কয়েকদিন আগে টিন এজ ছেলেমেয়েদের তিনটি সমস্যা নিয়ে লিখেছিলাম। পরদিন তাবাসসুম নামে এক সহকর্মী বলল, ‘স্যার, আপনার টিনএজারদের নিয়ে লেখাটি পড়েছি। সে প্রেক্ষিতে বলছি, আমার এ বয়সের দুটো ছেলে আছে। টিন এজ মেয়েদের চাইতে ছেলেদের হ্যান্ডেল করা অনেক বেশি কঠিন। আপনি শুধু ছেলেদের বিষয়ে আলাদা লিখতে পারেন না?’
তাবাসসুমের পরামর্শের ভিত্তিতে এ লেখা।
আমি ফিরে গেলাম আমার শৈশবে। ভাবতে লাগলাম এ বয়সে আমি বাবা-মায়ের কাছ থেকে কী ধরনের আচরণ আশা করতাম।
আমার অতীত উত্তর দিল—
১) কন্ট্রোল নয় কানেক্ট—
কিশোর ছেলেদের বেশি কন্ট্রোল করতে গেলে উল্টোটা ঘটে। তাই বেশি লাগাম না টেনে তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো উচিত। অন্তরের বন্ধনের চাইতে বড় বাঁধন আর হয় না। ছোটবেলায় আব্বা-আম্মা আমার সাথে এত নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন যে, আমি এখনো কিছু করার আগে ভাবি, আম্মা রাগ করবেন না তো? আব্বা জীবিত থাকলে মন খারাপ করতেন না তো?
২) সম্মান করা—
এ সময় আত্মসম্মানবোধ পাখা মেলে। আমি নিজেও এ বয়সে তাচ্ছিল্য পেলে বিদ্রোহ করতাম—কিন্তু সামান্য সম্মান পেলে সব উপদেশ মাথা পেতে নিতাম।
ক্লাস এইটে পড়ার সময় এক আত্মীয়ের মেয়ের বিয়েতে আমাকে সবার সামনে খাবার টেবিল থেকে উঠিয়ে অন্য অতিথিকে বসতে দেওয়া হয়েছিল। আমাকে বলা হয়েছিল, পরে খেতে। ছেচল্লিশ বছর কেটে গেছে আমি আর কখনো সে আত্মীয়ের বাড়ি যাইনি।
৩) বন্ধু চেনা—
এ বয়সের ছেলেরা অনেক সময় সঙ্গদোষে বিগড়ায়। তাই তারা কার সাথে মিশছে সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। যদি দেখা যায় ভুল বন্ধু নির্বাচন করেছে, তাহলে বুঝিয়ে-শুনিয়ে তা থেকে ফেরাতে হবে।
এটি করার সবচেয়ে ভালো কৌশল হলো, তার বন্ধুদের মাঝে মাঝে বাসায় ডাকা। তাহলে সহজেই বোঝা যায়, সঙ্গীরা কেমন।
৪) রাগের সময় রিয়্যাক্ট না করা—
ওরা যখন রাগ করে তখন পালটা রিয়্যাক্ট করা উচিত নয়। এতে ওরা আরো জেদি হয়ে ওঠে।
আমাদের পাড়ায় এক চাচা ছিলেন। নাম ছিল মোজাম্মেল হক। তাঁর পিঠাপিঠি তিনজন কিশোর ছেলে ছিল। এরা রাগ বা জেদ করলে তিনি কখনোই পাল্টা রাগ করতেন না। এমনকি এদের কেউ চাঁদে যাওয়ার জেদ ধরলেও বলতেন, ‘আচ্ছা, যেতে চাইলে যাবি। কিন্তু আমি তো চাঁদে কীভাবে যেতে হয় তা জানি না। তুই জোগাড়-যন্তর কর।’
এতটাই ছিল তাঁর ধৈর্য! বলা বাহুল্য, তারা চাঁদে যাওয়ার জোগাড়-যন্তরও করতে পারত না—তাই জেদও টিকত না।
মোজাম্মেল চাচার তিন ছেলেই এখন প্রতিষ্ঠিত।
৫) সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা—
এ সময় ছোটখাটো বিষয়ে তাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। এ বয়সে অনেক কিছু নিজের মতো করতে ইচ্ছে করে, চুলের স্টাইল বদলাতে ইচ্ছে করে, গান শুনতে ইচ্ছে করে, নিজের পছন্দে পোশাক কিনতে ইচ্ছে করে। নির্দোষ হলে এসব ক্ষেত্রে কিছু স্বাধীনতা দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
কিশোর বয়সে আমি মাসুদ রানার বই পড়তে খুব পছন্দ করতাম। কিন্তু তখন অনেকেই চাইতেন না অল্পবয়সীরা এ বই পড়ুক। তাই আম্মা নিজেই মাসুদ রানার কয়েকটি বই পড়লেন, তারপর বললেন, ‘হালকা প্রেম-ভালোবাসা ছাড়া এসব বইতে তো তেমন আপত্তির কিছু দেখি না। বরং মনে হয়েছে, এ বই পড়লে আর কিছু না হোক, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ, জাতি এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে জানবে।’
আসলেই মাসুদ রানা আমাকে দুনিয়া চিনিয়েছিল। কারণ এ সিরিজের প্রায় প্রতিটি বইতে দেশ-বিদেশের বর্ণনা থাকত।
৬) প্রশংসা করুন—
বয়সটা প্রশংসার কাঙাল। তার ভালো গুণের প্রশংসা করুন। এতে সে প্রশংসা ধরে রাখার দায় অনুভব করবে। যা বিপথে যেতে বাধা দেবে।
ছোটবেলায় পরিবার এবং পাড়ার সবাই আমাকে বেশ পছন্দ করতেন, ভালো বলতেন। (যদিও আমি এত ভালো নই) ঊনষাট বছরে পা দিয়েও আমাকে খুব সাবধান থাকতে হয় যাতে তাঁদের এ পছন্দ নষ্ট না হয়।
৭) বাবার ইনভলভড হওয়া—
আমার অভিজ্ঞতা বলে, শুধু মায়ের ওপর ছেড়ে দিলে কিশোরদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই বাবাকেও এ বয়সের ছেলেদের সাথে সিরিয়াসলি ইনভলবড হতে হবে।
আমার ক্ষেত্রে বাবা খুব সিরিয়াসলি ইনভলভড ছিলেন। যার কারণে আমি তাঁর সাথে পরামর্শ করে সব সিদ্ধান্ত নিতাম। মজার ব্যাপার হলো, চাকরি হওয়ার পর বেশ অল্প বয়সে আমি তাঁর কাছেই বিয়ে করার ইচ্ছা প্রথম প্রকাশ করি। তিনি তাতে সায়ও দিয়েছিলেন।
যতদিন তিনি ছিলেন, আমার সেরা বন্ধু ছিলেন।
কিশোর বয়সের ছেলে হচ্ছে দেয়াশলাইয়ের বারুদ। একটি ভুল ঘষা দেবেন, সবকিছু জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাড়খার করে দেবে।
তাই ঘষাটা সাবধানে দিন।
#আসুন মায়া ছড়াই