রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত গাউছিয়া মার্কেটে পা রাখেননি কিংবা এর নাম শোনেননি, এমন নগরবাসী খুঁজে পাওয়া ভার। কেনাকাটার চিরচেনা কোলাহল আর জমজমাট বাণিজ্যের এই প্রাণকেন্দ্রটি বাইরের চাকচিক্যে ভরপুর হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ ও মর্মস্পর্শী ইতিহাস। সাধারণ মানুষের অনেকেই হয়তো জানেন না যে, ঢাকার অন্যতম লাভজনক ও ব্যস্ততম এই বিপণিবিতানটি মূলত কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। এর মূল রূপকার ছিলেন মরহুম মোহাম্মদ ইউসুফ সরদার। নিজের কোনো উত্তরসূরি বা সন্তানসন্ততি না থাকায় তিনি জীবনের শেষভাগে এসে তাঁর সারাজীবনের উপার্জিত এই বিপুল বিত্তবৈভব মানবকল্যাণে উৎসর্গ করে যান। তাঁর অন্তরের মূল বাসনা ছিল, এই বাণিজ্যিক কেন্দ্রের উপার্জিত প্রতিটি পয়সা ব্যয় হবে অসহায় দরিদ্র মানুষের সহায়তায়, স্বাস্থ্যসেবায় এবং সামাজিক উন্নয়নে। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি এই অমূল্য সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছিলেন, বর্তমানের অব্যবস্থাপনা আর লুটপাটের যাঁতাকলে তা আজ পুরোপুরি ম্লান হয়ে গেছে।
বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে গাউছিয়া মার্কেটের অভ্যন্তরে চলা চরম অসংগতি দেখে চোখ কপালে ওঠার উপক্রম হয়। বর্তমানে এই বহুতল বিপণিকেন্দ্রে মোট ৫৮৮টি বাণিজ্যিক দোকান বরাদ্দ রয়েছে। যেখানে রাজধানীর কেন্দ্রস্থলের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় প্রতিটি বর্গফুটের মূল্য আকাশচুম্বী, সেখানে গাউছিয়া মার্কেটের একেকটি দোকানের মাসিক ভাড়া নির্ধারণ করা রয়েছে মাত্র ১১২ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকার মধ্যে। অথচ অবাক করা বিষয় হলো, রাস্তার ঠিক উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে থাকা নিউ মার্কেটের সমআয়তনের একেকটি দোকানের মাসিক ভাড়া অন্তত ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে। এই আকাশপাতাল পার্থক্যের কারণে প্রতি মাসে যে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব লোকসান হচ্ছে, সেই অর্থ আসলে কার পকেটে ঢুকছে, তা নিয়ে বড় ধরনের রহস্য রয়ে গেছে। এই বিপুল আর্থিক ক্ষতির সরাসরি শিকার হচ্ছেন দেশের সেই প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকরা, যাঁদের অন্ন, বস্ত্র ও শিক্ষার সংস্থানের জন্য ইউসুফ সরদার নিজের সর্বস্ব লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন।
ইসলামি বিধান অনুসারে নিঃস্বার্থভাবে কোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি চিরতরে জনহিতকর কাজে দান করার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ওয়াকফ’। গাউছিয়া মার্কেটের মতো ঘটনা দেশে বিচ্ছিন্ন কোনো উদাহরণ নয়, বরং এটি একটি গভীর সংকটের প্রতীক মাত্র। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে লাখ লাখ একর ওয়াকফকৃত ভূসম্পত্তি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের অবৈধ দখলদারির কবলে পড়ে দাতাদের পবিত্র অন্তিম ইচ্ছা আজ সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হতে বসেছে। সরকারি পরিসংখ্যানের পাতায় চোখ বোলালে এই সংকটের গভীরতা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি সরকারি দপ্তরের তথ্যমতে, দেশে ওয়াকফ করা মোট জমির পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৩৭ হাজার একরের কিছু বেশি। কিন্তু চরম অস্বস্তিকর বিষয় হলো, স্বয়ং ধর্মমন্ত্রীর দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্যের সাথে এই হিসাবের কোনো মিল পাওয়া যায় না। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াকফকৃত জমির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও আরও অন্তত ৭৭ হাজার একর বেশি। খোদ রাষ্ট্রের দুটি দায়িত্বশীল সরকারি কাঠামোর নথিপত্রে তথ্যের এমন আকাশছোঁয়া গরমিলই প্রমাণ করে যে, ওয়াকফ প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা ও গাফিলতি কতটা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
শুধু নথিপত্রের গরমিলই নয়, দেশের ওয়াকফ করা মোট সম্পত্তির প্রায় ২০ শতাংশই বর্তমানে দখলদারদের জবরদখলে চলে গেছে। এর এক জলজ্যান্ত ও মর্মান্তিক প্রমাণ মিলবে রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত হযরত শাহ আলী বোগদাদী (রহ.) মাজারের দিকে তাকালে। সরকারি জরিপ ও নথিপত্র অনুসারে এই পবিত্র মাজারের অনুকূলে মোট জমির পরিমাণ ৩২ একরেরও বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু চোখ মেলে তাকালে দেখা যায়, বাস্তবে মাজার কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে টিকে রয়েছে মাত্র ছয় একরের মতো জমি। বাকি প্রায় ২৬ একর মূল্যবান জমি যুগের পর যুগ ধরে প্রভাবশালী দখলদারদের পেটে চলে গেছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এই বেদখল হয়ে যাওয়া জমির আনুমানিক আর্থিক মূল্য অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা। ধর্মীয় অনুভূতির প্রতীক হিসেবে যে জমি সংরক্ষিত থাকার কথা ছিল, তা আজ কতিপয় ক্ষমতাবানের ভোগদখলের অবৈধ সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে।
জমি বেদখলের পাশাপাশি যেখানে সম্পত্তি এখনো কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে আছে, সেখানেও আয়ের হিসাবে চলছে শুভঙ্করের ফাঁকি ও ভয়ংকর অনিয়ম। পুরান ঢাকার চকবাজার শাহী মসজিদের ঘটনাই এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। দীর্ঘদিন ধরে এই মসজিদের পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটি আওতাধীন দোকানপাট ও স্থাপনা থেকে প্রতি মাসে মোট ভাড়া আদায় দেখাত মাত্র ৩৫ হাজার টাকা। অথচ পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আসার পরপরই নতুন কমিটি এসে কোনো জাদুবলে সেই মাসিক আদায়ের অঙ্ক এক ধাক্কায় আড়াই লাখ টাকা ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। এই দৃষ্টান্ত স্পষ্ট করে দেয় যে, বছরের পর বছর ধরে কীভাবে আয়ের বিরাট অংশ গোপন করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। অতীতে হারিয়ে যাওয়া সেই বিপুল অর্থের কোনো জবাবদিহি আজও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
অথচ নিয়ম অনুযায়ী, এই ওয়াকফ এস্টেটগুলো থেকে সংগৃহীত হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা ছিল জাতীয় অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নে। দাতাদের স্পষ্ট শর্ত ছিল, এই অর্থে গড়ে উঠবে আধুনিক দাতব্য হাসপাতাল, তৈরি হবে গ্রামীণ রাস্তাঘাট, বিধবা ও এতিমরা পাবে নিয়মিত ভাতা এবং অর্থাভাবে পিছিয়ে পড়া মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেওয়া হবে বৃত্তি। কিন্তু নির্মম সত্য হলো, দেশের ওয়াকফ প্রশাসন নির্দিষ্ট করে পরিষ্কার কোনো হিসাব তুলে ধরতে পারে না যে তারা বিগত বছরগুলোতে কোন জনহিতকর খাতে ঠিক কত টাকা ব্যয় করেছে। আধুনিক যুগে এসেও ওয়াকফ প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইটে বছরের পর বছর ধরে কোনো নতুন তথ্য হালনাগাদ করা হয় না। স্বচ্ছতা ও আধুনিক নজরদারির এই চরম অভাব দেখে দেশের সাধারণ বিত্তবান মানুষের মন থেকেও ওয়াকফ করার আগ্রহ দিনে দিনে উবে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাকালে দেখা যায়, মুসলিম বিশ্বের বহু দেশ ওয়াকফ সম্পদকে তাদের অর্থনীতির মূল শক্তিতে রূপান্তর করেছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার মতো উন্নত রাষ্ট্রগুলো তাদের ওয়াকফ তহবিলকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল নির্মাণ করছে, সাধারণ নাগরিকদের জন্য কম খরচে আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলছে এবং বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছে। বিপরীতে, আমাদের দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার স্থাবর সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও তা হয় নামমাত্র মূল্যে প্রভাবশালীদের কাছে ইজারা দেওয়া হচ্ছে, নয়তো পুরোপুরি বেদখল হয়ে পড়ে আছে। যে অপরিমেয় সম্পদ হতে পারত দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি, তা আজ পরিণত হয়েছে সুযোগসন্ধানী কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর রাতারাতি ধনী হওয়ার হাতিয়ারে। যে ত্যাগী মানুষেরা নিজেদের বংশধরদের ভবিষ্যৎ না ভেবে নিঃস্বার্থভাবে তাঁদের জীবনের সব অর্জন দেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করে গেলেন, তাঁদের সেই পবিত্র আকাঙ্ক্ষা কি আদৌ কোনোদিন আলোর মুখ দেখবে, নাকি প্রশাসনিক উদাসীনতার অতলেই চিরতরে হারিয়ে যাবে, সেই প্রশ্ন আজ সমগ্র জাতির বিবেককে নাড়া দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ