• সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১০:২৭ পূর্বাহ্ন

একের পর এক মৃত্যু, আতঙ্কের নাম কার্বন মনোক্সাইড

Reporter Name / ২ Time View
Update : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

রাজধানীর মৌচাক এলাকায় একটি পার্ক করা গাড়ির ভেতর থেকে দুই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই, সুদূর ওমানে একই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন চার বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা। এই একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে যে ঘাতকের নাম বারবার সামনে আসছে, তা হলো কার্বন মনোক্সাইড। এই গ্যাসটি এতটাই বিপজ্জনক যে, এর কোনো রং, গন্ধ বা স্বাদ নেই, যার ফলে একে ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ওমানের রয়্যাল ওমান পুলিশ ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিশ্চিত করেছে যে, গাড়ির এসি বা নিঃসরণ ব্যবস্থা থেকে নির্গত এই বিষাক্ত গ্যাসই চার ভাইয়ের মৃত্যুর কারণ।

ওমানে চার ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু

গত বুধবার সন্ধ্যায় ওমানের মুলাদ্দা এলাকায় এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত চার ভাই হলেন—রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। তারা সবাই চট্টগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন এবং ওমানে কর্মরত ছিলেন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সেদিন সন্ধ্যায় বড় ভাই রাশেদুল ইসলাম অসুস্থ বোধ করায় বাকি তিন ভাই তাঁকে চিকিৎসক দেখাতে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান। ক্লিনিকে সিরিয়াল পেতে দেরি হওয়ায় তারা গাড়িতেই অপেক্ষা করছিলেন। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে এক ভাই তাঁর বন্ধু পারভেজকে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। সেই মেসেজে তিনি আতঙ্কিত কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমরা গাড়ি থেকে নামতে পারছি না, আমাদের নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে।” এটিই ছিল তাদের শেষ আকুতি।

সহায়তা পৌঁছানোর আগেই গাড়ির ভেতর নিঃশব্দে নিভে যায় চারটি প্রাণ। ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা গাড়ির ভেতর চার ভাইকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করে। এই ঘটনায় নিহতের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

এখনো জানেন না মা

এই মর্মান্তিক ঘটনার তিন দিন পার হয়ে গেলেও, নিহত চার ভাইয়ের মা খাদিজা বেগম এখনো জানেন না যে তাঁর চার ছেলে আর বেঁচে নেই। স্বজনরা তাঁকে জানিয়েছেন যে, ছেলেরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। বিশেষজ্ঞ ও মনস্তাত্ত্বিকদের পরামর্শে, মায়ের মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে এবং তাঁকে এই বড় শোক থেকে রক্ষা করতে এখনই মৃত্যুর খবর জানানো হচ্ছে না। খাদিজা বেগম পথ চেয়ে বসে আছেন, তাঁর ছেলেরা সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে।

নীরব ঘাতক কার্বন মনোক্সাইড কী?

কার্বন মনোক্সাইড (CO) একটি অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস। এটি তৈরি হয় জীবাশ্ম জ্বালানি, যেমন—অক্টেন, পেট্রল, ডিজেল বা কাঠ সম্পূর্ণভাবে না পুড়লে। গাড়ির ইঞ্জিন, জেনারেটর, হিটার বা রান্নার চুলা থেকে এই গ্যাস নির্গত হতে পারে।

এই গ্যাসটি মানুষের জন্য এতটাই বিপজ্জনক হওয়ার প্রধান কারণ হলো এর রং, গন্ধ বা স্বাদ নেই। মানুষ নিঃশ্বাসের সঙ্গে এই গ্যাস গ্রহণ করলেও বুঝতে পারে না যে তারা বিষাক্ত গ্যাস গ্রহণ করছে। একারণেই একে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। গাড়ির এসি বা একজস্ট সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই গ্যাস গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে এবং বদ্ধ পরিবেশে দ্রুত মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

শরীরে কার্বন মনোক্সাইডের প্রভাব

মানুষের রক্তে অক্সিজেন বহন করার জন্য হিমগ্লোবিন থাকে। কিন্তু কার্বন মনোক্সাইড হিমগ্লোবিনের সঙ্গে অক্সিজেনের চেয়ে ২৫০ গুণ বেশি দ্রুত মিশে যেতে পারে। যখন কেউ কার্বন মনোক্সাইডযুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেয়, তখন রক্তে অক্সিজেনের বদলে কার্বন মনোক্সাইড মিশে যায়।

এর ফলে মস্তিষ্কে এবং শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো হলো—মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরা, ঝিমঝিম ভাব, বমি বমি ভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং শ্বাসকষ্ট। অনেক সময় একে সাধারণ ফ্লু বা ক্লান্তির লক্ষণ মনে করে ভুল করা হয়। ধীরে ধীরে এই গ্যাসের প্রভাবে মানুষের চেতনা লোপ পায়, খিঁচুনি হয় এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয়। ওমানের ঘটনায় চার ভাই গাড়ির দরজা খুলতে না পারা এবং নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার কথা বলার মাধ্যমেই কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ার লক্ষণ স্পষ্ট হয়েছে।

সতর্কতা ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়া থেকে বাঁচতে এবং ওমানের মতো মর্মান্তিক ঘটনা এড়াতে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:

  • গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ: গাড়ির একজস্ট সিস্টেম (ধোঁয়া নির্গমন ব্যবস্থা) নিয়মিত পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। একজস্ট পাইপে কোনো ছিদ্র বা লিক থাকলে তা অবিলম্বে মেরামত করতে হবে।

  • বদ্ধ গাড়িতে এসি: বন্ধ জায়গায়, যেমন—গ্যারেজে বা পার্কিংয়ে দীর্ঘ সময় গাড়ির ইঞ্জিন বা এসি চালু রাখা অত্যন্ত বিপজ্জনক। যদি গাড়িতে অপেক্ষা করতেই হয়, তবে জানালার কাঁচ অন্তত কিছুটা নামিয়ে রাখা উচিত, যাতে বাইরে থেকে বাতাস আসতে পারে।

  • কার্বন মনোক্সাইড ডিটেক্টর: গাড়িতে বা ঘরের ভেতর কার্বন মনোক্সাইড মনিটর বা ডিটেক্টর ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ডিভাইসটি বাতাসে কার্বন মনোক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেলে অ্যালার্ম বাজিয়ে সতর্ক করে দেয়।

  • লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পদক্ষেপ: গাড়িতে থাকা অবস্থায় যদি হঠাৎ মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তবে দেরি না করে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে খোলা বাতাসে যেতে হবে।

রয়্যাল ওমান পুলিশ জানিয়েছে, নিহত চার ভাইয়ের মরদেহ আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশে পৌঁছাবে। স্বজনরা এই ‘নীরব ঘাতক’ সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হওয়ার এবং সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে আর কোনো পরিবারকে এমন মর্মান্তিক শোক সহ্য করতে না হয়।

তথ্যসূত্র: মাছরাঙা নিউজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category