সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো যতটা কঠিন, সেই অর্জন ধরে রাখা যেন তার চেয়েও বেশি চ্যালেঞ্জিং। বাংলাদেশ যখন বিশ্বমঞ্চে হাম ও রুবেলা নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে প্রশংসায় ভাসছিল, ঠিক তখনই প্রকৃতির এক নিষ্ঠুর পরিহাস আর ব্যবস্থাপনার কিছু ফাঁকফোকর আমাদের ঠেলে দিয়েছে এক ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ খাদের কিনারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে বাংলাদেশকে হামের জন্য জাতীয়ভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যে রোগটিকে আমরা ইতিহাস বানাতে চেয়েছিলাম, সেটিই এখন আমাদের শিশুদের ভবিষ্যতের সামনে যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাস। ক্যালেন্ডারের পাতা বলছে আমরা যখন প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছি, তখন আদিম এক ভাইরাস আমাদের ঘরে ঘরে হানা দিচ্ছে। ৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশের জাতীয় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি (IHR) ফোকাল পয়েন্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে একটি জরুরি বার্তা পাঠায়। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—দেশে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে।
বিপজ্জনক পরিসংখ্যানের এক নজরে:
সন্দেহভাজন রোগী: ১৯,১৬১ জন (১৫ মার্চ – ১৪ এপ্রিল ২০২৬)।
পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগী: ২,৯৭৩ জন।
উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু: ১৬৬ জন।
হাসপাতালে ভর্তি: ১২,৩১৮ জন।
মৃত্যুহার (CFR): ১.১% (পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগীদের ক্ষেত্রে)।
হামের মৃত্যুহারের গাণিতিক পরিমাপটি নিম্নরূপ:
এই ১.১% শতাংশ শুনতে ছোট মনে হলেও, জনস্বাস্থ্যের প্রেক্ষাপটে এটি একটি অশনিসংকেত। কারণ, হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। টিকার যুগে প্রতিটি শিশুমৃত্যুই আমাদের ব্যবস্থার ব্যর্থতা।
দেশের আটটি বিভাগেই সংক্রমণ ছড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু রাজধানী ঢাকা যেন এই ভাইরাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো এখন হামের ‘হটস্পট’। ঢাকার বস্তি এলাকাগুলোতে টিকার সুঁই পৌঁছানোর চেয়ে ভাইরাসের গতি যেন অনেক বেশি দ্রুত।
সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এলাকাগুলো হলো:
১. ডেমরা ও যাত্রাবাড়ী
২. কামরাঙ্গীরচর ও কড়াইল বস্তি
৩. মিরপুর ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল
ঢাকা বিভাগে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৮,২৬৩ জন। এর পরেই রয়েছে রাজশাহী (৩,৭৪৭ জন) এবং চট্টগ্রাম (২,৫১৪ জন)। ঢাকার বস্তিগুলোতে কেন এই পরিস্থিতি? উত্তরটা সহজ কিন্তু নির্মম—অপুষ্টি, গাদাগাদি করে বসবাস এবং সচেতনতার অভাব। ভাইরাসের জন্য এর চেয়ে ভালো প্রজননক্ষেত্র আর কী হতে পারে?
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (EPI) তথ্য বলছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৮৩ শতাংশেরই বয়স ৫ বছরের নিচে। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, ৩৩ শতাংশ শিশুর বয়স ৯ মাসেরও কম—অর্থাৎ তারা হামের টিকার প্রথম ডোজ পাওয়ার উপযুক্ত হওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে।
“আমাদের সন্তানদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যখন ভাইরাসের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করে, তখন বুঝতে হবে আমাদের জনস্বাস্থ্য নীতিতে কোথাও বড় ধরনের ছিদ্র তৈরি হয়েছে।” — ডা. মুশতাক হোসেন, জনস্বাস্থ্যবিদ।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যে ১৬৬ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে, তাদের অধিকাংশই ছিল ‘জিরো ডোজ’ বা একটি টিকাকরণও সম্পন্ন না হওয়া শিশু। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, বিগত কয়েক বছরে টিকাদান কর্মসূচির নিয়মিত প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ছেদ পড়েছে।
হাম কেবল একটি ফুসকুড়ি ওঠার রোগ নয়; এটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানো এক ভয়ংকর সংক্রামক ভাইরাস। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা সামান্য ড্রপলেটের মাধ্যমে এটি ছড়িয়ে পড়ে।
হামের সংক্রমণের সময়কাল:
সংক্রমণের পর ১০-১৪ দিন পর্যন্ত শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা না-ও যেতে পারে (Incubation Period)। কিন্তু রোগী যখন থেকে জ্বর অনুভব করে, তখন থেকেই সে অন্যকে সংক্রমিত করতে সক্ষম। শরীরে ফুসকুড়ি বা র্যাশ ওঠার ৪ দিন আগে থেকে ৪ দিন পর পর্যন্ত ভাইরাসটি সবচেয়ে বেশি সংক্রামক থাকে।
প্রাথমিক লক্ষণসমূহ:
উচ্চমাত্রার জ্বর ও সর্দি।
চোখ লাল হয়ে যাওয়া (Conjunctivitis)।
কাশি এবং মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ (Koplik’s Spots)।
মাথা থেকে শুরু হয়ে শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়া লালচে ফুসকুড়ি।
অনেকেই হামকে সাধারণ রোগ মনে করে ভুল করেন। কিন্তু হামের প্রকৃত ভয়াবহতা লুকিয়ে আছে এর পরবর্তী জটিলতাগুলোর মধ্যে। বিশেষ করে ভিটামিন এ-র ঘাটতি থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক হতে পারে।
হামের প্রধান জটিলতাসমূহ:
১. নিউমোনিয়া: হামের রোগীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
২. এনসেফালাইটিস: মস্তিষ্কে প্রদাহ, যা স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
৩. অন্ধত্ব: কর্নিয়ার ক্ষতি করার মাধ্যমে শিশুকে স্থায়ীভাবে অন্ধ করে দিতে পারে।
৪. গুরুতর ডায়রিয়া: দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি করে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়।
বাংলাদেশের সাফল্যের গল্পটা ছিল ঈর্ষণীয়। ২০০০ সালে হামের টিকার কভারেজ ছিল ৮৯%, যা ২০১৬ সালে এসে রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪-২৫ সালে এসে দেশে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার তীব্র সংকট দেখা দেয়।
কেন এই বিপর্যয়?
টিকার সংকট: বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব।
টিকাদানের ফাঁক: নিয়মিত ইপিআই সেশনের বাইরে থাকা ভাসমান শিশুদের বড় একটা অংশ বাদ পড়ে যাওয়া।
সাপ্লিমেন্টারি ক্যাম্পেইন না হওয়া: ২০২০ সালের পর দেশব্যাপী বড় কোনো সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি (SIA) অনুষ্ঠিত হয়নি।
এই গ্যাপ বা শূন্যতা ভাইরাসটিকে আবারও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছে। বিজ্ঞান বলে, হাম রুখতে হলে ৯৫% নিরবচ্ছিন্ন কভারেজ প্রয়োজন। আমরা সেই জাদুকরী সংখ্যা থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম বলেই আজ এই উচ্চ ঝুঁকি।
হাম কোনো সীমারেখা চেনে না। বাংলাদেশের সাথে ভারত ও মিয়ানমারের দীর্ঘ স্থলসীমান্ত এখন বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো ব্যস্ত স্থলবন্দর দিয়ে নিয়মিত মানুষ যাতায়াত করছে।
মিয়ানমারে চলমান অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে সেখানে নজরদারি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, ফলে সেখান থেকে ‘জিরো ডোজ’ শিশুদের মাধ্যমে সংক্রমণ প্রবেশের ঝুঁকি তীব্র। অন্যদিকে, ভারতেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হাম রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ঢাকা বা সিলেটের মতো আন্তর্জাতিক ট্রানজিট পয়েন্টগুলো এখন ভাইরাসের আন্তর্জাতিক করিডোর হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতিমধ্যেই হার্ডলাইনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের পরামর্শে হামকে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গৃহীত কার্যক্রমসমূহ:
এমআর ক্যাম্পেইন ২০২৬: ৫ এপ্রিল থেকে ৩০ উপজেলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি এখন দেশব্যাপী বিস্তৃত। লক্ষ্য হলো ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা।
ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন: হামের জটিলতা কমাতে ভিটামিন এ-র ভূমিকা অপরিসীম। তাই আক্রান্ত প্রতিটি শিশুকে ভিটামিন এ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল (RRT): জেলা পর্যায়ে বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে যারা তাৎক্ষণিক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
WHO স্পষ্ট করে দিয়েছে, শুধু সাময়িক ক্যাম্পেইন দিয়ে এই উচ্চ ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই কাঠামো।
মূল সুপারিশসমূহ:
টেকসই কভারেজ: টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের হার ৯৫ শতাংশের উপরে স্থায়ীভাবে ধরে রাখা।
সীমান্ত নজরদারি: স্থলবন্দর ও বিমানবন্দরগুলোতে কঠোর স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু রাখা।
স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা: যারা সরাসরি রোগীদের সেবা দিচ্ছেন, সেই নার্স ও ডাক্তারদের অবশ্যই হামের প্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
জরুরি মজুত: টিকা, সিরিঞ্জ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অন্তত ৩ মাসের ‘বাফার স্টক’ নিশ্চিত রাখা।
হামের এই উচ্চ ঝুঁকি কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাথাব্যথা নয়; এটি একটি জাতীয় সংকট। আজ যদি আমরা প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে না পারি, তবে কয়েক দশকের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত শিশু মৃত্যুর হার হ্রাসের সাফল্য ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
মনে রাখতে হবে, টিকার একটি ডোজ একটি শিশুর জীবন এবং একটি পরিবারের স্বপ্ন। হামের উপসর্গ দেখা দিলেই রোগীকে আলাদা রাখা, প্রচুর তরল খাবার ও ভিটামিন এ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব।
হামমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, সেই পথ থেকে আমরা কিছুটা বিচ্যুত হয়েছি ঠিকই, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা আর জনগণের সচেতনতা থাকলে ২০২৬ সালের এই সংকটকে আমরা জয় করতে পারব। কারণ, যুদ্ধে হার মানে শেষ নয়, হার মেনে নেওয়ার নামই পরাজয়। আমরা হারতে শিখিনি।
সতর্কীকরণ: হামের লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে জনসমাগম থেকে দূরে রাখুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করবেন না। মনে রাখবেন, হামের সেরা চিকিৎসা হলো আগাম টিকা।
আপনার এলাকার শিশুদের টিকাদান কেন্দ্র সম্পর্কে জানতে নিকটস্থ সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা টিকাদান কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। একটি টিকা, একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ।