• মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬, ০৪:৫২ অপরাহ্ন
Headline
স্কুল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ: পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতার সংকট চালু হচ্ছে ‘ই-ঋণ’ সেবা: ব্যাংকে না গিয়ে ঘরে বসেই মিলবে ৫০ হাজার টাকা লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ২ বাংলাদেশি নিহত, ঢাকার তীব্র নিন্দা দেশে হাম ও উপসর্গে আরও ৯ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১১৯২ ‘মুসলিমদের অত্যাচার করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না’: মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয় জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক, তবে তা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে: বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী সিএনএনের বিশ্লেষণ: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ থেকে সামরিক দীক্ষা নিচ্ছে চীন, সতর্ক পর্যবেক্ষণে তাইওয়ান ইস্যু বিশ্বকাপ বয়কট ছিল আত্মঘাতী, ঘরোয়া ক্রিকেটের দুর্দশায় খেলোয়াড়রা রিকশা চালাচ্ছিল’: ভারতীয় গণমাধ্যমে অকপট তামিম সরকারি হাসপাতালে ভ্যাকসিনের হাহাকার: কুকুরের কামড়ে ৭২ ঘণ্টায় ৩ জনের মৃত্যু পশুবাহী যানবাহনে চাঁদাবাজি রোধে পুলিশের হটলাইন, অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

গঙ্গা চুক্তি নবায়নে সংকটের ছায়া: পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের বিপরীতমুখী অবস্থান

Reporter Name / ২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি এই অতি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির নবায়ন নিয়ে এখন দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এক বড় ধরনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সংকট ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অভিন্ন এই নদীর পানিবণ্টন ভবিষ্যতে কীভাবে হবে এবং কোন সূত্র মেনে চুক্তির রূপরেখা নির্ধারিত হবে—তা নিয়ে ঢাকা এবং নয়াদিল্লির মধ্যে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থান তৈরি হয়েছে। একদিকে ভারত বর্তমান বাস্তবতার দোহাই দিয়ে চুক্তির মূল সূত্র পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ উজানে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।


ভারতের দাবি: ‘নতুন বাস্তবতা’ ও পানিবণ্টনের নতুন সূত্র

সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোর মধ্যে পানি সবসময়ই তাদের কাছে অন্যতম অগ্রাধিকার পাওয়া একটি বিষয়। দুই দেশের মধ্যে অন্তত ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে, অথচ পানিবণ্টন চুক্তি রয়েছে কেবল গঙ্গার জন্য।

তবে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ। গত ৫ মে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া একটি মিডিয়া প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন যে, ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ব্যবহৃত সূত্রটি এবার আর কাজ নাও করতে পারে। উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত—এই ৪০ বছরের পানির ঐতিহাসিক প্রবাহের গড় হিসাবের ওপর ভিত্তি করে পানিবণ্টন সূত্রটি তৈরি করা হয়েছিল।

দিল্লির কৌশলগত ও নিরাপত্তা ইস্যুভিত্তিক স্বাধীন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ন্যাটস্ট্র্যাট’-এর আহ্বায়ক পঙ্কজ শরণ বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘নতুন বাস্তবতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, গত তিন দশকে দুই দেশেই জনসংখ্যা বিপুল পরিমাণে বেড়েছে এবং নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, গঙ্গা চুক্তির নবায়নের ক্ষেত্রে পুরনো ডেটার পরিবর্তে অবিলম্বে গত ৪০ বছরের (সাম্প্রতিক) পানির প্রবাহকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।


বাংলাদেশের উদ্বেগ: একতরফা পানি প্রত্যাহার ও ন্যায্য হিস্যার শঙ্কা

পঙ্কজ শরণের এই ‘নতুন বাস্তবতা’ এবং সাম্প্রতিক ৪০ বছরের পানির প্রবাহের ভিত্তিতে চুক্তি নবায়নের প্রস্তাবকে বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন ঢাকার পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা। তাদের মতে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে গঙ্গা নদীর উজানে বিভিন্ন ব্যারেজ ও সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে আসছে। এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ভাটির দেশ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন, কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশের ওপর।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন এই সূত্র যদি সত্যিই বাস্তবায়ন করা হয়, তবে বাংলাদেশ তার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে আরও ভয়াবহভাবে বঞ্চিত হবে। কারণ, উজানে ব্যাপক পানি প্রত্যাহারের ফলে গত কয়েক দশকে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর কম পানির হিসাব ধরলে বাংলাদেশের ভাগে খুব সামান্য পানিই জুটবে।

যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) সাবেক সদস্য এবং বিশিষ্ট পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত এ বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ভারত উজানে গঙ্গা থেকে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করছে, যার ফলে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ‘গঙ্গা নদীর শুরু ফারাক্কা থেকে নয়। এর উজানে বিপুল পানির প্রবাহ রয়েছে, যেখান থেকে একতরফাভাবে পানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলেই সীমান্ত বরাবর পানি কমে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’


তিস্তা প্রকল্প, চীনের সম্পৃক্ততা এবং ভারতের অস্বস্তি

গঙ্গা চুক্তির পাশাপাশি তিস্তা নদীর পানিবণ্টন এবং তিস্তা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা ভারতের জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় কূটনীতিক পঙ্কজ শরণ এ বিষয়ে মন্তব্য করে বলেন, চীনের আর্থিক সহায়তায় তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের আলোচনা করাটা একান্তই বাংলাদেশের নিজস্ব পছন্দ।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘তিস্তা একটি অভিন্ন নদী। তাই এখানে যেকোনো উন্নয়নমূলক কাজ বা বিদেশি সম্পৃক্ততা ভারতের জন্য কিছুটা হলেও উদ্বেগের বিষয়।’ তিনি স্বীকার করেন যে, এই সমস্যার সমাধান সবারই জানা, কিন্তু এর জন্য ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’ প্রয়োজন। উল্লেখ্য, ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের কথা থাকলেও, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় তা আটকে যায় এবং আজও বিষয়টি ঝুলে আছে।


নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ভারত

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বিষয়টিও নয়াদিল্লির এই আলোচনাগুলোতে উঠে এসেছে। গত ৪ মে নয়াদিল্লিতে নিজ দপ্তরে বাংলাদেশি মিডিয়া প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলাপকালে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তারা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে পানিসহ অন্যান্য সব অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।

তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, অভিন্ন নদীগুলোর সমস্যা মোকাবিলায় কারিগরি কাঠামো হিসেবে কাজ করা জয়েন্ট রিভার কমিশন (জেআরসি) গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের জন্য যথাসময়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবে। তিনি ১৯৯৬ সালের এই চুক্তিটিকে একটি ‘সফল চুক্তি’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেন।


ঢাকার নীরবতা ও জেআরসির ভূমিকা

গঙ্গা চুক্তির নবায়নের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আপাতত সরাসরি মুখ খুলতে নারাজ। ভারত-বাংলাদেশ জয়েন্ট রিভার কমিশনের কারিগরি পর্যায়ে চুক্তি নবায়নের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদ সচিব এ কে এম সাহাবউদ্দিন গত সোমবার ঢাকায় জানান যে, তিনি এই পর্যায়ে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না। জেআরসি, বাংলাদেশের সদস্য মো. আনোয়ার কাদিরও এই বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

তবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং জেআরসি, বাংলাদেশের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গঙ্গা চুক্তির নবায়ন সংক্রান্ত আলোচনা যখন আনুষ্ঠানিক টেবিলে গড়াবে, তখন সব বিষয়ই বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হবে এবং বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হবে।

দীর্ঘ ১২ বছরের বিরতির পর ২০২২ সালের আগস্টে নয়াদিল্লিতে জেআরসি-র সর্বশেষ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে সেই বৈঠকেও বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর এবং অন্যান্য ছয়টি আন্তঃসীমান্ত নদীর বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। উভয় পক্ষ সেসময় গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির বিধানের অধীনে বাংলাদেশের প্রাপ্ত পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করতে সম্মত হয়েছিল। ঢাকা ইতিমধ্যে শুষ্ক মৌসুমে (বিশেষ করে জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত) পানিবণ্টন নির্দিষ্টকারী গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেছে।


আগামী ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশ ও ভারতকে একটি সম্মানজনক ও ন্যায্য সমাধানে পৌঁছাতে হবে। একদিকে ভারতের ‘নতুন বাস্তবতা’র নামে পানি প্রবাহ কমার যুক্তি দিয়ে হিস্যা কমানোর কৌশল, অন্যদিকে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা—এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তি নবায়ন করা বর্তমান সরকার ও জেআরসির জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ, মরূকরণ রোধ এবং দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা ঠেকাতে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির কোনো বিকল্প নেই। তাই আসন্ন আলোচনাগুলোতে বাংলাদেশের শক্ত, তথ্যভিত্তিক ও কৌশলী অবস্থান অত্যন্ত জরুরি।

 

তথ্যসূত্র: নিউ এইজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category