ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির খসড়া বা সমঝোতা স্মারক (MoU) দেখার জন্য ওয়াশিংটনের কাছে কূটনৈতিক অনুরোধ জানিয়েছিল তেল আবিব। তবে ইসরাইলের সেই স্পর্শকাতর অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে মার্কিন প্রশাসন। এর ফলে আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে সই হতে যাওয়া এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু ও বিবরণ সম্পর্কে ইসরাইল এখনো সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছে। ইসরাইলি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইসরাইলের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ‘চ্যানেল ১২’ এবং ‘আই২৪ নিউজ’ (i24 News)-এর বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ১৫ সপ্তাহের যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটিয়ে যে সমঝোতা স্মারকটি চূড়ান্ত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন ইসরাইলি কর্মকর্তারা। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইসরাইলকে সেই নথির খসড়া দেখাতে স্পষ্ট ভাষায় অস্বীকৃতি জানায়।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন (CNN) জানিয়েছে, ওয়াশিংটন কর্তৃক ইসরাইলকে এই নথি না দেখানোর পেছনে একটি বড় কৌশলগত কারণ রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন আশঙ্কা করছে যে, চুক্তির চূড়ান্ত স্বাক্ষরের আগেই যদি এর বিস্তারিত বিবরণ ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর হাতে পৌঁছায়, তবে তিনি রাজনৈতিক স্বার্থে বা চুক্তিটি ভণ্ডুল করতে এর স্পর্শকাতর তথ্যগুলো আগেই গণমাধ্যমে ফাঁস (Leak) করে দিতে পারেন। এই অবিশ্বাসের কারণেই মূলত মার্কিন মিত্র হওয়া সত্ত্বেও ইসরাইলকে এই শান্তি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে।
অবশ্য ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এই গোপনীয়তার বিষয়টি কিছুটা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ইসরাইলি গণমাধ্যমের এই প্রতিবেদনকে ‘ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ’ বলে দাবি করেছেন। তিনি জানান, পুরো কূটনৈতিক আলোচনা প্রক্রিয়াজুড়ে ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে ওয়াশিংটন ‘ঘনিষ্ঠ সমন্বয়’ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্য একটি সূত্র আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা আনাদোলুকে বলেছে, তেল আবিব মার্কিন আলোচকদের কাছে অফিশিয়ালি এ ধরনের কোনো অনুরোধই জানায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে ইতিমধ্যেই ইসরাইলি নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। গত সোমবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চুক্তিটি নিয়ে তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, “আমরা এখনো জানি না এই চুক্তির চূড়ান্ত রূপ কী হতে যাচ্ছে। তাছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে আমাদের সব বিষয়ে মতের মিল নাও হতে পারে। এই চুক্তিটি সম্পূর্ণ ট্রাম্পের নিজস্ব সিদ্ধান্ত এবং তিনি তা নিয়েছেন; তবে আমাদের (ইসরাইলের) নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রয়েছে।” ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (IDF) একটি সূত্র ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, এই চুক্তির কোনো শর্ত মানতে ইসরাইল আইনি বা সামরিকভাবে বাধ্য নয়।
যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান—কোনো পক্ষই এখনো পর্যন্ত এই সমঝোতা স্মারকের আনুষ্ঠানিক কোনো বিবরণ বা ক্লজ প্রকাশ করেনি। তবে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ‘মেহর নিউজ’-এর ফাঁস করা তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তিতে মোট ১৪টি প্রধান ধারা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ধারাগুলো হলো—
দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী (IDF) সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা।
গত দুই মাস ধরে ইরানের ওপর জারি থাকা মার্কিন নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের বিধিনিষেধ শিথিল করা।
ইরানের ওপর থেকে ধাপে ধাপে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে জব্দ থাকা প্রায় ২৪ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা।
মার্কিন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরান পুনর্গঠনের একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা।
বর্তমানে ফ্রান্সের জি-৭ (G7) সম্মেলনে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি নিজে এই নথির ‘প্রতিটি শব্দ’ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করছেন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তিনি একটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমের সামনে এই ঐতিহাসিক চুক্তির প্রতিটি শব্দ পড়ে শোনাবেন, যাতে বিশ্ববাসী এর প্রকৃত ও সঠিক তথ্য জানতে পারে। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় চূড়ান্ত হওয়া এই খসড়া চুক্তিটি আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক (Bürgenstock) রিসোর্টে দুই দেশের প্রতিনিধিরা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করবেন বলে নিশ্চিত করেছে সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।