বাংলাদেশের শিল্প খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও শোকাবহ দিন ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল। আজ এই মর্মান্তিক রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পূর্ণ হলো। সেদিন সকালের ব্যস্ত সময়ে সাভারের বহুতল ওই ভবনটি হঠাৎ ধসে পড়লে প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৬ জন নিরীহ পোশাক শ্রমিক, আর পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় আরও কয়েক হাজার মানুষকে। এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই দুঃসহ স্মৃতি আজো তাজা আহত ও নিহতদের স্বজনদের কাছে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও সেই ভয়াবহ অবহেলা ও হত্যাকাণ্ডের বিচার না পাওয়ায় তাদের শোক এখন পরিণত হয়েছে চরম আক্ষেপে।
ঘটনার পর মোট ছয়টি মামলা দায়ের করা হলেও সবচেয়ে বেশি আলোচিত হত্যা মামলাটি এগোচ্ছে কচ্ছপগতিতে। ২০১৫ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে এবং ২০১৬ সালে বিচার শুরু হয়। কিন্তু আসামিপক্ষের একের পর এক আইনি পদক্ষেপ এবং উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে টানা পাঁচ বছর মামলাটির কার্যক্রম পুরোপুরি থমকে ছিল। ২০২২ সালে পুনরায় বিচারকাজ শুরু হলেও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ভুক্তভোগীদের হতাশা কেবল বেড়েছেই।
মামলার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাক্ষীদের অনুপস্থিতি। এই হত্যা মামলায় মোট ৫৯৪ জনকে সাক্ষী করা হলেও গত ১৩ বছরে সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র ১৪৫ জন। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে অনেক সাক্ষী ঠিকানা বদল করেছেন, অনেকে হতাশ হয়ে আদালতে আসা ছেড়ে দিয়েছেন, আবার বদলিজনিত কারণে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক সাক্ষ্য দিতে উপস্থিত হচ্ছেন না। আদালত বারবার কড়া নির্দেশ দিলেও পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের হাজির করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমনকি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মাত্র ছয় মাসের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তির সুস্পষ্ট নির্দেশ দিলেও সংশ্লিষ্টদের গাফিলতিতে তা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
আসামিদের বর্তমান অবস্থাও এই বিচারহীনতার চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। অভিযোগপত্রে নাম থাকা ৪১ আসামির মধ্যে ইতোমধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, ১৩ জন পলাতক এবং ২৫ জন বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে মুক্ত আছেন। একমাত্র প্রধান আসামি সোহেল রানাই বর্তমানে কারাগারে বন্দি আছেন, যদিও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলায় তার তিন বছরের সাজা হয়েছে। তবে হত্যা মামলায় তার আইনজীবীর দাবি, সোহেল রানাকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে এবং তিনি নির্দোষ। আগামী ৩০ এপ্রিল এই মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারিত রয়েছে।
এদিকে, বেদনাবিধুর এই দিনটি স্মরণে শুক্রবার সকালে সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজার সামনের অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে ভিড় করেন আহত শ্রমিক, নিহতদের স্বজন, শিল্প পুলিশ ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ফুলেল শ্রদ্ধায় নিহতদের স্মরণ করার পাশাপাশি তারা বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। কান্নায় ভেঙে পড়া স্বজন ও পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকা শ্রমিকদের এখন একটাই দাবি—দ্রুততম সময়ে এই মামলার নিষ্পত্তি করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা এবং পোশাক শিল্পে নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করা। ১৩ বছরের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান কবে হবে, সেই উত্তর এখনও ভুক্তভোগীদের কাছে অজানা।