বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সম্ভবত এক অনন্য ও বিরল চরিত্র হয়ে থাকবেন। তিন বছরের ব্যবধানে তিনি তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর সরকারের অধীনে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো, সরকারের চরিত্র বদলানোর সাথে সাথে বদলে গেছে তাঁর বক্তব্যের সুর, আদর্শিক অবস্থান, এমনকি সমাপ্তি সূচক স্লোগানও।
২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদের উদ্বোধনী ভাষণে মো. সাহাবুদ্দিন যখন বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনকে ‘সহিংসতা’ এবং ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে ‘সফল’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন, তখন তাঁর মুখে ছিল শেখ হাসিনা সরকারের নিরঙ্কুশ প্রশংসা। ভাষণের শেষে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন ‘জয় বাংলা’।
অথচ ২০২৬ সালের ১৩ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে সেই একই ব্যক্তির কণ্ঠে শোনা গেল ভিন্ন সুর। এবার তিনি:
জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
বেগম খালেদা জিয়ার সংগ্রামকে ‘আপসহীন’ বলে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
গত ১৫ বছরের শাসনকে ‘ফ্যাসিবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে গণতন্ত্রের নতুন সূচনা বলেছেন।
বক্তৃতা শেষ করেছেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে।
রাষ্ট্রপতির এই ভোলবদল নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ কি কেবল মন্ত্রিসভার লিখে দেওয়া একটি ‘স্ক্রিপ্ট’ পাঠ করা, নাকি এতে তাঁর নিজস্ব কোনো নৈতিক অবস্থান থাকা উচিত? সংসদে যখন তিনি ফ্যাসিবাদী সরকারের সমালোচনা করছিলেন, তখন বিএনপি নেতা তারেক রহমানসহ সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন দিলেও, জামায়াত ও এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি) ওয়াকআউট করে প্রতিবাদ জানিয়েছে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের মতে, “কোনো ফ্যাসিষ্টের দোসর যেন সংসদকে কলুষিত করতে না পারে।”
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে মো. সাহাবুদ্দিনের ক্যারিয়ার নিয়েও বিতর্ক কম নয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার থাকাকালীন তাঁর ভূমিকা এবং পরবর্তীতে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের সাথে তাঁর ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা (জেএমসি বিল্ডার্স ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক পদ) তাঁকে শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এমনকি আওয়ামী লীগের ভেতরও আলোচনা ছিল যে, তিনি কেবল শেখ হাসিনার ‘ব্যক্তিগত পছন্দে’ এই পদে এসেছিলেন।
সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার দোহাই দিয়ে মো. সাহাবুদ্দিন এখনো চেয়ারে টিকে আছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর এই ‘সময় বুঝে সুর বদলানো’র রাজনীতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের মর্যাদাকে কোন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, তা এখন বড় প্রশ্ন। একদিকে জামায়াত তাঁকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলছে, অন্যদিকে এনসিপি চাইছে তাঁর অভিশংসন।
সংসদ নেতা তারেক রহমান সংসদকে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করতে চাইলেও, এই ‘বিতর্কিত’ রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে সংসদের যাত্রা শুরু করা কতটুকু শোভনীয়—সেই বিতর্ক হয়তো আরও দীর্ঘকাল বাংলাদেশের রাজনীতিতে অমীমাংসিত থেকে যাবে।