ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে সামনে রেখে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ (Shadow Cabinet) গঠনের জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটির একাধিক বিশেষজ্ঞ টিম ইতিমধ্যেই এই কাঠামো দাঁড় করানোর কাজ শুরু করেছে। ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি চললেও আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত রূপরেখা প্রস্তুত হওয়ার পরই এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, নির্বাচিত সংসদ সদস্য, দলের সিনিয়র নেতা এবং বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এই মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বিকল্প কাঠামোটি গঠন করা হবে। প্রতিটি বিশেষজ্ঞ টিমে ৩ থেকে ৫ জন সদস্য কাজ করছেন, যারা সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং বিকল্প নীতিমালা প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র প্রস্তুত করছেন।
ছায়ামন্ত্রিসভা কী এবং কেন?
সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ হলো প্রধান বিরোধী দলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিকল্প কাঠামো, যা ক্ষমতাসীন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমান্তরালে কাজ করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো—সরকারের নীতি ও কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা, যেকোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং সেসবের বিপরীতে বিকল্প ও যৌক্তিক প্রস্তাবনা পেশ করা। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং নিউজিল্যান্ডের মতো উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে এই ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর ও সুপরিচিত।
সূত্রমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠনের লক্ষ্য নিয়ে এগোলেও শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করে। বর্তমান সংসদে এই জোটের মোট ৭৭ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন, যার মধ্যে এককভাবে জামায়াতেরই ৬৮ জন। এই শক্তিশালী বিরোধী অবস্থান থেকেই সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দক্ষতা বৃদ্ধিতে এই ছায়ামন্ত্রিসভা গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গুজব ও ভুয়া তালিকা
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াতের কথিত ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’র একটি তালিকা ভাইরাল হয়, যেখানে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই তালিকাকে সম্পূর্ণ ভুয়া ও ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।
নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ও প্রস্তুতি
ছায়ামন্ত্রিসভা গঠনের ধারণার বিষয়টি সম্প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচিত হচ্ছে।
গত ১৪ ও ১৫ই ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এই পরিকল্পনার কথা জানিয়ে লেখেন, রাজনীতিতে নতুনত্ব ও সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব গড়ে তুলতে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের ছায়ামন্ত্রিসভা থাকা প্রয়োজন।
এর আগে ১৫ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও এক পোস্টে জানান, সরকারের সার্বিক কার্যক্রমে ‘ওয়াচডগ’ (Watchdog) হিসেবে কাজ করতে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তারাও একটি ছায়ামন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জামায়াতে ইসলামীর এই উদ্যোগ সম্পর্কে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে এবং প্রাথমিক দায়িত্বও বণ্টন করা হয়েছে। জামায়াতের সিনিয়র নেতা ও সংসদ সদস্যরা এর নেতৃত্ব দেবেন এবং তাদের সাথে ৩ থেকে ৫ সদস্যের এক্সপার্ট টিম যুক্ত করা হয়েছে। তারা বর্তমানে বিভিন্ন পেপারস রেডি করছেন। আগামী ২-৩ মাসের মধ্যে বিশেষজ্ঞ টিমের কাজ শেষ হলে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে এটি ঘোষণা করব।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া তালিকা প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এসব ফটোকার্ড সম্পূর্ণ বানোয়াট।
আগামী দিনের সংসদীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে এবং নীতি-নির্ধারণী বিতর্কে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে জামায়াতের এই ‘ছায়ামন্ত্রিসভা’ একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।