• শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩০ অপরাহ্ন
Headline
আলেমদের জন্য রক্ত দিতেও দ্বিধা করব না: ধর্মমন্ত্রী বাংলাদেশে পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি : রুহুল কবির রিজভী দৃঢ় মনোবল নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে পুলিশ : আইজিপি বাংলাদেশ-জাপান কৌশলগত অংশীদারত্ব: নতুন দিগন্তের হাতছানি প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বিনিয়োগ ও অর্থনীতিতে নতুন গতির আশা টোকিওর নোট অব ডিসেন্টে পরিবর্তন চাইলে বৈঠকে আসতে হবে: বিরোধী দলকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদের আগামী অধিবেশনে উঠছে না সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে জাতিসংঘের জোরালো ভূমিকা চায় বাংলাদেশ হুথি হামলার জেরে তেলের দাম গত ৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ কূপে টান: আমদানির ফাঁদে জ্বালানি খাত

জাহাজভাঙায় ছাড়, ঝুঁকিতে পরিবেশ ও শ্রমিক

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের মেয়াদোত্তীর্ণ বিশালাকার জলযানগুলো ভাঙার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই একক প্রাধান্য ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২৪ সালে সারাবিশ্বে স্ক্র্যাপ বা পুনর্ব্যবহারের জন্য পাঠানো ৪০৯টি জাহাজের মধ্যে একাই ১৩০টি কিনে নিয়েছিল এ দেশের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো। সংখ্যার বিচারে গোটা দুনিয়ায় শীর্ষস্থান ধরে রাখা এই সম্ভাবনাময় শিল্পটিই এখন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার সবচেয়ে সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা বা আইএমও প্রণীত হংকং আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বাস্তবায়নের সময়সীমা দ্রুত ঘনিয়ে এলেও দেশের ইয়ার্ডগুলোকে পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে চরম মন্থর গতিতে। নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রমের পর পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন সনদবিহীন কোনো প্রতিষ্ঠানে পুরোনো জাহাজ বিক্রির পথ বৈশ্বিকভাবে পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যাবে। ফলে এই খাতের শম্বুকগতির সংস্কার এখন কেবল পরিবেশের জন্যই হুমকি নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিকে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজের নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হংকং কনভেনশনের যে কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, সে অনুযায়ী চলতি বছরের জুনের মধ্যেই প্রতিটি জাহাজভাঙা ইয়ার্ডকে পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা বাধ্যতামূলক। অন্যথায় উন্নত বিশ্বের কোনো দেশ কিংবা সচেতন জাহাজ মালিকরা ভাঙার জন্য তাদের পুরোনো জলযান বাংলাদেশে পাঠাতে পারবেন না। আন্তর্জাতিক এই বাধ্যবাধকতার মুখে দেশের বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত হতাশাজনক। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলের প্রায় আড়াই শতাধিক তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫টি ইয়ার্ড কোনোমতে তাদের কার্যক্রম সচল রেখেছে। অথচ ২০১৭ সালে পিএইচপি শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড দেশের প্রথম গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের পর দীর্ঘ আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মাত্র সাতটি প্রতিষ্ঠান এই মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সনদপত্র হাতে পেতে সক্ষম হয়েছে। বাকি সচল প্রতিষ্ঠানগুলোর রূপান্তর প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আটকে থাকায় পুরো শিল্পখাতজুড়েই এখন চরম অনিশ্চয়তার কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে।

জাহাজভাঙা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সনাতনী বিপজ্জনক কাঠামো থেকে বের করে আধুনিক পরিবেশবান্ধব রূপ দিতে কেন এত দীর্ঘসূত্রতা, তা নিয়ে অনুসন্ধান করলে আর্থিক প্রণোদনা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার তীব্র সীমাবদ্ধতার বিষয়টি সামনে আসে। একটি সাধারণ ও মাঝারি আকারের সনাতন ইয়ার্ডকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর করতে কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। অথচ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে স্ক্র্যাপ জাহাজ কিনে তা ভেঙে রড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিক্রি করে যে মুনাফা অর্জিত হয়, তা দিয়ে এই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের টাকা তুলে আনতে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মতে, দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগের টাকা ফেরত আসার এই অনিশ্চয়তা এবং জাহাজভাঙা খাতের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো শিপইয়ার্ডের অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি কোনো ঋণ দিতে আগ্রহী হয় না।

এই আর্থিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারের নীতিগত অসঙ্গতি ও জটিল আমলাতান্ত্রিক বাস্তবতা। দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং নীতিমালায় জাহাজ কেনার জন্য এলসি খোলা বা স্বল্পমেয়াদি ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ থাকলেও ইয়ার্ড আধুনিকায়নের কোনো বিশেষায়িত তহবিল নেই। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় জাহাজভাঙা শিল্পকে উচ্চমাত্রার দূষণকারী হিসেবে চিহ্নিত করে বহু বছর ধরেই ‘লাল তালিকাভুক্ত’ করে রেখেছে। এর প্রত্যক্ষ কুফল হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবেশবান্ধব কম সুদের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল কিংবা সহজ শর্তের গ্রিন ফান্ড থেকে কোনো ঋণসুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন না শিপইয়ার্ডের মালিকরা। একদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত শর্তপূরণের তাগিদ, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আর্থিক অসহযোগিতা—এই দ্বিমুখী চাপে পড়ে সাধারণ উদ্যোক্তারা এখন হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন। ফলে বিনিয়োগের অভাবে সবুজ রূপান্তরের এই প্রক্রিয়াটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

সনাতন পদ্ধতির জাহাজভাঙা কেবল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ঝুঁকি তৈরি করছে না, বরং এটি সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর এক অপূরণীয় ক্ষতি চাপিয়ে দিচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে কোনো রকম পরিবেশগত সুরক্ষা ছাড়াই পুরোনো জাহাজ কাটার ফলে নির্গত বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি বঙ্গোপসাগরের পানিতে গিয়ে মিশছে। বিশ্বব্যাংকের একটি ঐতিহাসিক সমীক্ষা অনুযায়ী, সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় এলাকার মাটি ও পানিতে ভয়াবহ মাত্রায় সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম ও অ্যাসবেস্টসের মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতুর স্থায়ী উপস্থিতি মিলেছে। ওই সমীক্ষায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল যে, ২০১০ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই উপকূলের প্রকৃতিতে প্রায় ৭৯ হাজার টন অ্যাসবেস্টস, দুই লাখ ৪০ হাজার টন পিসিবি, প্রায় বিশ লাখ টন ক্ষতিকর জৈব তরল বর্জ্য এবং দুই লাখ টনেরও বেশি ওজোনস্তর ক্ষয়কারী উপাদান জমা হবে। পোড়া মবিল, বিষাক্ত তেল এবং রাসায়নিক রঙের এই অব্যাহত প্রবাহ সাগরতলের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয় জেলেরা সাগরে নেমে মাছের তীব্র সংকটে পড়ছেন, যার ফলে হাজারো উপকূলীয় মৎস্যজীবী পরিবার তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবিকা হারিয়ে বিপন্ন হয়ে পড়ছে।

পরিবেশের পাশাপাশি সনাতনী এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন সেখানে কাজ করা তৃণমূলের হতদরিদ্র শ্রমিকরা। পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়াই সামান্য মজুরির আশায় তারা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারী লোহা কাটার কাজে যুক্ত হন। কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সেফটি বুট, বিশেষায়িত গ্লাভস কিংবা মানসম্মত হেলমেট ছাড়াই জাহাজের খোলসের ভেতরে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড ও ওপর থেকে ভারী লোহার খণ্ড পড়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের নথিভুক্ত তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যকার সময়ে দেশের শিপইয়ার্ডগুলোতে অন্তত ২৩১ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন তিন শতাধিক শ্রমিক। তাৎক্ষণিক দুর্ঘটনার পাশাপাশি বাতাস ও ধোঁয়ায় ছড়িয়ে থাকা অ্যাসবেস্টস ও বিষাক্ত গ্যাসে শ্বাস নেওয়ার কারণে এই শ্রমিকরা নীরবে সিলিকোসিস, ফুসফুসের রোগ, চর্মরোগ ও ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন।

তবে এই বিষাদময় চিত্রের বিপরীতে যে সাতটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক গ্রিন সনদের আওতায় এসেছে, সেখানে চিত্রটি পুরোপুরি আলাদা। পরিবেশবান্ধব এই আধুনিক ইয়ার্ডগুলোতে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের সার্বিক নিরাপত্তা ও কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সেখানে কর্মরত কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বাধ্যতামূলকভাবে আধুনিক সুরক্ষা পোশাক ও সরঞ্জাম ব্যবহার, নিয়মিত ও সময়মতো উচ্চ মজুরি প্রদান এবং বার্ষিক উৎসব ভাতার মতো আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। আধুনিক এই কর্মপরিবেশ একদিকে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় যুক্ত করেছে মানবিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, দেশের মোট শ্রমশক্তির কেবল একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশই এই সবুজ সুবিধার আওতায় কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।

নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রমের পর যদি বিদেশি জাহাজ আসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে দেশের জাহাজভাঙা খাতে প্রত্যক্ষভাবে কর্মরত প্রায় নয় হাজার শ্রমিক তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি হারাবেন। একইসঙ্গে রড উৎপাদন, পুরোনো লোহার আসবাবপত্র ও খুচরা যন্ত্রাংশের ব্যবসা এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহন খাতের সাথে পরোক্ষভাবে যুক্ত লাখো মানুষের জীবিকা এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাছে জরুরি আবেদন জানানো হয়েছে, যেন অন্তত যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান গ্রিন সনদ অর্জনের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, সেগুলোতে বিদেশি জাহাজ আমদানির সাময়িক অনুমোদন অব্যাহত রাখার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হয়।

আন্তর্জাতিক বাজারের কঠোর নীতিমালার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে জাহাজভাঙা শিল্পকে টিকিয়ে রাখার কোনো বিকল্প পথ আর খোলা নেই। কেবল উদ্যোক্তাদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে এত বড় রূপান্তর সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সরকারের অবিলম্বে নীতিগত হস্তক্ষেপ। লাল তালিকাভুক্তির দীর্ঘদিনের আইনি বেড়াজাল শিথিল করে এই খাতকে সহজ শর্তে পরিবেশবান্ধব তহবিল ও ব্যাংকিং সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের প্রধান এই উৎসের সবুজ রূপান্তর নিশ্চিত করা না গেলে খুব দ্রুতই দেশের অর্থনীতিকে এক অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category