• শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫২ অপরাহ্ন
Headline
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়, অপরাধ বেড়েছে: জামায়াত আমির ৫ আগস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী দেশে অস্ত্রোপচারে শিশু জন্ম আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধির তথ্য তীব্র গ্যাস সংকটে বন্ধের মুখে দেশের শত শত কারখানা ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে ৪২ শতাংশ খেলাপি শিল্পকলায় রুনা লায়লার একক সঙ্গীতানুষ্ঠান বেআইনি রাজসাক্ষী বানানোর তদন্তে চার মাসেও মেলেনি রিপোর্ট যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে সংবিধানে সুযোগ আছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

জনপ্রশাসনে পদোন্নতিতে মেধার বদলে দলীয় পছন্দের অভিযোগ

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

মেধাভিত্তিক, পেশাদার ও নিরপেক্ষ বেসামরিক প্রশাসন গড়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার সত্ত্বেও পদোন্নতির প্রথম ধাতেই গভীর রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে চরম বিতর্কের মুখে পড়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। বিগত ৯ জুলাই গভীর রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৭৯ জন উপসচিবকে পদোন্নতি দিয়ে যুগ্ম সচিব করার প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই পুরো প্রশাসনিক কাঠামো ও কর্মকর্তা মহলে নজিরবিহীন অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। মেধা তালিকা, পেশাগত দক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতা উপক্ষো করে কেবল রাজনৈতিক আনুগত্য ও দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এই পদোন্নতির তালিকা সাজানো হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ ও বঞ্চিত কর্মকর্তারা। বিতর্ক তৈরি হয়েছে এই কারণে যে, নিয়মিত দক্ষ কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে ইতোমধ্যে অবসরে চলে যাওয়া ব্যক্তি, বিগত দিনে গুরুতর প্রশাসনিক অপরাধে বিভাগীয় দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং বিসিএস ব্যাচভিত্তিক মেধা তালিকায় শীর্ষে থাকা যোগ্য কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে জুনিয়রদের ঢালাওভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বেসামরিক আমলাতন্ত্রের কর্মস্পৃহা ও পেশাদারিত্ব বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।

প্রজ্ঞাপিত পদোন্নতির পরিসংখ্যান ও বিসিএস ব্যাচের তুলনামূলক বিশ্লেষণেই এই বৈষম্যের চিত্র অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে ওঠে। দেখা গেছে, জ্যেষ্ঠ ও প্রবীণ ২৪তম বিসিএস ব্যাচের যোগ্য কর্মকর্তাদের চেয়ে তুলনামূলক জুনিয়র ২৫তম বিসিএস ব্যাচ থেকে অনেক বেশি কর্মকর্তা পদোন্নতির সুবিধা পেয়েছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৪তম ব্যাচের ১৮৪ জন যোগ্য প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৪৫ জন পদোন্নতি ঝুলিতে পুরতে পেরেছেন, অন্যদিকে জুনিয়র ২৫তম ব্যাচের ২০৪ জন প্রার্থীর বিপরীতে পদোন্নতি পেয়েছেন ৭২ জন কর্মকর্তা। এমনকি ২৫তম বিসিএস ব্যাচের সমন্বিত মেধা তালিকার শীর্ষে থাকা প্রথম দুই কর্মকর্তা পদোন্নতির ওই তালিকা থেকে রহস্যজনকভাবে বাদ পড়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভের সাথে জানান যে, মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক শীর্ষ পর্যায় থেকে পুরো পদোন্নতি প্রক্রিয়াটিকে নিজেদের পছন্দের রাজনৈতিক ছাঁচে সাজানো হয়েছে, যেখানে সাধারণ মেধা বা কাজের পারফরম্যান্সের চেয়ে দলীয় আনুগত্যকেই প্রধান মাপকাঠি ধরা হয়েছে।

বাছাই প্রক্রিয়ার চরম গাফিলতি প্রকাশ পায় যখন দেখা যায়, পদোন্নতি তালিকার ৫৩ নম্বরে থাকা মাইনুল হক ভূঁইয়া নামের এক কর্মকর্তা প্রজ্ঞাপন জারির ৯ দিন আগেই অর্থাৎ ৩০ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে চলে গিয়েছিলেন। বিষয়টি গণমাধ্যমে জানাজানি হওয়ার পর প্রশাসনিক তীব্র সমালোচনার মুখে তড়িঘড়ি করে তার পদোন্নতির অংশটুকু বাতিল করে প্রজ্ঞাপন সংশোধন করা হয়। কিন্তু ভুলের তালিকা কেবল অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ডেমরা এলাকার সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গুরুতর অপকর্ম ও আর্থিক অনিয়মের দায়ে তিন বছরের বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট স্থগিতের দণ্ডপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ নজরুল ইসলামকে সসম্মানে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদে থাকা অবস্থায় বালুমহালের অর্থ ব্যাংকে জমা না দিয়ে জাল চুক্তির দায়ে বেতন স্কেলের সর্বনিম্ন ধাপে নামিয়ে দেওয়ার শাস্তিপ্রাপ্ত সড়ক পরিবহন বিভাগের উপসচিব মো. শাহিনুর ইসলামও পদোন্নতির তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এমনকি ঈদুল আজহার কোরবানির বর্জ্য অপসারণে ব্যর্থতার দায়ে প্রধানমন্ত্রীর আদেশে সাময়িক বরখাস্ত হয়ে তদন্তের মুখোমুখি থাকা কর্মকর্তা ছাদেকুর রহমানকেও যুগ্ম সচিব পদে উন্নীত করা হয়েছে।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, উপসচিব থেকে উর্ধ্বতন পদে উন্নীত করার বিষয়টি মূল্যায়ন ও চূড়ান্ত সুপারিশ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)। এই শক্তিশালী বোর্ডে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, পিএমও সচিব, সিএন্ডএজি এবং জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র ও অর্থ সচিবের মতো জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক নীতি-নির্ধারকরা উপস্থিত থাকেন। দীর্ঘ আট মাস ধরে প্রার্থীদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর), গোয়েন্দা রিপোর্ট ও কাজের মূল্যায়ন ফাইল নিরীক্ষা করে এই তালিকা প্রস্তুত করার পর প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত সই নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে একের পর এক দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির পদোন্নতি ও অবসরপ্রাপ্তের নাম ওঠায় এসএসবি-র পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, গোপনীয়তা ও নীতিগত নিরপেক্ষতা এখন সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে। সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিবদের মতে, যাচাই-বাছাইয়ের নামে এই উচ্চপর্যায়ের বোর্ড চরম অবহেলা ও দ্বিমুখী নীতি প্রদর্শন করেছে, যা দিনশেষে সরকারের নীতিভিত্তিক সুশাসনের ভাবমূর্তি ও প্রশাসনিক বিশ্বাসের ভিত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

বিতর্কের ঝড় উঠলে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের প্রধান তথা মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি ভুলগুলো স্বীকার করে নিয়ে দাবি করেন যে, আইনি জটিলতা বা বকেয়া মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার কারণেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও দলীয় চশমায় কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি ও নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন যে, সব রাজনৈতিক সরকারের সময়েই কিছু না কিছু দলীয় বিবেচনা ও পছন্দের প্রভাব থাকে। তিনি স্পষ্ট করে জানান, বিগত নির্বাচনে যারা সরাসরি বিরোধী দলের হয়ে জেলা প্রশাসকের পদে কাজ করেছেন বা নির্দিষ্ট দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে যুক্ত ছিলেন, তাদের বর্তমান সরকারের আমলেও পদোন্নতির তালিকায় রাখা সম্ভব নয়। প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তির এমন খোলামেলা বক্তব্য এটিই প্রমান করে যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে পেশাগত মেধার বদলে কেবল দলীয় আনুগত্যের চশমা দিয়েই দেখা হচ্ছে, যা নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ার স্বপ্নকে বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category