২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বা ‘ওয়ান-ইলেভেন’-এর নামে দেশে সেনাসমর্থিত অগণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা এবং সে সময় রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করে নির্মম নির্যাতনের নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের এবার বিচারের আওতায় আনতে যাচ্ছে সরকার। পুলিশের প্রায় প্রতিটি ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থা দেশে-বিদেশে অবস্থানরত এসব কুশীলবের তথ্য সংগ্রহে মাঠে নেমেছে। ইতিমধ্যে ১১৩ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির একটি পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল বা তালিকা তৈরি করা হয়েছে। যাদের মধ্যে সাবেক সেনা কর্মকর্তা, আমলা, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা রয়েছেন। এদের অনেককে কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং পলাতকদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের দ্বারস্থ হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য
সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম দুই কুশীলব, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, রিমান্ডে এই দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা ওয়ান-ইলেভেনের সাথে সম্পৃক্ত একাধিক ব্যক্তি এবং নেপথ্যের অনেক অজানা তথ্য ফাঁস করেছেন। তাদের গোপন কার্যালয় ও আস্তানায় পাওয়া তথাকথিত ‘টর্চার সেল’ বা নির্যাতন কক্ষের ভয়ংকর তথ্য জেনে শিউরে উঠেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। ডিজিটাল ফরেনসিক ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সে সময় রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের ওপর চালানো অমানবিক নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সিস্টেমিক ম্যানিপুলেশন ও পর্দার আড়ালের ব্লু-প্রিন্ট
ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ওয়ান-ইলেভেন কোনো বিচ্ছিন্ন বা প্রশাসনিক রদবদলের ঘটনা ছিল না। নথিপত্র ও সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এটি ছিল দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পিত একটি ‘সিস্টেমিক ম্যানিপুলেশন’ বা ব্লু-প্রিন্ট। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের নির্দিষ্ট কিছু খাতের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া, যার নেপথ্যে বিশাল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ জড়িত ছিল। যা একসময় ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে প্রচার করা হয়েছিল, বর্তমান তদন্তে সেগুলোর পেছনে মূলত গোষ্ঠীগত ও ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের প্রমাণ মিলছে।
নজরদারিতে ১১৩ জন ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা, আমলা, ব্যবসায়ী এবং সে সময়ের কিছু বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ ১১৩ জনের একটি প্রোফাইল তৈরি করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে যারা বর্তমানে দেশে অবস্থান করছেন, তাদের দৈনন্দিন চলাফেরা ও যোগাযোগের ওপর দিনরাত কড়া নজরদারি চলছে। দেশ রূপান্তরকে পুলিশের একজন ডিআইজি জানিয়েছেন, ওয়ান-ইলেভেনের দুই মাস্টারমাইন্ড মাসুদ ও মামুন গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেশে থাকা বাকি কুশীলবরা চরম আতঙ্কে রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ গোপনে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। তাই দেশের সব বিমানবন্দর ও ইমিগ্রেশন পয়েন্টে ইতিমধ্যে নামের তালিকা ও সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইন্টারপোলের দ্বারস্থ পুলিশ, আসছে রেড নোটিশ
ওয়ান-ইলেভেনের পর আইনি জটিলতা এড়াতে তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদসহ অনেক কুশীলব সুকৌশলে দেশত্যাগ করেন। তারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক সূত্র নিশ্চিত করেছে, সপ্তাহখানেক আগে পলাতক এসব ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট তথ্য চেয়ে ইন্টারপোল সদর দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। খুব শিগগিরই অত্যন্ত প্রভাবশালী এসব পলাতক আসামির বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিশ’ জারি করার প্রক্রিয়া চলছে।
বিচার হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে
ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, সাবেক সেনা কর্মকর্তা শেখ মামুন খালেদ এবং মাসুদ উদ্দিনের সে সময়ের কর্মকাণ্ড সুস্পষ্টভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেইফ হাউজের নামে টর্চার সেল তৈরি করে মানুষকে নির্যাতন, গুম ও খুন করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “তদন্তে যাদেরই সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তারা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, সবাইকে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।”
দায়মুক্তি দিলেও ফৌজদারি বিচারে বাধা নেই
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের আইনি দায়মুক্তি দিলেও, তাদের ফৌজদারি অপরাধের বিচার করতে কোনো বাধা নেই বলে নিশ্চিত করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। পুলিশ ও আইনজীবীদের মতে, দায়িত্ব পালনের নামে যদি কেউ প্রচলিত আইন ভঙ্গ করে বেআইনিভাবে নির্যাতন বা গুমের মতো ঘটনা ঘটান, তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে বিচার করা পুরোপুরি বৈধ।
এছাড়া, ওয়ান-ইলেভেনের সময় ঠিক কী কী অন্যায় ও মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছিল, তা নিরপেক্ষভাবে নিরূপণের জন্য সরকার খুব শিগগিরই একটি ‘কমিশন’ গঠন করার পরিকল্পনা করছে বলেও পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।