়াড’ ভুক্ত দেশগুলোর আশঙ্কা, এই বন্দরটি পুরোপুরি কার্যকর হলে ভারত মহাসাগরে চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে| ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির মূল লক্ষ্য হলো, মিয়ানমারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে বা সামরিক জান্তাকে হটিয়ে এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা, যারা চীনের এই কৌশলগত করিডোর প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করবে| এই কারণেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র আরাকান আর্মি বা জান্তাবিরোধী অন্যান্য গোষ্ঠীকে সহায়তা করছে বলে মনে করা হচ্ছে|

মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধে বর্তমানে সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তনটি ঘটেছে রাখাইন রাজ্যে| সেখানকার ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টিতেই এখন আরাকান আর্মির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা রাখাইনের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৮৫ শতাংশ| জান্তা বাহিনীর হাতে এখন কেবল সিতওয়ে এবং কিয়াউকফিউয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ অবশিষ্ট আছে| আরাকান আর্মি রাখাইনে নিজেদের একটি স্বাধীন প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, যেখানে স্থানীয় জনগণের বিপুল সমর্থন রয়েছে| তবে যুক্তরাষ্ট্র যে আরাকান আর্মিকে নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়ে চীনের প্রভাব ক্ষুণ্ন করতে পারবে, ব্যাপারটি ততটা সহজ নয়| কারণ চীন অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ‘দ্বৈত নীতি’ অনুসরণ করছে| একদিকে তারা সামরিক জান্তাকে সমর্থন দিচ্ছে, অন্যদিকে রাখাইনে তাদের বিপুল বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরোক্ষভাবে আরাকান আর্মির সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখছে| চীন নিশ্চিত করতে চায় যে ক্ষমতায় যেই থাকুক না কেন, তাদের কিয়াউকফিউ বন্দর ও করিডোর যেন নিরাপদ থাকে|

এই পরিস্থিতি ভারতের জন্যও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে| ভারত তাদের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলোর যোগাযোগ সহজ করতে মিয়ানমারের সিতওয়ে বন্দরকে কেন্দ্র করে ‘কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’ হাতে নিয়েছে| কিন্তু আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান উত্থান ও নিয়ন্ত্রণ ভারতের এই মেগা প্রকল্পের জন্য সরাসরি হুমকি তৈরি করেছে| ফলে ভারতও এই অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় তৎপর রয়েছে|

অন্যদিকে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকায় আরাকান আর্মিকে সরাসরি সমর্থন দেওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ| মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আরাকান আর্মি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিলেও, ভবিষ্যতে যদি তারা চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপন করে, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আফগানিস্তানের ‘তালেবান’ পরিস্থিতির মতো একটি বড় বুমেরাং হতে পারে| ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতেও এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায়| ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে চীনের আধিপত্য ভাঙতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু জান্তা সরকার যখন উল্টো চীন ও রাশিয়ার দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়ে, তখন বাধ্য হয়ে ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়ে ‘ব্রেভ বার্মা অ্যাক্ট’ পাস করে|

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, মিয়ানমারে কি আসলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে সরকার পরিবর্তন হবে? পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র জান্তা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে| তারা সরাসরি সামরিক অভিযান চালাবে নাকি প্রক্সি গোষ্ঠীর মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়| তবে এখানে একটি বড় সমস্যা হলো, যুক্তরাষ্ট্র যাদের সমর্থন দিচ্ছে—সেই ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’ এবং ‘আরাকান আর্মি’র মধ্যে আদর্শিক ও রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে| তাদের অস্ত্র দিয়ে শক্তিশালী করা হলে ভবিষ্যতে তারা জান্তার বদলে নিজেদের মধ্যেই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে| সবচেয়ে বড় কথা হলো, চীন কোনোভাবেই কিয়াউকফিউ বন্দর ও করিডোরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাবে না| এটি চীনের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত| তাই যুক্তরাষ্ট্র যদি মিয়ানমারে সরাসরি বা প্রক্সি যুদ্ধ শুরু করে, তবে চীনও সেখানে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে|

এই বৃহৎ শক্তিগুলোর ছায়াযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া মিয়ানমার এখন আর কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়| আর এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়বে মিয়ানমারের ঠিক পাশেই অবস্থিত বাংলাদেশের ওপর| সিতওয়ে এবং কিয়াউকফিউ—উভয় বন্দরই বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ১০০ মাইলের মধ্যে অবস্থিত| ইতিমধ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে ছোঁড়া গুলি বা গোলা বাংলাদেশ সীমান্তে এসে পড়ছে, স্থানীয় নাগরিকরা হতাহত হচ্ছেন| তাছাড়া আরাকান স্যালভেশন আর্মির মতো রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর তৎপরতাও বাংলাদেশ থেকে নিয়ন্ত্রিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে| ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে বাংলাদেশ যদি কোনো পক্ষ নিতে বাধ্য হয় বা করিডোর ব্যবহারের মতো কোনো সামরিক সুবিধা দেয়, তবে তা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম আত্মঘাতী হতে পারে| আবার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখলেও যুদ্ধের আঁচ থেকে বাংলাদেশের পুরোপুরি মুক্ত থাকার কোনো নিশ্চয়তা নেই| তাই মিয়ানমারের এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক পটভূমিতে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশকে এখনই অত্যন্ত সতর্ক, দূরদর্শী এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে, নতুবা এই যুদ্ধের দাবানল যেকোনো সময় বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করতে পারে|

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category