• বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৩ অপরাহ্ন
Headline
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে সংবিধানে সুযোগ আছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী মেডিকেল শিক্ষার্থীদের দেশসেবায় আত্মনিয়োগের আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের সাংবাদিকতা পেশা নির্ধারণে যথাযথ কর্তৃপক্ষ থাকা জরুরি : তথ্যমন্ত্রী সোনার খাঁচার দিনগুলো বন্দি করার উপায় এবং একটি ঝাপসা ছবির গল্প ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি জনভোগান্তির মূল কারণ: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না জুলাইয়ের বিচার : হামিদুর রহমান আযাদ আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে যা বললেন সালমান খান দিল্লি পুলিশকে ‘গুন্ডা’ বললেন নাসিরুদ্দিন শাহ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আটক অভিনেত্রী আয়েশা খান

উচ্চশিক্ষার বাহানায় প্রবাসে লাপাত্তা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার নাম করে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে পরবর্তীতে দেশে না ফেরার এক মারাত্মক অনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ ও নির্দিষ্ট মেয়াদে কর্মস্থলে প্রত্যাবর্তনের সুনির্দিষ্ট মুচলেকা বা ‘বন্ড’ স্বাক্ষর করা সত্ত্বেও ছুটির মেয়াদ শেষে কর্মস্থলে যোগ দিচ্ছেন না শত শত শিক্ষক। ঢাকা, প্রবাসের বিভিন্ন উন্নত দেশে স্থায়ী আবাসন গড়ে তুলে বছরের পর বছর ধরে লাপাত্তা হয়ে থাকছেন তারা। বহুবার চিঠি, দাপ্তরিক নোটিশ জারি কিংবা আইনি সতর্কবার্তা পাঠিয়েও তাদের কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। কর্তৃপক্ষের এই ঢিলেঢালা প্রশাসনিক নজরদারি ও অর্থ হিসাব দপ্তরের সমন্বয়হীনতার সুযোগে পলাতক এসব শিক্ষকের কাছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাওনা টাকা এখন শতকোটি ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে, সদ্য সমাপ্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আড়াল করতে কিংবা প্রবাসে স্থায়ী হওয়ার উদ্দেশ্যে নতুন করে আরও অনেক শিক্ষক শিক্ষাছুটির দোহাই দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, যা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপর চরম নীতিগত ও একাডেমিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে এই অনিয়ম ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই এই সংকট ঘনীভূত রূপ নিয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাছুটিতে যাওয়া শিক্ষকদের মধ্যে অন্তত ২৮ জন নির্ধারিত মেয়াদ পার হওয়ার পরও কর্মস্থলে ফেরেননি, যাদের কাছে প্রতিষ্ঠানের পাওনা ৯ কোটি টাকারও বেশি। একইভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত এক দশকে অন্তত ২৪ জন শিক্ষক বিদেশে গিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন, যাদের কাছে পাওনা বকেয়া ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার উপর। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা আরও নাজুক; চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) ছুটি শেষে ৬৮ জন শিক্ষকের না ফেরার তথ্য পাওয়া গেছে, যার ফলে বাধ্য হয়ে ৪৪ জনকে চাকরিচ্যুত করেছে কর্তৃপক্ষ। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও বিদেশে অবস্থানরত শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রতিটিতে গড়ে চার থেকে সাড়ে ছয় কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় অর্থ বকেয়া পড়ে রয়েছে।

আইনগত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রি বা গবেষণার জন্য যাত্রা করার আগে নির্দিষ্ট মেয়াদে শিক্ষাছুটি পান। এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় তাকে নিয়মিত মূল বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সামাজিক সুবিধা প্রদান অব্যাহত রাখে। বিনিময়ে ছুটি শেষে অর্জিত জ্ঞান নিয়ে নিজ প্রতিষ্ঠানে ফিরে এসে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করার আইনি অঙ্গীকারনামায় সই করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মাস্টার্স, পিএইচডি কিংবা পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ শেষ করে প্রবাসেই লাভজনক চাকরি বা স্থায়ী বসবাসের সুযোগ তৈরি হলেই তারা দেশের বন্ডের শর্ত বেমালুম ভুলে যান। বহু শিক্ষক স্বেচ্ছা অবসর বা ইস্তফাপত্র পাঠিয়ে কিংবা কোনো যোগাযোগ না রেখে সম্পূর্ণ লাপাত্তা হয়ে যান। অন্যদিকে, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সাতজন পলাতক শিক্ষক নিয়মিত সরকারি বেতন সুবিধা পেয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, যা প্রশাসনিক অদক্ষতার চরম নজির।

শিক্ষকদের এই গণহারে বিদেশে অবস্থান ও না ফেরার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন তীব্র শিক্ষক সংকট তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট অনুমোদিত শিক্ষকের তিন ভাগের এক ভাগই প্রবাসে অবস্থান করছেন। উদাহরণস্বরূপ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি তিনজন শিক্ষকের একজন এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ২১৫ জন শিক্ষকের মধ্যে ৫১ জনই বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষের পাঠদান স্থবির হয়ে পড়ছে, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা গ্রহণে বিলম্ব ঘটছে এবং একাডেমিক গবেষণা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকরা বিদেশে থেকে যাওয়ায় জুনিয়র শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ বাড়ছে এবং বিভাগ পরিচালনায় প্রশাসনিক জট তৈরি হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত একাডেমিক টিউটর বা শিক্ষক না পেয়ে সেশনজটসহ নানা একাডেমিক ভোগান্তির মুখে পড়ছেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং অনিয়ম রুখতে দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কঠোর পদক্ষেপের পথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে। গত কয়েক বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ৬০ জন, হাবিপ্রবি ১৪ জন, গোবিপ্রবি ১৬ জন এবং চুয়েট ৪৪ জন শিক্ষককে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করেছে। এছাড়া একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাওনা অর্থ উদ্ধারে মামলা দায়ের ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল চাকরিচ্যুত করাই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। যেসব শিক্ষক বন্ডের শর্ত ভেঙে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন, তাদের পাসপোর্ট বাতিল, বিদেশে অবস্থিত দূতাবাসের মাধ্যমে তাদের সাথে যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় পাওনা অর্থ উদ্ধার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি শুরুতেই সমন্বিত ও কঠোর রূপরেখা প্রণয়ন না করে, তবে উচ্চশিক্ষার নামে রাষ্ট্রীয় তহবিলের এই বিপুল অর্থের অপচয় ও আত্মসাৎ চিরতরে বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category