চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া নজিরবিহীন সংকট ও টানা এক মাসের অচলাবস্থার পর অবশেষে টনক নড়েছে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লাগাতার কর্মবিরতি ও অসহযোগ আন্দোলনের কারণে দীর্ঘ দিন ধরে দেশের এই শীর্ষ প্রকৌশল বিদ্যাপীঠের যাবতীয় পাঠদান ও দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছিল। সংকট নিরসনে এতদিন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রকাশ্য কোনো জোরালো ভূমিকা না থাকলেও পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করায় শেষ পর্যন্ত ঘটনার অনুসন্ধান এবং সমাধানের উপায় খুঁজতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে তদন্ত ও পরামর্শক কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে ইউজিসি চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক বিশেষ চিঠির মাধ্যমে কমিশন পর্যায়ের সদস্যদের নিয়ে এই কমিটি গঠন করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের সেই নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুনকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এমন দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক প্রশাসনিক সংকটের মুখোমুখি কখনো হয়নি চুয়েট। গত ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক আকস্মিক আদেশে চুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পদ থেকে অব্যাহতি দেয়। মাত্র ৫৬ দিন আগে অর্থাৎ ২৭ জুলাই তিনি উপাচার্য হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। সায়েমকে সরিয়ে দেওয়ার পরপরই খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় মন্ত্রণালয়। এই আকস্মিক রদবদলকে কোনোভাবেই মেনে নেয়নি চুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সাবেক উপাচার্যকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে পরদিনই অর্থাৎ ২২ সেপ্টেম্বর থেকে একযোগে ক্লাস ও সকল প্রকার পরীক্ষা বর্জন করে রাজপথে নামেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। পরবর্তীতে এই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি বড় অংশও অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ও পূর্ণ অসহযোগ কর্মসূচি ঘোষণা করে। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের সম্মিলিত প্রতিরোধে পুরো ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কাঠামো একেবারেই ভেঙে পড়ে।
পরিস্থিতির জটিলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ক্যাম্পাসে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের সাহস পর্যন্ত পাননি। গত ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি অনলাইনে উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন এবং চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থান করে সেখান থেকেই দূরনিয়ন্ত্রিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনার চেষ্টা চালান। কিন্তু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক অসহযোগিতার কারণে তাঁর সেই প্রয়াসও চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এরপর দীর্ঘ প্রায় তিন সপ্তাহ পর গত ১২ অক্টোবর তিনি প্রথমবারের মতো চুয়েট ক্যাম্পাসে উপস্থিত হয়ে উপাচার্য ভবনে প্রবেশ করেন। গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, সে সময় তাঁর সঙ্গে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীও উপস্থিত ছিলেন। নতুন উপাচার্যের এই আগমনের খবরে আন্দোলনরত শত শত শিক্ষার্থী তাৎক্ষণিকভাবে উপাচার্য কার্যালয় ঘেরাও করে মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। একপর্যায়ে অবরুদ্ধ ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং প্রায় ৩০ ঘণ্টা উপাচার্য সেখানে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ অবস্থায় বন্দি থাকেন। অবশেষে ১৩ অক্টোবর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া এবং পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে বিপুল পুলিশ বাহিনীর সহায়তায় উপাচার্যকে উদ্ধার করে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।
ক্যাম্পাস থেকে উদ্ধার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর ১৫ অক্টোবর আবারও সার্কিট হাউসে ফিরে যান উপাচার্য এবং পরদিনই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের জরুরি বৈঠক ডাকেন। কিন্তু ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত ১৪৫তম সেই সিন্ডিকেট সভা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটকে হ্রাস করার বদলে শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যকার বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ সদস্যের সিন্ডিকেটের মধ্যে অভ্যন্তরীণ শিক্ষক ও ডিন পর্যায়ের ১০ জন সদস্যই সভাটি সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেন। উপস্থিত ছিলেন মাত্র ছয়জন সদস্য, যাঁদের মধ্যে উপাচার্য ছাড়াও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ডক্টর মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মাহবুবুল হক পাটওয়ারী, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান এবং চুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রকৌশলী খান আতাউর রহমান অংশ নেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি অনুষদের ডিন, দুটি ইনস্টিটিউটের পরিচালক, শিক্ষকদের নির্বাচিত দুজন প্রতিনিধি, শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ, রেজিস্ট্রার এবং বুয়েট ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন বহিরাগত অধ্যাপক সভায় অনুপস্থিত থাকেন। শিক্ষক প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে আয়োজিত সেই বৈঠকে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে সরকারের কাছে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত ও পরামর্শক কমিটি গঠনের সুপারিশ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব গৃহীত হয়।
দীর্ঘ এক মাসের এই টানা অচলাবস্থার কারণে সবচেয়ে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সাড়ে চার হাজার নিয়মিত শিক্ষার্থী। আন্দোলনের কারণে অন্তত তিনটি সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পূর্ণরূপে বাতিল করতে হয়েছে এবং সব ধরনের নিয়মিত ক্লাস বন্ধ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে নষ্ট হয়ে গেছে প্রায় ৫ লাখ ৬৭ হাজার কর্মঘণ্টা বা শিক্ষাঘণ্টা। প্রকৌশল শিক্ষার মতো একটি ব্যবহারিক ও জটিল মাধ্যমে এত দীর্ঘ সময় ল্যাব ও শ্রেণিকক্ষ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পেশাগত প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ওপর অন্তত ছয়টি বিভাগের চূড়ান্ত পরীক্ষা আটকে থাকায় শিক্ষার্থীদের মনে তীব্র সেশনজটের আতঙ্ক বাসা বেঁধেছে। ইতিমধ্যে দুর্গাপূজার ছুটি শুরু হওয়ায় ক্যাম্পাস অনেকটাই ফাঁকা হয়ে পড়েছে, তবে শিক্ষার্থীদের মূল দাবি আদায় না হওয়ায় আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক ইতি টানা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ডক্টর মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সিন্ডিকেট সভা থেকে ক্লাস ও পরীক্ষা শুরুর নির্দেশনা দেওয়ার কথা বলা হলেও শিক্ষকদের কোনো প্রতিনিধি সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন না। শিক্ষক ও কর্মকর্তা সমিতি এখনো অসহযোগ আন্দোলনে অনড় রয়েছে। শিক্ষক ও কর্মচারীদের সহযোগিতা ছাড়া কীভাবে এবং কাদের দিয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা পরিচালনা করা সম্ভব হবে, তা কোনোভাবেই অনুধাবন করা যাচ্ছে না।
চুয়েটের মতো জাতীয় পর্যায়ের একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিয়ে সরকারের দীর্ঘদিনের নিশ্চুপ ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা। চুয়েটের প্রথম উপাচার্য প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান, চুয়েট দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ হওয়া সত্ত্বেও এক মাস ধরে সেখানে পড়াশোনা বন্ধ থাকা অবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমন নির্লিপ্ততা চরম দুঃখজনক। যে উপাচার্যকে নিয়ে এত বড় বিতর্ক, তীব্র আপত্তি ও রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, তাঁকে মন্ত্রণালয়ের সুপারিশেই আচার্য নিয়োগ দিয়েছিলেন। ফলে দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ মন্ত্রণালয়ের নেই। এই দীর্ঘ নীরবতা ও কালক্ষেপণের কারণে চুয়েটের শিক্ষার্থীদের যে অপরিসীম ক্ষতি হয়েছে, তার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।
এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, নতুন গঠিত তদন্ত ও পরামর্শক কমিটির মাধ্যমে চুয়েটের এই বিষম সংকট আদৌ কতটা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে। বর্তমান অচলাবস্থা এখন আর কেবল একজন উপাচার্যের ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিয়োগ বা অপসারণের বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত আবেগ, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় সচল করার মতো বহুমুখী জটিল প্রশ্নের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে। এক মাসের দীর্ঘ রক্তক্ষরণ ও শিক্ষাঘণ্টা হারানোর পর দেরিতে হলেও তদন্ত কমিটি গঠনের পদক্ষেপ হয়তো একটি ইতিবাচক দিক, কিন্তু আন্দোলনরত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খোলামেলা ও কার্যকর আলোচনা ছাড়া শুধু একটি প্রশাসনিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সমাধান চাপিয়ে দেওয়া হলে চুয়েটের অস্থিরতা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা।
তথ্যসূত্র: সমকাল